২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বধ্যভূমি সংরক্ষণ

  • এবিএম খায়রুল হক

রমনা রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহ্্রাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৪৮ সন হইতে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত জনসভাগুলি এবং ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে ঐ উদ্যানেই অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান বাংলাদেশ সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হইয়াছে।

দরখাস্তকারী পক্ষে দাবী করা হইয়াছে যে, উক্ত জনসভাগুলি এবং আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছে এবং সেই কারণে এই স্থানগুলি ২৪ অনুচ্ছেদে ব্যক্ত ঐতিহাসিক স্থান। কাজেই উক্ত স্থানগুলি রক্ষণাবেক্ষণকরণ সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

প্রতিবাদী সরকার পক্ষে উপস্থিত বিজ্ঞ এ্যাটর্নি জেনারেল মহোদয় দরখাস্তকারীর পক্ষে উত্থাপিত দাবীর প্রতিবাদ করেন নাই, বরঞ্চ একমত পোষণপূর্বক সমর্থন করিয়াছেন।

বিশ্বের ইতিহাসের প্রতি দৃকপাত করিলে প্রতীয়মান হইবে যে সেই প্রাচীনকাল হইতে রাজা-বাদশাগণ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করিয়া গিয়াছেন। ঐ সকল স্থাপনা তদানীন্তন সভ্যতার সাক্ষ্য বা নিদর্শন হিসাবে রহিয়াছে এবং ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে প্রাচীন মিশরের পিরামিড, স্ফিংস ও ফারাওদের মূর্তি, গ্রীক ও রোমক সভ্যতার বিভিন্ন স্থাপনা উল্লেখযোগ্য। আবার অনেক স্থাপনা রহিয়াছে যাহা রাষ্ট্র বা ব্যক্তি বিশেষের প্রয়োজনে নির্মাণ করা হইয়াছিল কিন্তু পরবর্তীতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করিয়াছে। যেমন চীন দেশের সুদীর্ঘ প্রাচীর বা উত্তর ইংল্যান্ডের হ্যাড্রিয়ানের প্রাচীর। অনেক সময় সাধারণ স্থাপনাও প্রাচীনত্বের কারণে ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে, যেমন হরপ্পা-মহেনজো দাড়ো, রোমক লন্ডিভিয়াম (লন্ডন) এ খৃষ্টপূর্বের বিভিন্ন স্থাপনা। আমাদের দেশেও নরসিংদীর নিকট প্রাপ্ত উয়ারী বটেশ্বর বা কুমিল্লার ময়নামতি বা বগুড়ার মহাস্থানে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনা আবিষ্কৃত হইয়াছে। মধ্যপ্রাচ্যেও বিভিন্ন স্থানে বিলুপ্ত নগরীর নিদর্শন পাওয়া যায়। হাজার হাজার বৎসর পূর্বের বিভিন্ন সভ্যতার সময় নির্মিত বিলুপ্ত নগরীগুলি প্রতœতত্ত্ববিদগণ অত্যন্ত যতেœর সহিত খনন করতঃ ইহাদের পুরাতন স্মৃতি পুনরুদ্ধার করিবার কার্যে নিয়োজিত। তাহাদের আবিষ্কৃত একটি সাধারণ হাম্মামখানা বা স্নানাগারও ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে, কারণ ঐ স্নানাগারটি প্রমাণ করে যে ঐ সময়কার মানুষ পৃথক স্নানাগার ব্যবহার করিবার মত সভ্য ছিল। বিশ্বের বহু জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের স্থানগুলি ঐতিহাসিক স্থান বলিয়া চিহ্নিত হইয়াছে। ৬২৪ সনে অনুষ্ঠিত বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে বলা হয় যে, উক্ত যুদ্ধ মানবসভ্যতার ইতিহাস পরিবর্তন সাধন করিয়াছে কাজেই আবশ্যিকভাবেই উক্ত যুদ্ধ ঐতিহাসিক এবং যুদ্ধে স্থান একটি ঐতিহাসিক স্থান। ১০৬৬ সনে the Battle of Hasting G William the Conquerer Saxon King Harold কে পরাজিত করিয়া ইংল্যান্ড দখল করেন। ঐ ঘটনা ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের পরিবর্তন সূচনা করে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ঐধংঃরহম-এর যে স্থানে করহম ঐধৎড়ষফ চক্ষুতে তীরবিদ্ধ হইয়া ঘোড়া হইতে পতিত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন, সেই স্থানটি ঐতিহাসিক স্থানরূপে চিহ্নিত রহিয়াছে।

১২১৫ সনে ইংল্যান্ডের রাণী মিড্্ নামক স্থানে ইংল্যান্ডের রাজা ঔড়যহ-ওও তাহার রাজ্যের জমিদার ও বিশপদের সহিত একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। ইহাই পৃথিবী বিখ্যাত গধমহধ ঈধৎঃধ।

