২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এটা আবার কোন্ রাজনীতির খেলা!

  • পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। দৈনিক সংবাদপত্র পড়ে বোঝা গেল সন্দেহ নয়, তিনি রীতিমতো প্রশ্নই তুলেছেন। তিনি বলেছেণ্ড মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নানা বই-কিতাবে নাকি নানা তথ্য লেখা আছে। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সমাবেশে গত ২১ ডিসেম্বর ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ছাড়া আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা চায়নি। মুক্তিযুদ্ধও করেনি। বিজয়ের ৪৪ বছর পর খালেদা জিয়ার বক্তব্য পিলে চমকে দেয়ার মতো। মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশ্নতাতীভাবে স্বীকৃত, যখন ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং প্রায় দশ লাখ বঙ্গললনার নির্যাতিত হওয়ার কথা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না, যখন প্রায় এক কোটি শরণার্থীর দেশত্যাগ ইতিহাসের পাতায় সত্য হিসেবে লেখা হয়ে গেছে, ঠিক তখন বিএনপি চেয়ারপার্সনের বক্তব্য শুনে মনে হয়, এটা আবার কোন্ নতুন রাজনীতির চাল। তাছাড়া একাত্তরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এ কথা কোন রাজনৈতিক দল বা নেতার মুখে কেউ শুনেছে! ২১ তারিখের অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে যে সামান্য কজন মুক্তিযোদ্ধা উপস্থিত ছিলেন, তারাও কি শহীদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন! বেগম জিয়া একাত্তরের যুদ্ধ দেখেননি, কিন্তু তাঁর স্বামী মেজর জিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে তিনি আর কেউ নন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আর যে রাজনৈতিক দলের পরিচালনায় একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই দলের নাম আওয়ামী লীগ। মেজর জিয়া কি কখনও ত্রিশ লাখ শহীদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন! কোথাও শুনিনি। তাছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী, যে দল কি-না বিএনপির দীর্ঘদিনের দোসর, তারাও কখনও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেনি। সেই জন্যই বলেছি বেগম সাহেবার এটা আবার কোন্ রাজনীতির খেলা! তবে খেলা যাই হোক, খেলা ভেঙ্গে দেয়ার খেলাও আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান এবং তাদের স্থানীয় পোষ্যরা। চির নমস্য শহীদদের প্রতি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর যে পবিত্র আবেগ, সেই আবেগের ব্যাপারে যিনি বা যারা প্রশ্ন তোলেন তারা কি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার করতে চান? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা, তথ্য, ঘটনাবলী সম্পর্কে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাশীল হলে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর অদ্ভুত, অবান্তর এবং ভয়ঙ্কর কথাবার্তা শুনতে হয় না। বেগম জিয়ার পাঠ্যাভ্যাস সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আশা করি তিনি পড়াশোনা করেন। নইলে বই-কিতাবের প্রসঙ্গ কেন আনবেন। তবে যে বই-কিতাবের কথা তিনি বলেছেন সেগুলো কাদের লেখা। কোন্্ ইতিহাসবিদের! কোন্্ গবেষকদের! দেশের যে কজন প্রথিতযশা ও পরিশ্রমী ইতিহাসবিদ এবং গবেষক ৪৪ বছর ধরে মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিরন্তর কাজ করছেন, তাদের গ্রন্থ বা লেখা পড়লে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে না। বিদেশে যে প-িতজনেরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে কর্মরত তাদের সৃষ্টির প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা থাকলে মুুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দর্শন আদর্শ, ভাবমুক্তির ব্যাপারে কোন দেশপ্রেমিক বাঙালী অসম্মানজনক কথা বলতে পারেন না। বেগম জিয়ার উল্লেখিত বই-কিতাবগুলো কাদের লেখা জানতে ইচ্ছা করছে। বই-কিতাবগুলো কি আদৌ সত্যনির্ভর ও সত্যিকার অর্থে গবেষণাপ্রসূত! নাকি যেসব জ্ঞানপাপী তাঁর কানে বিভ্রান্তিকর ইতিহাসের ছবক দেন, তাদের ছবকনির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে তিনি শহীদদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন! তিনি তো প্রকারান্তরে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কতিপয় রাজাকারের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন।

