১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৯৫ যুদ্ধাপরাধী বনাম আটকে পড়া বাঙালী

  • জাফর ওয়াজেদ

(২৩ ডিসেম্বর সম্পাদকীয় পাতার পর)

২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লেখা হয়, শেখ মুজিব বলেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পারস্পরিক স্বীকৃতির ফলে যে নতুন যুগের সূচনা হলো, তার ফলে আমাদের সব সমস্যা সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান সম্ভব হবে।’ যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের চাপের পাশাপাশি অন্য দেশগুলোও একদিকে চাপ প্রয়োগ এবং অপরদিকে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালীর উদ্ধার, জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ, আন্তর্জাতিক সাহায্য নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বাংলাদেশের সামনে এসে দাঁড়ায়। দেশ তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত। দেশের ভেতর পাকিস্তান ও চীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর থানা, ফাঁড়ি ও অস্ত্রলুট, গুদামে অগ্নিসংযোগ, গলা কাটা ও শ্রেণীশত্রু খতমের সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। নানাবিধ কারণে বাংলাদেশের তখন প্রায় একলা চলোর অবস্থা। ভারত ও আন্তর্জাতিক অভ্যন্তরীণ নানা চাপে যুদ্ধবন্দীদের ফেরত পাঠাতে চাইছিল। যে কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে প্রায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ তথাপি বিচারের ব্যাপারে প্রকাশ্যে আগ্রহ ব্যক্ত করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কারণে যুদ্ধাপরাধীরা দেশে ফিরতে পারছিল না। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার মাসখানেকের মধ্যে ১৯৭৪ সালের ২৪ মার্চ পাকিস্তানে জিম্মি থাকা সর্বশেষ ২০৬ বাঙালীকে ছেড়ে দেয়। পাকিস্তানের পক্ষে তখন স্বীকৃতি দেয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের নাগরিককে আটক রাখার কোন সুযোগ ছিল না। দ্রুত সমাধানের আশায় তিন দেশে সিদ্ধান্ত নেয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের। যেখানে বিষয়গুলো আলোচনার পর সমঝোতা হবে।

দিল্লীতে তিন দেশ অবশেষে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনায় বসে। ১৯৭৪ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেন। বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশ একাত্তরের ঘটনার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনার ওপর চাপ দেন। ড. কামাল হোসেনের আহ্বানে আজিজ আহমদ তার সরকারের পক্ষ থেকে স্রেফ ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেন। যা যৌথ ঘোষণার শেষে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতের শরণ সিংহ এ জন্য ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছিলেন। ৬ এপ্রিল ডক্টর কামাল ঘোষণা করেন, পাকিস্তান যদি তার একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য জনসম্মুখে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং অবাঙালী বিহারিদের প্রত্যাবাসনসহ পাকিস্তানের সম্পদ বণ্টনে রাজি হয়, তাহলেই শুধু ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর ওপর আনীত অভিযোগ তুলে নেয়া যায়। জবাবে আজিজ আহমদ বলেছিলেন, সম্পদ বণ্টন হলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক দেনার ভারও নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট এছাড়া অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বিষয়ে একাধিকবার দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তাই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশকেও একাত্তরের মার্চপূর্ব কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তাছাড়া, ২২ ফেব্রুয়ারিতে মিসরের রাষ্ট্রপ্রধান আনোয়ার সাদাতের মধ্যস্থতায় যে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ পাকিস্তানী বন্দীদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুুক্তি সই হয়। যৌথ ঘোষণায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান সরকার মনে করে, পাকিস্তানে যে অপরাধ হয়ত সংঘটিত হয়েছে তার প্রতি নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করে। ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই বলে আহ্বান করেছেন যে, সমঝোতার স্বার্থে তারা যেন বিগত ঘটনা ভুলে যায় ও ক্ষমা প্রদর্শন করে। চুক্তিতে ডক্টর কামালকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তানের ওই সব বন্দী যে মাত্রাতিরিক্ত ও বহুধা অপরাধ করেছে, তা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত এবং এই ১৯৫ পাকিস্তানী বন্দী যে ধরনের অপরাধ করেছে, সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সর্বজনীন ক্ষমতা রয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়, স্বীকৃতিদানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এবং অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে যাওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন। এ প্রসঙ্গে ড. কামাল উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ক্ষমাশীলতার পরিচয় দিয়ে বিচার চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ সম্মত হয় যে, ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে দিল্লী চুক্তির অধীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ১৯৫ জনকে ক্ষমা করেছে, তা বলেনি। শুধু ভারত থেকে পাকিস্তান ফিরে যাওয়ার কথা বলেছে।