বিশ্বের বহু স্থানে প্রিয়জনদের স্মৃতি রক্ষার্থে নৃপতিগণ বিশাল ও বিভিন্ন আকারের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করিয়াছেন। ভারতবর্ষে সম্রাট শাহজাহান তাহার স্ত্রী মমতাজ বেগমের স্মৃতি রক্ষার্থে তাজমহল নির্মাণ করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শুধু মোগল সাম্রাজ্য নয়, ইহা বিশ্ব সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

ভাষণ সংক্রান্ত আলোচনায় বলা যায় যে, সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসকি ভাষণ হইল ৬৩২ সনে মক্কা শরীফের নিকটবর্তী আরাফাত ময়দানে হযরত মোহাম্মদ (দরুদ ও সালাম) প্রদত্ত বিদায় হজ্বের শেষ ভাষণ। ঐ ভাষণে তিনি মানবমুক্তির বাণী শুনাইলেন। ভাষণের শেষ ভাগে আল্লাহর নবী জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে আল্লাহ আমি কি তোমার নির্দেশ যথার্থভাবে ঘোষণা করিয়াছি?” সমবেত লক্ষাধিক উম্মত একবাক্যে আওয়াজ তুলিলেন, “হ্যাঁ, হে আল্লাহর নবী!।” ইতিহাস সৃষ্টি হইল। উপরোক্ত ভাষণ অতুলনীয় ও স্বর্গীয়।

ইতিহাসের দিকে দৃকপাত করিলে আমরা দেখিব যে, খৃষ্টের জন্মের ৩৯৯ বৎসর পূর্বে সক্রেটিস বিচারে দোষী সাব্যস্ত হইয়া হেমলক পানে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াইয়া এ্যাথেন্সবাসীদের সম্মুখে এক অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন। যাহা তিনি শেষ করেন `It is nwo time to depart, for me to die , for you to live. But which of us is going to a netter state is unknown to everyone but God.

২৩ শত বৎসর পর ১৮৬১ সনে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়। ১৮৬৩ সনে এবঃঃুংনঁৎম শহরের নিকট এক যুদ্ধে ইউনিয়ন বাহিনী জয়লাভ করিলেও বহু সৈন্য প্রাণ হারায়। যুক্তরাষ্ট্রে তখনও কোন জাতীয় সমাধিক্ষেত্র ছিল না। এবঃঃুংনঁৎম শহরের এর একজন নামজাদা এ্যাটর্নি উধারফ ডরষষং একটি জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তা সর্ব প্রথম উপলব্ধি করেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, এবঃঃুংনঁৎম যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অংশ এই পবিত্র সমাধিক্ষেত্রের জন্য উৎসর্গ করা হইবে। এই উৎসর্গ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা খ্যাতিমান বক্তা ঊফধিৎ ঊাবৎবঃঃ কে প্রধান বক্তা হিসাবে মনোনীত করা হয়। ১৯শে নভেম্বরের উৎসর্গ অনুষ্ঠানে তিনি সোয়া দুই ঘণ্টা বক্তৃতা প্রদান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসাবে জাতীয় সমাধিক্ষেত্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করিবার পূর্বে দধ ভবি ধঢ়ঢ়ৎড়ঢ়ৎরধঃব ৎবসধৎশং’ প্রদান করিবার জন্য অনৎধযধস খরহপযষহকে আমন্ত্রণ জানান হয়। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলিবার জন্য ক্যামেরা সেট্্ করিবার পূর্বেই তিনি তাহার ভাষণ শেষ করেন এই বলিয়া যে, ‘... that government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth.

কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত ভাষণের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সর্বত্রই প্রবলভাবে সমালোচিত হন। কিন্তু পরবর্তীতে সকলে তাঁহার বক্তৃতার গুরুত্ব ও মর্মার্থ উপলব্ধি করিয়া শিহরিত হয়। ভাষণটি ঐতিহাসিক গুরুত্বলাভ করে এবং ইতিহাসে পরিণত হয়। সেই সঙ্গে এবঃঃুংনঁৎম জাতীয় সমাধিক্ষেত্র ঐতিহাসিক স্মৃতি নিদর্শনে পরিণত হয়। যে স্থানে অনৎধযধস খরহপযষহ ভাষণ প্রদান করিয়াছিলেন সেখানে তাঁহার একটি আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ করতঃ বিশাল একটি স্মৃতিসৌধ গড়িয়া তোলা হইয়াছে। সেই স্থানে পূর্ণ ভাষণটি মুদ্রিত করিয়া রাখা হইয়াছে। ইহা এখন বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের একটি তীর্থস্থানে পরিণত হইয়াছে।

প্রায় একশত বৎসর পর, ওয়াশিংটনের খরহপড়ষহ গবসড়ৎরধষ এর সম্মুখে ১৯৬৩ সনে ২৮শে অগাস্ট তারিখে জবা. গধৎঃরহ খঁঃযবৎ করহম, ঔজ. এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় বলেন দও যধাব ধ ফৎবধস ঃযধঃ ড়হব ফধু ঃযরং হধঃরড়হ রিষষ ৎরংব ঁঢ় ধহফ...’। নিঃসন্দেহে ইহা একটি ঐতিহাসিক ভাষণ।