গত ১৬ ডিসেম্বরে জনকণ্ঠের পাতায় লিখেছিলাম, ‘বিজয়ের মাস ডিসেম্বর রাজাকাররা দিগম্বর।’ এই রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত আঘাত হেনে চলেছে। বাঙালীর ইতিহাস-ঐতিহ্য, বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সম্পর্কে অহর্নিশ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এই রাজাকাররা সব সময় ষড়যন্ত্র করে বাঙালীর সকল অর্জনকে নষ্ট করে দিয়ে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। এই রাজাকাররাই সর্বদা মিথ্যাচার করে, ইতিহাস বিকৃতির ইজারা নেয়, সরলমতি ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিপথগামী করার ছল-চাতুরী করে, ধর্মান্ধ জঙ্গীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সন্ত্রাসী অপকর্ম করে। এই রাজাকাররাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। শহীদ বেদিকে অবজ্ঞা করে, নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে বিশেষ ফতোয়া দেয়, ধর্মের নামে প্রতারণা করে। দেশের জন্য জীবনোৎসর্গ করা মহান শহীদদের প্রতি অসম্মান করা রাজাকারদের সহজাত প্রবৃত্তি। এই রাজাকাররা বিজয়ের মাসে হম্বিতম্বি করার সাহস পায় না।

একাত্তরের শহীদদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে বেগম জিয়া কি তবে রাজাকারদের সঙ্গেই নতুন করে প্রাণের গাঁটছড়া বেঁধেছেন। প্রশ্নটা আবারও মনে হলো। যে ডিসেম্বরে রাজাকাররা ভয়ে দিগম্বর সেজে লুকিয়ে থাকে, সেই ডিসেম্বর মাসেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে উদ্ভট কথাবার্তা বলে বেগম জিয়া রাজাকারদের পক্ষে আবারও তার অবস্থান প্রমাণ করলেন। দেশে গণতান্ত্রিক আবহ যখন মেঘলা আকাশ থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ ও আলোকিত পথে এগোচ্ছে, তখন সেই পথে তিনি কোদাল চালানোর উদ্যোগ নিলেন। এটা দুঃখজনক এবং বেদনাদায়ক।

দেশের সকল কর্মযজ্ঞ মহান মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র ও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর দাঁড়িয়েই আজ আমাদের এতকিছু অর্জন। দেশের রাজনীতিও চলবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শতভাগ বিশ্বাস ও সম্মান রেখে। মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করে এই দেশে রাজনীতি করা হবে চরম ভুল। খালেদা জিয়া এবং তাঁর দল এখনও যদি এই সত্যটি বুঝতে না পারে, তবে তার মাসুল তাকে কড়ায় গ-ায় গুনতে হবে। যিনি কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ভালমন্দ কিছুই বলেন না, যিনি পাকিস্তানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তা ও আচরণে দেখেও না দেখার ভান করেন, সেই তিনি অর্থাৎ বেগম খালেদা জিয়া হঠাৎ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেনÑ এটা হাল্কা ব্যাপার হিসেবে নেয়া হবে না। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বিজয়ের পবিত্র মাসে মুক্তিযুদ্ধের একটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে জাতিকে দ্বিধায় ফেলার অপচেষ্টা বাংলাদেশবিরোধী বহির্শক্তির কোন রাজনৈতিক খেলার অংশ কিনা, সে ব্যাপারে প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বহির্শক্তির এই খেলায় খালেদা জিয়া যদি পুতুল নাচের পুতুল হতে চান, তবে বিএনপির জন্য তা সমূহ ক্ষতির ব্যাপার হবে। অনেকগুলো কারণে এমনিতেই বিএনপি এখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা। অনেকটা হালভাঙা নৌকার মতো দিকহীন, নির্দেশনাহীন। নৌকার উদাহরণ দেয়ায় কট্টরপন্থী বিএনপি নেতারা কেউ কেউ অপছন্দ করতে পারেন। তার চেয়ে বরং বলা যাক বিএনপির বর্তমান অবস্থা অনেকটা পোকায় আক্রান্ত ধানের শীষের মতো, যাতে একটু একটু করে চিটা ধরছে। যখন দলের অনেক নেতৃস্থানীয়রা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সম্মান রেখে কথা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধপরবর্তী ভূমিকার প্রশংসা করছেন, সেই সময় নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া এবং সর্বজন স্বীকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রশ্ন তোলা কিংবা কটাক্ষ করা রাজনৈতিকভাবে সংগঠনের কফিনে শেষ না হোক একটি বড়সড় পেরেক ঠোকার মতোই হবে। দলের সমর্থকরাও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হওয়া অথবা রাজাকারদের পক্ষ নেয়া খুব একটা পছন্দও করবে না।

শেষে আবারও বলি এটা যদি দেশ, জাতি ও সরকারের বিরুদ্ধে আবারও কোন নতুন রাজনৈতিক খেলা হয়, তবে সেই খেলা ভেঙ্গে দেয়ার খেলায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমস্ত শক্তি ঐক্যবদ্ধ হবে। জয় বাংলা।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

নির্বাচিত সংবাদ