১৫ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আজ বড়দিন মেরি ক্রিসমাস

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আজ ২৫ ডিসেম্বর শুভ বড়দিন, ক্রিসমাস ডে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। দুই হাজারেরও বেশি বছর আগে এদিনেই জেরুজালেমের কাছে বেথেলহেমে মা মেরির গর্ভে জন্ম নেন যিশুখ্রিস্ট। যিশুখ্রিস্টের প্রেম ও মানবিকতার বাণীতে প্রভাবিত হয়ে সব মানুষকে আপন করার দিন। আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি তাঁর শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেয়া বড় দিনের শিক্ষা। এদিকে খ্রীস্টান সম্প্রদায় বিশেষত যাজকদের ওপর জঙ্গী মৌলবাদীদের হামলাসহ একের পর এক হত্যার হুমকির প্রেক্ষাপটে এবার কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেশে উদযাপিত হচ্ছে দিনটি। জঙ্গীবাদী কর্মকা-ে খ্রীস্টান সম্প্রদায়সহ শান্তিপ্রিয় মানুষের মাঝে আতঙ্ক যেমন আছে তেমনি সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানে স্বস্তিও আছে।

বড়দিন উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের সকল গীর্জায় ইতিমধ্যে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নেয়া হয়েছে আরও বেশ কিছুৃ পদক্ষেপ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বলেছেন, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব বড়দিন আর ‘থার্টিফার্স্ট’ নাইট নিয়ে এবার গোয়েন্দা নিরাপত্তার পাশাপাশি রাস্তায় টহলসহ ‘দৃশ্যমান’ নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বড়দিনে বিভিন্ন গীর্জা ও খ্রীস্টান অধ্যুষিত এলাকা এবং ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার কূটনৈতিক পাড়াসহ বিশেষ কয়েকটি এলাকা ‘বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায়’ আনা হবে। বিদেশী নাগরিকদের জন্যও থাকছে বাড়তি নিরাপত্তা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ তার বাণীতে বড়দিন উপলক্ষে দেশের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীসহ দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মানবজাতিকে কল্যাণ ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে যুগে যুগে যেসব মহামানব পৃথিবীতে এসেছেন তাঁদের মধ্যে যিশুখ্রিস্ট অন্যতম। তিনি মানুষকে সত্য, ন্যায় ও সম্প্রীতির পথে চলার আহ্বান জানিয়েছেন, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যলাভের পথ দেখিয়েছেন। আবহমান কাল থেকে এদেশের মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। এদেশের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে যে ভূমিকা রাখছে তা প্রশংসনীয়। বাণীতে তিনি সুখীসমৃদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠনে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খ্রীস্টান সম্প্রদায়সহ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে মানবতার মহান ব্রতে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের সকল সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বলেন, এখানে রয়েছে সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিজস্ব ধর্ম পালনের পূর্ণস্বাধীনতা। তিনি আশা করেন, বড়দিন দেশের খ্রীস্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিরাজমান সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে। তিনি বলেন, খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশু খ্রিস্ট এ দিনে বেথেলহেমে জন্মগ্রহণ করেন। শোষণমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য পৃথিবীতে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল যিশু খ্রিস্টের অন্যতম ব্রত। বিপন্ন ও অনাহারক্লিষ্ট মানুষের জন্য মহামতি যিশু নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর জীবনাচারণ ও দৃঢ় চারিত্রিক গুণাবলীর জন্য মানব ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রী আনন্দময় ও উৎসবমুখর বড়দিনে খ্রীস্টানধর্মাবলম্বী জনসাধারণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এমপি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতীয় পার্র্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি ও প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মোহাম্মদ কাদের। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বের সকল খ্রিস্ট ধর্মের মানুষের কাছে দিবসটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

উৎসবের নানা আয়োজন ॥ অন্যরা দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা আর আনন্দঘন পরিবেশে দিনটি উদযাপন করা হচ্ছে। দেশের ক্যাথলিক-প্রটেস্ট্যান্টদের সকল গীর্জা রঙিন বাতি আর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।

সুন্দরভাবে বসানো হয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। ঢাকার পাঁচতারকা হোটেলগুলো সেজেছে আরও বর্ণময় সাজে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে আছে নানা আয়োজন। খ্রীস্টানদের ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ।

যীশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে নিজেদের আনন্দ উৎসবের আলোয় ভরিয়ে তুলতে মাসব্যাপী প্রস্তুতি শেষ করেছে খ্রীস্টান সম্প্রদায়। এখন কেবল রাত পেরোনোর অপেক্ষা। অতিথি আপ্যায়নে কোন ত্রুটি না রাখতে এরই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছে বাহারি পিঠাপুলি, কেক আর পায়েস। আর বড়দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সান্তা ক্রুশের উপহার পেতে উদগ্রীব হয়ে আছে শিশুরা। আনন্দমুখর এই উৎসবকে ঘিরে বিশেষ আয়োজনে আর সাজসজ্জায় পিছিয়ে নেই রাজধানীর অভিজাত হোটেলগুলোও। পাঁচ তালকা হোটেলগুলোতে আজ দিনভর থাকছে নানা অনুষ্ঠান। হোটেলে শিশুদের জন্য খেলার প্রতিযোগিতা, ফ্যাশন শো ও জাদু প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। থাকছে ‘চিলড্রেন পার্টি’। হোটেলের সামনের লবিতে বানানো হয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। বাহারি আলোয় ঝলমল করছে ট্রি। একে ঘিরে আছে শত উপহার সামগ্রী। আছে চকোলেট হাউস। সাজানো হয়েছে ক্যাফে বাজার রেস্টুরেন্ট। আছে বিশেষ কেক ও কুকিজের ব্যবস্থা। স্পেশাল ও মুখরোচক খাবারের পাশাপাশি থাকছে সান্তা ক্লজ, ফ্লেইকস, মিকি-মিনি, ম্যাজিক শো, পাপেট শো, মিনি চিড়িয়াখানা, লাইভ পিয়ানো মিউজিক ও কিডস পুল পার্টি। আজ সকালে সারা দেশের বিভিন্ন গীর্জায় থাকছে বিশেষ প্রার্থনা। রমনা সেন্ট মেরিস ক্যাথেড্রাল, তেজগাঁও ক্যাথলিক গীর্জা, মিরপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চসহ রাজধানীর বিভিন্ন চার্চে বিশেষ প্রার্থনা হবে সকালে।

জঙ্গী হামলা, উদ্বেগ ও নিরাপত্তা ॥ অন্যান্য বছর ভয়ের পরিবেশ তেমন ছিলনা। তবে এবার গত কয়েক মাসের পরিকল্পিত জঙ্গী সন্ত্রাসী হামলায় প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। এবার প্রগতিশীল শক্তির ওপর উগ্রবাদীদের হামলা ছাড়াও খ্রীস্টান যাজকদের ওপর একের পর এক হামলা হয়েছে। বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত কয়েক মাসে পাবনায় যাজককে জবাই করে হত্যা চেষ্টা ছাড়াও দিনাজপরে আক্রমণ হয়েছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বেশ কয়েকজন যাজককে। খুলনায় যাজককে জেএমবি পরিচযে হত্যার হুমিক দেয়া হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে মোবাইল ফোনে তাদের এ হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। দিনাজপুরে ক্যাথলিক চার্চের ফাদার কার্লোসকে আইএস পরিচয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। লালমনিরহাটের এক চার্চের যাজককে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে (আইএস) নামেই। সিলেট ক্যাথলিক চার্চের বিশপ বিজয় এনডি ক্রুজ ওমি ও শ্রীমঙ্গল খ্রীস্টান মিশনের যাজক ফাদার সুব্রত বনিফাস টলেন্টিনোকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে।

প্রেক্ষাপটে খ্রীস্টান এ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ গীর্জাগুলোতে গতবছরের চেয়ে বাড়তি ও দৃশ্যমান নিরাপত্তার দাবি জানায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন আয়োজনে সার্বজনীন নিরাপত্তা নিশ্চিদ্র করার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাটও। ছুটিতে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে তিনি ওই তাগিদ দেন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার রাজধানীসহ দেশের সব গীর্জায় ইতিমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে রাজধানীর সব গীর্জার ফাদার ও পাদ্রি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, গীর্জার থানা এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম সার্বক্ষণিক টহল দেবে। দমকল বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। এছাড়া স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ, প্রতিটি গীর্জায় সিসি ক্যামেরা ও গীর্জার পক্ষ থেকে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার জানান, বড়দিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বড়দিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে মাঠে থাকবেন র‌্যাবের সদস্যরাও। গীর্জার আশপাশের স্থানসহ র‌্যাবের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডগ স্কোয়াড, ডিসপজাল টিম।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ভেতরে ও প্রবেশ পথগুলোতে বসছে শতাধিক চেকপোস্ট। চার্চের আশপাশের ছাদে বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। একাধিক গোয়েন্দা দল ঢাকার চার্চগুলোসহ আশপাশের এলাকায় তৎপর থাকছে। এছাড়া মহিলা গোয়েন্দা পুলিশেরও একাধিক দল থাকছে চার্চগুলোতে।