উপরে বিভিন্ন স্থাপনা, বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন ভাষণের উল্লেখ করা হইয়াছে। প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত স্থাপনাগুলি যখন নির্মাণ করা হয় তখন সংশ্লিষ্ট কোন ব্যক্তিই মনে করেন নাই যে তাঁহারা ইতিহাস সৃষ্টি করিতেছেন বা তাঁহাদের কর্ম ঐতিহাসিক। তাঁহাদের কার্যের বহু পরে পৃথিবীর সভ্যতার উপর সংশ্লিষ্ট কর্মের প্রভাব বিশ্লেষণ করিয়া ঐতিহাসিকগণ ঐগুলিকে ঐতিহাসিক গণ্য করিয়াছেন। এইভাবেই যুগে যুগে বিভিন্ন স্মৃতি নিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহ ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যম-িত হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হইয়াছে।

উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ঐতিহাসিক স্থান বা সমাধিসৌধ সংরক্ষণ সম্বলিত কোন অনুচ্ছেদ বা বিধান না থাকিলেও প্রায় প্রতিটি স্টেট এই সংক্রান্ত আইন পাস করিয়াছে। তাহা ছাড়া, ১৮৯৫ সনে কংগ্রেস Gettysburg National Military চধৎশ আইন প্রণয়ন করে।

বাংলাদেশে সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ ব্যতিরেকে তেমন কোন আইনের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

পূর্বে স্মৃতিসৌধ এবং প্রতœতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক অথবা শৈল্পিক তাৎপর্যম-িত বস্তু রক্ষার্থে অহপরবহঃ গড়হঁসবহঃং চৎবংবৎাধঃরড়হং অপঃ, ১৯০৪ (অপঃ ঠওও ড়ভ ১৯০৪) ছিল। পরবর্তীতে ঞযব অহঃরয়ঁরঃরবং অপঃ, ১৯৬৮ (অপঃ ঢওঠ ড়ভ ১৯৬৮) প্রণীত হয়। উক্ত আইন পাকিস্তানের ১৯৬২ সনের সংবিধানের ১৩১ অনুচ্ছেদের আওতায় প্রণীত হইয়াছে বলিয়া প্রস্তাবনায় বর্ণনা করা হইয়াছে যাহা ভ্রমাত্মক বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে।

বর্তমান রীট মোকদ্দমায় সর্বমোট ৫টি ভাষণ ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যম-িত বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। রমনা রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই উক্ত ভাষণগুলি প্রদান করা হইয়াছিল। দরখাস্তকারীপক্ষে প্রার্থনা করা হয় যে একটি কমিটি মারফত উক্ত ভাষণ প্রদানের স্থানগুলি চিহ্নিত করতঃ ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ আন্তর্জাতিক মানে নির্মাণ করিয়া রক্ষণাবেক্ষণ করা।

প্রথমেই ১৯৪৮ সনের ২১শে মার্চ তারিখে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্্র ভাষণ। জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান অর্জন সম্ভব হইয়াছিল। তাহাকে মাত্র এক নজর দেখিবার জন্য রমনা রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমাগম হইয়াছিল। জিন্নাহ নূতন দেশ পাকিস্তান সম্বন্ধে কিছু নীতিনির্ধারণী বক্তব্য প্রদান করেন কিন্তু তিনি যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা শুধুমাত্র উর্দু হইবে বলিয়া ঘোষণা প্রদান করেন তখন উপস্থিত বিশাল জনতা স্তম্ভিত হইয়া যায়।

উল্লেখ্য যে, বাঙালি মুসলমানগণের ভোটের শক্তিদ্বারা সমগ্র ভারতবর্ষের মুসলমানগণের স্বার্থ রক্ষিত হইত। ১৯৪০ সনে সমগ্র ভারতবর্ষে মুসলিম লীগ হইতে নির্বাচিত একমাত্র বাংলার বাঙালি প্রধানমন্ত্রী শেরে ই বাংলা একে ফজলুল হক বিখ্যাত লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৬ সনের নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যুতে বাংলার মুসলমানগণ ৯৭% ভোট মুসলিম লীগকে প্রদান করে। একইভাবে ১৯৪৬ সনে ভারতবর্ষে একমাত্র নির্বাচিত বাংলার আর এক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্্রাওয়ার্দী দিল্লী কনভেনশনে একক পাকিস্তানের প্রস্তাব রাখেন। পাকিস্তান স্বাধীন হইবার পর ঈড়হংঃরঃঁঃবহঃ অংংবসনষু তে পূর্ববঙ্গের অংশ হইতে ৬টি সদস্য পদ অবাঙালিদের ছাড়িয়া দেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানের ৫৬% অধ্যুষিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা ভাষাকেও পরিত্যাগ করিবার ঘোষণা শুনিয়া বাঙালি মানসে ৫০ বৎসর স্বাধীনতা সংগ্রামের পর বিশাল একটি ধাক্কা খায়। স্বপ্নের পাকিস্তান সম্বন্ধে তাহাদের যে ধারণা ছিল তাহাতে এই প্রথমবারের মতো একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া (ঘবমধঃরাব রসঢ়ধপঃ) সৃষ্টি করে। এই ঘটনা হইতেই ভাষা আন্দোলন বেগবান হয় পরবর্তীতে স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।

