১৫ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি রোধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ

  • গবেষণা সেল তৈরি করে আইন কমিশন কাজ শুরু করেছে;###;মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা- এবিএম খায়রুল হক

আরাফাত মুন্না ॥ স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি বন্ধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ আইন কমিশন। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র শুরু থেকেই দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করে নানা মন্তব্য করে আসছে। দেশে প্রচলিত কোন আইন না থাকায় স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও ইতিহাস বিকৃতিকারীদের শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছিল না। প্রস্তাবিত আইনটিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও শহীদের সংখ্যা বিকৃতিকারীকে শাস্তি দেয়ার বিধান থাকবে। ইউরোপসহ বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের আইন রয়েছে, যা ‘ল এ্যাগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ নামে পরিচিত।

এদিকে বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছে- এমন তথ্য পাওয়া গেছে মার্কিন অধ্যাপক রুডলফ জোসেফ রুমেলের গণহত্যা বিষয়ক ‘স্ট্যাটিসটিক্স ডেমিসাইড’ বইতেও। ওই বইতে জেলাভিত্তিক গণহত্যার তালিকাও দেয়া আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের বিষয়টি স্বীকৃত হলেও যারা এটা বিকৃত করতে চান তাদের জন্য ‘ল এ্যাগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’র মতো আইন করা জরুরী বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা।

নতুন এই আইন প্রণয়নের বিষয়টি জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ইতোমধ্যে এ আইন করার জন্য গবেষণা সেল তৈরি করে আইন কমিশন কাজও শুরু করে দিয়েছে। বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, আমাদের ডিসেম্বরের মাসিক সভায় এ আইন তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারা শহীদদের বিরুদ্ধে কথা বলবে; যারা একাত্তরের অত্যাচার অবিচারকারী, খুনী, গণহত্যাকারীদের পক্ষে কথা বলবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এ আইনটা করা হবে ইনশা আল্লাহ। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই হচ্ছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা। একেবারে সুনির্দিষ্টভাবে আমরা এখনও নাম ঠিক করতে পারিনি। তবে হলোকাস্ট আইনের আলোকেই হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কবে নাগাদ এ খসড়া হবে সেটা বলা মুশকিল। তবে আমরা রিসার্চ টিম তৈরি করেছি। গবেষণা করে কাজটা করতে অনেক সময় লাগবে। তবে ইতোমধ্যে আইনটাতে হাত দিয়েছি। আমাদের কাজ শেষ হলে আমরা এটা আইন মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।

আইন কমিশনের অনেক সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে হারিয়ে যায়- এই অভিজ্ঞতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এটা সরকার বলতে পারবে; এটাতো আমি বলতে পারব না। আমাদের কাজ আইন তৈরি করা। সময় সুযোগ বুঝে সব সময় আইন তৈরি করা মুশকিলও হয়ে যায়। বাকিটা হলো সরকারের ব্যাপার। দলগতভাবে কেউ মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বললে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টা প্রস্তাবিত আইনের থাকবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারাও দায়ী হবে। তবে এখনও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ওটা আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। তিনি আরও বলেন, আইনটা কী হবে সেটা আমরা দেখব। তবে এটা ঠিক, যারাই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের বিরুদ্ধেই আইনটা।

পুরাতন আইন যুগোপযোগী করাসহ নতুন আইন প্রণয়নে কাজ করে আইন কমিশন। এক্ষেত্রে আইনের খসড়া তৈরি করে সুপারিশ আকারে আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় তারা। আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের একটি ড্রাফটিং বিভাগও রয়েছে। সেই বিভাগও নতুন আইনের খসড়া তৈরির কাজ করে।

সরকারের তরফে এ ধরনের কোন উদ্যোগ আছে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাসরিন বেগম বলেন, আমার জানা মতে আমাদের মন্ত্রণালয়ের এমন কোন উদ্যোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তবে আইন কমিশন সুপারিশ দিলে আমরা নিয়ম অনুসারে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

হলোকাস্ট আইন কী ॥ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর পরিচালিত গণহত্যার অস্বীকৃতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব আইনকে সাধারণভাবে ‘হলোকাস্ট ডিনায়াল ল’ বলে। আইনে ইতিহাস বিকৃতি একটি ফৌজদারি অপরাধ। ইতিহাস বিকৃতির জন্য জেল ও আথির্ক জরিমানার বিধান রয়েছে।

হলোকাস্ট সম্পর্কে উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইহুদিসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপকভাবে গণহত্যা চালানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন এডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির (নাৎসি) পরিচালিত গণহত্যায় ৬০ লাখ ইহুদি এবং অনেক সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রাণ হারায়। এ ইতিহাস বিকৃতিরোধে ইউরোপীয় দেশগুলোতে হলোকাস্ট আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এটি সংসদে পাস করা আইন। আইনটি ‘ল এ্যাগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ নামেও পরিচিত।