১৯৭৪ সালের ১১ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমস শিরোনাম করেছিল, ‘বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা।’ সাংবাদিক বার্নার্ড উইনরবের লিখেছেন, ‘যদিও পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা সরাসরি ছিল না, যতটা সরাসরি বাংলাদেশ দাবি করেছিল। কিন্তু ভারতীয় ও বাংলাদেশী কর্মকর্তারা মনে করেন, পাকিস্তান এ কথা স্বীকার করেছে যে, তাদের সেনাবাহিনীর কেউ কেউ মাত্রাতিরিক্ত কাজ করেছে। এমনকি পাকিস্তান যে এই চুক্তি সই করে তাও এক ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। চুক্তিপত্রে এই মর্মে বাংলাদেশের একটি বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত হয় যে, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত ১৯৫ সেনা নানা অপরাধ করেছে। যার অন্তর্গত হলো ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা মৈত্রীর বৃহত্তর স্বার্থে তাদের প্রতি তার দেশ ক্ষমা প্রদর্শন করেছে’ বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন জানালেন। বাংলাদেশ এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ‘গণহত্যা’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

১৯৭৪ সালের এপ্রিলে যখন দিল্লী চুক্তি হয়, বঙ্গবন্ধু তখন মস্কোতে চিকিৎসারত। ফেরার পথে দিল্লীতে অবস্থানকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি জানি, আমাকে কেউ কেউ ভুল বুঝবে। কিন্তু আমি নিরুপায়। এদের না ছাড়লে ভুট্টো আমার ৪ লাখ বাঙালীকে ছাড়বে না। বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘ভুট্টো লাহোরে আমাকে বলে, পাকিস্তানী সেনাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে না পারলে, ভুট্টোকে সেনাবাহিনীর লোকরা মেরে ফেলবে। (পরবর্তীকালে তা হয়েওছিল)। ভুট্টো তার জীবন বাঁচানোর জন্য ৪ লাখ বাঙালীকে ছাড়বে না। আর বাঙালীদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমি ওয়াদাবদ্ধ। ৪ লাখ অসহায় নর-নারীর জীবন বাঁচানোর জন্যই আমাকে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওদের ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

আর দিল্লীতে যখন মন্ত্রীদের বৈঠক চলছিল, ভুট্টো তখন সরকারী সফরে ফ্রান্সে। প্যারিস থেকে হুঁমকি দিয়ে ঘোষণা করলেন, এই চুক্তি সই না হলে উপমহাদেশে সমঝোতার পথ সুদূর পরাহত হবে। পাকিস্তানী কতিপয় সংবাদপত্র এই চুক্তির বিরোধিতা করে ভুট্টোকে দায়ী করেন। তিনি শক্ত অবস্থানে ছিলেন বলেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে আপত্তি প্রত্যাহার করলেও গণহত্যার অপরাধের জন্য ক্ষমা করেনি। কারণ চুক্তির ১৩ ধারায় বাংলাদেশের ভাষ্য ছিল, পাকিস্তানী বন্দীরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, সে ধরনের অপরাধের অপরাধীদের দায়ী করে আইনের মুখোমুখি করার বিষয়ে সর্বজনীন ঐকমত্য রয়েছে। বাংলাদেশ বিচার ঢাকায় হবে বলে যে ঘোষণা দিয়েছিল, তা থেকে সরে এলেও পাকিস্তানের আদালতে বা আন্তর্জাতিক আদালতে এদের বিচার হবে চুক্তি অনুযায়ী তাই আশা করেছিল। তথাপিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি বাংলাদেশ অব্যাহত রাখে।

১৯৭৪-এর ২৮ জুন ভুট্টোর ঢাকা সফরের সময় বঙ্গবন্ধু তার কাছে যুদ্ধাপরাধের বেশকিছু ডকুমেন্টস হাজির করেছিলেন। এর মধ্যে রাও ফরমান আলীর বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকাও ছিল এবং ডায়েরিতে লেখা ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ, রং লালে লাল করে দিতে হবে।’ বাংলাদেশের চাপে পাকিস্তান হামুদুর রহমান কমিশন গঠন করে। এই কমিশনে যুদ্ধাপরাধীরাও জবানবন্দী দেয়। কমিশন পাকিস্তানী সেনা ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদরদের নিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করে। সুপারিশে কর্তব্যে অবহেলার জন্য বেশকিছু সামরিক কর্মকর্তার শাস্তির কথা বলা হয়। কমিশন আরও সুপারিশ করেছিল, ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানী সেনাদের নৃশংসতা, অবাধ নিষ্ঠুরতা ও অনৈতিকতা তদন্তে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আদালত বা কমিশন গঠন করার জন্য। কমিশন প্রয়োজনীয় প্রমাণাাদির জন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাওয়ার কথাও উল্লেখ করে। বাংলাদেশ গণহত্যার প্রমাণাদিও কমিশনে সংযুক্ত করেছিল। যা কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর অনেকের বক্তব্য কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

চলবে...