এই সকল কারণে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৮ সনের ২১ মার্চ তারিখে তদানীন্তন রমনা রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত জিন্নাহর ভাষণের একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য রহিয়াছে।

তৎপর, ১৯৬৯ সনের ২৩ ফেব্রুয়ারী তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণকে ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ বলিয়া দাবি করা হইয়াছে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান সৃষ্টি হইবার পর হইতে এ দেশে কোন দিনই গণতন্ত্র চর্চা হয় নাই। জোড়াতালি দিয়া ১৯৫৬ সনে একটি সংবিধান রচিত হইল বটে কিন্তু দুই বৎসরের মাথায় দেশে প্রথম মার্শাল ল জারী হওয়ায় গণতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়। দেশে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হয় পূর্ববঙ্গের ন্যায্য অংশ প্রাপ্তির আশা। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সনে শেখ মুজিব পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাইবার দাবী সম্বলিত ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলন দুর্বারভাবে গড়িয়া তোলেন। আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় ইহার জবাব দিবার হুঙ্কার প্রদান করেন। শেখ মুজিবকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়, প্রমাণ হইলে যাহার শাস্তি ছিল মৃত্যু। বাংলার মানুষের প্রবল আন্দোলনের মুখে উক্ত মামলা পাকিস্তান সরকার প্রত্যাহার করিতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিব ১৯৬৯ সনের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। পূর্বে পশ্চিম পাকিস্তানের ৪টি প্রদেশ লইয়া একটি ইউনিট করতঃ পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতা খর্ব করা হইয়াছিল। ২৩শে ফেব্রুয়ারিতে রমনা রেসকোর্স ময়দানে তিনি এই সর্বপ্রথম জনসংখ্যার ভিত্তিতে (ধফঁষঃ ভৎধহপযরংব) প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ নির্বাচন দাবী করেন। তিনি উভয় প্রদেশের মধ্যে পূর্বে আরোপিত সংখ্যাসাম্য বাতিল দাবী করেন এবং ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের দাবী জানান। উক্ত ভাষণেই তিনি ১৯৪০ সনের লাহোর প্রস্তাবের আঙ্গিকে সর্বপ্রথম পাকিস্তানে কনফেডারেশনের ইঙ্গিত প্রদান করেন।

১৯৪৬ সনে অনুষ্ঠিত দিল্লী কনভেনশন হইতে একক পাকিস্তানের যে ভাবধারায় পাকিস্তান সৃষ্টি হইয়াছিল ১৯৬৯ সনের ২৩শে ফেব্রুয়ারি তারিখের ভাষণ তাহা হইতে সম্পূর্ণ এক নূতন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এই প্রথম পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকারের দাবী প্রবলভাবে উত্থাপিত হইল। এই সকল কারণে বাংলার প্রেক্ষাপটে ইহার ঐতিহাসিক তাৎপর্য রহিয়াছে।

তৎপর আমরা ১৯৭১ সনের ৩রা জানুয়ারি তারিখের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্বন্ধে আলোকপাত করিব।

আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সনের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৪৬ সনের নির্বাচনে মুসলিম লীগ কর্তৃক দাবীকৃত পাকিস্তান ইস্যুর ন্যায় ১৯৭০ সনের নির্বাচনে ৬ দফা দাবী ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচন ইস্যু। এই ৬ দফার দাবীর ভিত্তিতেই পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশের জন্য দাবী করা হইয়াছিল। আওয়ামী লীগের এই বিশাল নির্বাচনী বিজয় ৬ দফার প্রতি এই দেশের মানুষের নিরংকুশ সমর্থন বলিয়া পরিগণিত হয়। কাজেই রাজনৈতিক দল হিসেবে ৬ দফা কার্যকরকরণ এবং ৬ দফার ভিত্তিতেই সংবিধান প্রণয়ন আওয়ামী লীগের অবশ্য কর্তব্য ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সন হইতেই পাকিস্তানের রাজনীতি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে মসিলিপ্ত ছিল। এমনকি ১৯৫৪ সনে যুক্তফ্রন্টের ভূমিধ্বস বিজয়ের পরেও তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব হয় নাই, অতি স্বল্পকাল মধ্যেই গভর্নরের শাসন পূর্ব বাংলায় আরোপ করিয়া গণতন্ত্র চর্চা পুনরায় নস্যাৎ করা হয়। এই সকল কারণেই শেখ মুজিব তাঁহার প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায় ষড়যন্ত্র হইতে সাবধান করিয়াছেন।

১৯৭০ সনের নির্বাচনের সময় ও পরে মার্শাল ল চলিতেছিল। তাহার পরেও আওয়ামী লীগের এইরূপ ভূমিধ্বস নির্বাচনী বিজয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে ৬ দফা ও আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে সতর্ক করিয়া তোলে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বও উপলব্ধি করিতে পারে যে সামরিক জান্তা যে কোন উপায়ে এদেশের মুক্তি সূত্র ৬ দফা দাবীকে প্রতিহত করিতে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইতে পিছপাও হইবে না।