আইনটি জার্মানি প্রথম প্রণয়ন করলেও ইউরোপের অন্য দেশও প্রণয়ন করেছে। আইনে ৬ বছর কারাদ- ও ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান করেছে কোন কোন দেশ। হলোকাস্ট আইন সম্পর্কে আরও জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে, তাকে অস্বীকার করার চেষ্টা, এমনকি গণহত্যার তীব্রতা লঘু করে দেখার প্রচেষ্টাও এ আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, হলোকাস্টের তীব্রতা নিয়ে, মৃতদের সংখ্যা নিয়ে কোন বিভ্রান্তি বা প্রশ্ন তোলা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর তার এক লেখায় লিখেছেন- ইউরোপীয় দেশগুলোতে ‘ল এ্যাগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ বলে একটা আইন আছে। রীতিমতো সংসদে পাশ করা আইন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে, তাকে অস্বীকার করার চেষ্টা, এমনকি গণহত্যার তীব্রতা লঘু করে দেখার প্রচেষ্টাও এ আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, শুধু তাই নয়, হলোকাস্টের তীব্রতা নিয়ে, মৃতদের সংখ্যা নিয়ে কোন বিভ্রান্তি বা প্রশ্ন তোলা ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ‘হলোকাস্ট’ নিয়ে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন তারা শব্দের মারপ্যাঁচে ‘ডিনায়াল’ বা অস্বীকৃতিকে ‘রিভিশনিজম’ দিয়ে ঢাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হলোকাস্ট নিয়ে ইউরোপীয় আইন সেটিকেও ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ হিসেবে আমলে নেয়ার বিধান করেছে। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যা হয়েছে এবং নাৎসি বাহিনী সেই গণহত্যা চালিয়েছে- এটা সত্য বলে ধরে নিতে হবে। এর বাইরে কোন তত্ত্বের কচকচানি বা পা-িত্য দিয়ে ভিন্ন কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করা যাবে না।

বাংলাদেশে হলোকাস্ট আইনের প্রয়োজনীয়তা ॥ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র শুরু থেকেই দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করে আসছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সম্প্রতি দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তানও বিভিন্ন সময় বলেছে বাংলাদেশে গণহত্যা হয়নি। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় গবেষকদের লেখায়ও বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছে বলে উঠে এসেছে। কোন্ প্রক্রিয়ায়, কোন্ পদ্ধতিতে গণহত্যার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় এবং হয়েছে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে বই লিখেছেন মার্কিন অধ্যাপক রুডলফ জোসেফ রুমেল। তিনি আরজে রুমেল নামে পরিচিত। গণহত্যার সংখ্যা নির্ধারণে তার পদ্ধতি পৃথিবীতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। মার্কিন সিভিল ওয়ার থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গণহত্যার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশের গণহত্যার সংখ্যা নির্ধারণেও একই প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। আরজে রুমেলের ‘স্ট্যাটিসটিক্স ডেমিসাইড’ বইতে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের কোন্ জেলায় কত মানুষ মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার শিকার হয়েণ্ডে তা চার্ট দিয়ে দেখানো হয়েছে। এই বইয়ে দেয়া তথ্য অনুসারেও বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। অথচ এর পরেও বাংলাদেশের এমন একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এ সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, যে দলটির প্রতিষ্ঠাতাও স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পর বাংলাদেশে ইউরোপের আদলে হলোকাস্ট আইন করা জরুরী হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বিশিষ্টজনরা।

সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ইতিহাস বিকৃতি চরমতম অপরাধ। এই বিকৃতি রোধের জন্য জামার্নির মতো হলোকাস্ট আইন করতে হবে। আর ওই আইনের মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিচার করতে পারলে খালেদা-তারেকের মতো আর কেউ ইতিহাস বিকৃতি করে বক্তব্য দেয়ার সাহস করবে না। গাফ্ফার চৌধুরী বলেন, ‘যখনই কোন জাতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র হয়েছে, তখনই ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর ইংরেজরা ইতিহাস বিকৃত করে ২০০ বই লিখেছিলেন। বাঙালীকে ১৫০ বছর এ মিথ্যাচার হজম করতে হয়েছে।’

এই প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনীরা বুঝেছিলেন যে, একজন মানুষকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার আদর্শকে হত্যা করা যায় না। যে কারণে তারা ইতিহাস বিকৃত করা শুরু করল এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিত্যাচার করা শুরু করল। বেগম জিয়া, তারেক রহমান ও জামায়াতের চিন্তাবিদরা এখন সে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আরও বলেন, ‘ইতিহাস বিকৃত কেবল জামায়াত করছে না, সুশীল সমাজও করছে।’ ড. কামাল বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্র নেই। আমি ড. কামালের গণতন্ত্র চাই না, শেখ হাসিনার গণতন্ত্র চাই। এ কথা বলার কারণে অনেকেই হয়ত আমাকে হাসিনার দালাল বলবে কিন্তু আমি তাদের বলতে চাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দালাল হওয়ার চেয়ে শেখ হাসিনার দালাল হওয়া ভাল।’

শহীদ বুদ্ধিজীবী আলিম চৌধুরীর কন্যা ড. নুজহাত চৌধুরী শম্পার দাবিকৃত ইতিহাস বিকৃতি রোধে ‘হলোকাস্ট’ আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিলেতের মতো বাংলাদেশেও হলোকাস্ট আইন চালু করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসের মূল ৫টি বিষয় নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে এমন আইন করতে হবে। আর যারা প্রশ্ন তুলবে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। তিনি আরও বলেন, তারেককে নিয়ে আমার বক্তব্য মিডিয়ায় টুইস্ট করে প্রচারিত হয়েছে। তারেকের সঙ্গে আমার দুইবার দেখা হয়েছে। প্রথমদিন যখন ওকে দেখি তখন মেজর জিয়া বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করলে জিয়া বলেন, পড়াশোনা তো করেই না, মেয়েদের টিস করে। ও একটা কুলাঙ্গার। কিন্তু মিডিয়ায় ‘টিস’ শব্দটি কিস হয়ে গেছে।