এমত অবস্থায় আওয়ামী লীগ হইতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ যেন ৬ দফা দাবীর অঙ্গীকার হইতে কোন ভাবেই বিচ্যুৎ না হইতে পারেন সে কারণে প্রকাশ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মুখে সকল নেতৃবৃন্দ ৬ দফাকে সমুন্নত রাখিবার জন্য শপথ গ্রহণ করেন।

এই শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বাঙালির নিকট প্রতিশ্রুত ৬ দফা দাবী হইতে বিচ্যুৎ হইবার সকল পথ শেখ মুজিব সজ্ঞানে বন্ধ করেন।

৬ দফা দাবীর ব্যাপারে যে কোন প্রকার সমঝোতার অবকাশ নাই তাহা তিনি সকলকে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করান।

এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর সামরিক জান্তা প্রমাদ গোনে যে, ৬ দফা দাবী গৃহীত হইলে পাকিস্তান রাজনীতিতে তাহাদের প্রাধান্য লোপ পাইবে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর সামরিক জান্তা যে তাহার উপর ক্ষিপ্ত হইবে তাহা শেখ মুজিব ভালভাবেই জানিতেন কিন্তু তাহার পরেও এই পদক্ষেপ ইচ্ছাকৃত ভাবে গ্রহণ করিয়া ৬ দফা দাবীকে একটি চড়রহঃ ড়ভ হড় ৎবঃঁৎহ পরিস্থিতিতে লইয়া আসেন যাহাতে ৬ দফা পরিপূর্ণ বাস্তবায়নকরত বাঙলা সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনপ্রাপ্ত হইবে অথবা ৬ দফা ১ দফায় পরিণত হইবে। তিনি এইভাবে জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করিতে ছিলেন।

প্রকৃত পক্ষে কোন রাজনৈতিক দল কর্তৃক তাহাদের দাবী লইয়া এইরূপ প্রাকাশ্য শপথ গ্রহণ করিবার কোন নজির পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে আর নাই। এখানেই এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ঐতিহাসিক চরিত্র।

ইহার পর আসে ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ তারিখের ভাষণ প্রসঙ্গ। নিঃসন্দেহে ইহা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ।

১লা মার্চ তারিখে ৩রা মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠী উপলব্ধি করে যে ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন সুদূর পরাহত। মুহূর্তে জনগণ নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাধীনতার দাবী লইয়া রাস্তায় নামিয়া আসে। এখানেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কৃতিত্ব ও সাফল্য। গত দুই যুগ ধরিয়া তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে যেভাবে প্রস্তুত করিয়াছিলেন জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার প্রত্যাশা মতে বাঙালি সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাধীনতা দাবী করিল।

এই দাবীর প্রেক্ষাপটে বিগত ২৩ বৎসরের বঞ্চনা ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস বর্ণনা করতঃ শেখ মুজিব ঘোষণা করিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সামরিক জান্তাকে সতর্ক হইবার সুযোগ না দিয়াই তিনি বাঙলার জনগণকে এইভাবে স্বাধীনতার ডাক দিলেন

Friends, Romans, countrymen, lend me your ears;

...

Put a tongue.

In every wound of caesar, they should move.

The stones of Rome to rise and mutiû.

নিঃসন্দেহে ইতিহাস সৃষ্টি হইল।

এবার ১৯৭২ সনের ১০ই জানুয়ারি সভা প্রসঙ্গ। ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হইল। কিন্তু এই মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের এক জেলখানায় ফাঁসির দ-প্রাপ্ত আসামি হিসাবে অন্তরীণ ছিলেন। বিজয় হইয়াও বিজয় সম্পূর্ণ হয় নাই।

সমগ্র বিশ্বের চাপে অবশেষে পাকিস্তান সরকার ১৯৭২ সনের ৮ই জানুয়ারি তারিখে শেখ মুজিবকে মুক্তি দান করিয়া লন্ডনে প্রেরণ করে। ১০ই জানুয়ারি তিনি দিল্লী হইয়া ঢাকায় আগমন করেন। দিল্লী বিমানবন্দরে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে বাংলাদেশের জাতির জনক হিসাবে স্বাগত জানান।

দ্বিপ্রহরে ঢাকা বিমানবন্দরে তিনি আগমন করিলে স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ জনতা তাহাদের রাষ্ট্রপতিকে অতুলনীয় এক প্রাণঢালা সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করে। বাংলার বিজয় এইবার সম্পূর্ণ হয়।

উল্লেখ্য যে, বাঙালির সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, কৃষ্টি, সর্বোপরি ইতিহাস যাহা একটি জনগোষ্ঠিকে জাতি হিসাবে স্বীকৃতি দেয় তাহার সব কয়টি উপাদান থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সামরিক জান্তা সবসময় বাঙালির জাতিসত্তা অস্বীকার করতঃ পাকিস্তানের কলোনী হিসাবে এই প্রদেশকে ব্যবহার করিত। শেখ মুজিব তাঁহার রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভ হইতেই এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তৎপর ৬ দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের দাবী ও তৎপর তাঁহার নেতৃত্বেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়।

বিমানবন্দর হইতে তিনি সরাসরি রমনা রেসকোর্স ময়দানে আগমন করেন। সেখানে অপেক্ষমাণ লক্ষ জনতার সম্মুখে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসাবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মহান আদর্শ ঘোষণা করেন। এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করিয়াই পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়।

বাংলার মানুষের এই নিখাদ প্রাণঢালা ভালবাসা এবং এই বিজয়ের মাধ্যমে ৭ই মার্চের ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই ঘোষণার সাফল্যম-িত বিজয় ঘোষণা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ঘোষণা সম্পর্কিত ১৯৭২ সনের ১০ই জানুয়ারির জনসভা ও ভাষণ উভয়কেই ঐতিহাসিক তাৎপর্য প্রদান করিয়াছে। অতঃপর, ১৯৭২ সনের ১৭ই মার্চের জনসভা। ঐদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা আগমন করেন এবং সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ প্রদান করেন।

১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে যখন মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হইল তখন বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ একাকী। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অত্যাচারে নিপীড়িত জনগণ বাংলাদেশের তিন দিকে অবস্থিত ভারতীয় প্রদেশগুলিতে প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব অবস্থায় আশ্রয় লইতেছিল। ঐ সময় পাকিস্তান সামরিক জান্তার প্রবল প্রতিবাদের মুখেও ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দিয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান করিয়া তাহাদের জীবন রক্ষা করেন। বাংলাদেশের বক্তব্য উপস্থাপন এবং শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা করিবার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি ছুটে বেড়ান। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তদানীন্তন যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের পক্ষে তাঁহার বক্তব্য শুধু আগ্রাহ্য নয়, তাঁহাকে অবমাননাও করে। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের জন্য সেই অবজ্ঞা উপেক্ষা করিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের নিকট আবেদন রাখেন।

দুইশত বৎসর পূর্বে ফ্রান্স যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় সহায়তা প্রদান করিয়াছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও ভারত সরকার অনুরূপ সহায়তা প্রদান করে। প্রকৃত পক্ষে বাঙালি শরণার্থীগণের জীবন রক্ষা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে উভয় ক্ষেত্রেই ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও অবদান অপরিসীম। উল্লেখ্য যে, ভারত সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। আরও উল্লেখ্য যে, ইন্দিরা গান্ধীই প্রথম সরকারপ্রধান যিনি বাংলাদেশে আগমন করেন।

তাহা ছাড়া, ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মাটিতে উপস্থিত হইবার পূর্বেই ১২ই মার্চ তারিখের মধ্যে মিত্র বাহিনীর শেষ সৈনিকটিও প্রত্যাবর্তন করে। ইন্দিরা গান্ধী কথায় ও কাজে ভারতকে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু দেশ হিসাবে উপস্থাপন করিতে সক্ষম হন।

১৭ই মার্চ তারিখে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের স্বাগত ভাষণের উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে বিকশিত হইবার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

প্রকৃত পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকায় আগমন এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। অতঃপর আমরা ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখের বিজয় দিবসের তাৎপর্য আলোচনা করিব।

২৬শে মার্চ তারিখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মাধ্যমে তাহা পূর্ণতা লাভ করে। ইহা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসে উপরোক্ত দুইটি তারিখ সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দুইটি তারিখই নিঃসন্দেহে ইতিহাস সৃষ্টি করিয়াছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পশ্চিম রণাঙ্গনের যুদ্ধ জার্মানীর আত্মসমর্পণের মধ্যে সমাপ্ত হয়। তবে উক্ত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ১৯৪৫ সনের ৭ই ও ৮ই মে তারিখে দুই দিনে অনুষ্ঠিত হয়।

৭ই মে তারিখে ফ্রান্সের জযবরসং শহরের একটি স্কুল গৃহে জার্মানীর এবহবৎধষ অষভৎবফ ঔড়ফষ আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর প্রদান করেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের কথায় পুনরায় ৮ই মে তারিখে বার্লিন শহরে আর একটি আত্মসমর্পণ দলির স্বাক্ষরিত হয়। এইবার জার্মান পক্ষে স্বাক্ষর করেন ঋরবষফ গধৎঃরধষ ডরষযবষস কবরঃধষ ও অন্য দুইজন। এই ঘটনাই ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে স্থান করিয়া লইয়াছে। তবে ২য় মহাযুদ্ধ ও ইহার সমাপ্তির ইতিহাস শুধু উপর্যুক্ত এই দুইদিনের মধ্যে সীমাবন্ধ নয়। বিশ্বের ঐতিহাসিকগণ ২য় মহাযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিতে গিয়া আবশ্যিকভাবেই লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের হত্যাযজ্ঞের বিবরণ প্রদান করিতে মোটেই কার্পণ্য করেন নাই। তাহারা যুদ্ধ জয় হইতে আর্ত মানবতার ধ্বংসলীলার বর্ণনা অকৃপণভাবে প্রদান করিয়া গিয়াছেন, তাহারা পোল্যান্ডে ও জার্মানীতে অনুষ্ঠিত ঐড়ষড়পধঁংঃ এর বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করিয়া ইহাকে মানব সভ্যতার বর্বরতার ঐতিহাসিক নজীর হিসবে উপস্থাপন করিয়াছেন। জার্মানী ও পোল্যান্ডে অবস্থিত অসংখ্য বধ্যভূমির উপর নির্মিত সমাধি সৌধগুলি সেই বর্বরতার চাক্ষুষ ইতিহাসকে এখনও নগ্নœভাবে প্রদর্শন করিয়া যাইতেছে এবং মানব সভতার নেতিবাচক দিকগুলিকে প্রকটভাবে প্রতিফলিত করিতেছে। নিহত লক্ষ লক্ষ অত্যাচারিত মানুষকে তাহারা অবহেলা বা অপমান না করিয়া তাহাদিগের মৃত্যুকে একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য প্রদান করিয়াছে। এমনকি একটি ১২ বৎসরের বালিকার কাঁচা হাতে লেখা ডায়েরীও ইতিহাসের অমূল্য সম্পদের মর্যাদা পাইয়া বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান ভাষায় অনুবাদিত হইয়াছে। ২য় মহাযুদ্ধের সময় এ দেশেও যে সকল সৈন্য মৃত্যুবরণ করিয়াছিল ব্রিটিশ সরকার তাহাদের জন্যও সমাধি সৌধ নির্মাণ করিয়া এখনও রক্ষণাবেক্ষণ করিতেছে। প্রকৃতপক্ষে, ২য় মহাযুদ্ধে যাহারা প্রাণ হারাইয়াছিলেন সেই সকল দেশের সরকার বিশ্বের সর্বত্র তাহাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করিবার জন্য সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাহাদের অনুগামীগণ যে অত্যাচার, নিপীড়ন, বর্বরতা প্রদর্শন করিয়াছে তাহা জেনারেল নিয়াজীর স্বীকৃত মতেই বুখারা ও বাগদাদে যথাক্রমে চেঙ্গীস খান ও হালাকু খানের বর্বরতার সঙ্গে তুলনীয়। ইহার সামান্য নজির হিসাবে উপরে কিছু বর্ণনা প্রদান করা হইয়াছে বটে কিন্তু প্রকৃত বর্বরতার ইহা খ-িতাংশ মাত্র।

ইহা স্বীকৃত সত্য যে, বাংলাদেশের আনাচে কানাচে বহু জায়গায় গণহত্যা ও বধ্যভূমি রহিয়াছে। ইহার সামান্য কয়েকটির বিবরণ, যেমন : চুকনগর, পাহাড়তলী, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি স্থানের বর্ণনা উপরে প্রদান করা হইয়াছে।

এই সকল লক্ষ লক্ষ নিরাপরাধ ও হতভাগ্য মানুষের কংকালের উপর বিজয় দিবসের মঞ্চ স্থাপিত। আমরা তাহাদের স্মরণ করি বা না করি, সম্মান করি বা না করি তাহারা তাহাদের জীবন দিয়া ইতিহাসে স্থান করিয়া লইয়াছেন। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা নয়, এই লক্ষ লক্ষ কংকালও ইতিহাস। তাহাদের অবহেলা করিয়া স্বাধীনতার কোন ইতিহাসই লেখা সম্ভব নয়। তাহাদের আর্তনাদকে অস্বীকার করিয়া কোন বিজয় দিবস সম্পূর্ণ হইতে পারে না। তাহারা তাহাদের রক্ত দিয়া, সম্ভ্রম দিয়া বিজয় দিবসের ইতিহাসের অংশ হইয়া রহিয়াছে। তাহাদের অস্বীকার করিলে বাঙালি জাতি কৃতঘœ জাতিতে পরিণত হইবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একদিন উক্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ করিবার স্থান পরিদর্শন করিয়া বিপন্ন বিস্ময়ে গর্ববোধ করিবে যে তাহাদের পূর্বপুরুষগণ এই বাংলাদেশ স্বাধীন করিবার জন্য তাহাদের জীবন বিসর্জন দিয়াছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গর্ববোধ করিবে যে, আজ যে স্বাধীনতার সূর্য বিরাজমান তাহা তাহাদেরই অবিস্মরণীয় দান। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও উপলব্ধি করিবে যে, মুক্তিযোদ্ধাগণ যে আদর্শের জন্য তাহাদের নিজেদের প্রাণ অম্নান বদনে বিসর্জন দিয়াছেন সেই আদর্শ অবশ্যই সমুন্নত রাখিবার দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলাদেশের সকলের। তাহাদের মনে রাখিতে হইবে যে, মুক্তিযোদ্ধাগণ সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে তাহাদের জন্যই বাংলাদেশ সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাগণের সেই অতুলনীয় ত্যাগের দান-গ্রহীতা মাত্র। এই কারণেই যে সকল আদর্শের ভিত্তিতে এই বাংলাদেশ সৃষ্টি হইয়াছে, সে আদর্শ পরিবর্তন করিবার অধিকার কাহারো নাই। কারণ এই দেশ অন্য কেহ সৃষ্টি করে নাই।

এই দেশ মুক্তিযোদ্ধাগণ তাঁহাদের রক্তের বিনিময়ে সৃষ্টি করিয়াছেন। মুক্তিযোদ্ধাগণ স্বাধীনতা অর্জন করিয়া ভবিষ্যৎ প্রকৃত মুক্তির পথনির্দেশ প্রদান করিয়া গিয়াছেন এবং প্রকৃত মুক্তি অর্জন করিবার দায়বদ্ধতা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর অর্পণ করিয়া গিয়াছেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে পদচারণা করিয়া পাকিস্তান সৃষ্টি হইবার মাত্র সাত মাস পর হইতে কিভাবে ধাপে ধাপে প্রথমে মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম, তৎপর স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম, তৎপর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়া তাহাদের পূর্বপরুষগণ এই দেশ স্বাধীন করিয়াছেন যেখানে তাহারা এখন গর্বিত বাঙালি পরিচয়ে পদচারণা করিতেছে তাহারা তাহাদের পূর্বপরুষগণের এই গৌরবময় ইতিহাস জানিতে পারিয়া নিজেদেরকে একটি গর্বিত জাতির নাগরিক হিসাবে গর্ববোধ করিবে।

তাহারা এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পদচারণা করিয়া বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানিতে পারিয়া বিশ্বের আরও অনেক স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ন্যায় অহংকার বোধ করিবে। তাহারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের পিছনে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করিয়া প্রেরণা লাভ করিবে এবং মুক্তিযুদ্ধের কষ্টিপাথরে নিজেদের উৎস উপলব্ধি করিবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁহাদের পূর্বপরুষগণের এই মহান কীর্তি স্মরণ করিয়া বিজয় দিবসের স্মৃতিসৌধের সম্মুখে দাঁড়াইয়া কবি শামসুর রাহমানের সহিত উপলব্ধি করিবে :

‘স্বাধীনতা তুমি

রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।

স্বাধীনতা তুমি

কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো

মহান পরুষ, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা-

স্বাধীনতা তুমি

শহীদ মিনারের অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা।

স্বাধীনতা তুমি

পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।

স্বাধীনতা তুমি এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিক্ষেত্র এবং বধ্যভূমি চিহ্নিত করতঃ সংরক্ষণ করিবার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে নির্দেশ প্রদান করা হইতেছে। এই সকল বধ্যভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষ্য হিসাবে সমুন্নত থাকিবে। শতবর্ষ পরে হইলেও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই বধ্যভূমির সম্মুখে দাঁড়াইয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় নিহত তাহাদের পূর্বপরুষগণের আত্মত্যাগকে সম্মান প্রদর্শন করিবে। এই সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে তাহারা একটি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন জাতি হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিবে। এই সকল বধ্যভূমির সম্মুখে দাঁড়াইয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপলব্ধি করিবে যে মুক্তিযোদ্ধাগণের রক্তের বিনিময়ে, সম্ভ্রমের বিনিময়ে তাহারা আজ গর্বিত জাতি। তাহারা স্মরণ করিবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীরমদন, মোহনলালকে, তাহারা স্মরণ করিবে তীতুমীর, প্রফুল্ল চাকি, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদেদ্দার, ইলা মিত্রকে, তাহারা নীরবে স্মরণ করিবে আরো অসংখ্য নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধাদের, তাহারা মনে মনে বলবে-চুপ! আস্তে!! খুব আস্তে, ধীরে, ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল’ এই স্থানে আমাদের বীরগণ চিরনিন্দ্রায় শায়িত!! আমরা ভুলি নাই, আমরা তাহাদের আত্মত্যাগের কথা ভুলি নাই!! ভুলিতে পারি না!!

তাহা হইলেই শুধু সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদের সার্থকতা প্রতিষ্ঠিত হইবে।

নিঃসন্দেহে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ এবং যেস্থানে উক্ত অনুষ্ঠান হইয়াছিল, সেইস্থান ঐতিহাসিক স্থান। তাহা ছাড়া, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের সর্বত্র যে সকল বধ্যভূমিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাহাদের ঘৃণিত অনুগামী শত শত নিরপরাধ মানুষকে খুন করিয়াছিল সেই সকল বধ্যভূমিও ইতিহাসের অন্তর্গত, ঐতিহাসিক স্থান।

বর্তমান মোকাদ্দমায় আবশ্যিকভাবেই বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি সম্পর্কে বেশ কিছুটা আলোকপাত করা হইয়াছে। এই সকল বর্ণনার বেশিরভাগ উপাদান বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র”-এর ১৫ খ- সিরিজ গ্রন্থ এবং সংশ্লিষ্ট বহু পুস্তক ও তৎকালীন সংবাদপত্র হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে।

এই রায়ের প্রারম্ভেই বলা হইয়াছে যে, ইহা একটি জনস্বার্থমূলক রীট্ মোকদ্দমা। শুধু তাহাই নহে ইহা একটি ব্যতিক্রমধর্মী রীট মোকাদ্দমাও বটে। এ