১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাব তেইশ কোটি বছর আগে

  • এনামুল হক

স্তন্যপায়ীদের বয়স সম্পর্কে এতদিনের প্রচলিত ধারণা পাল্টে যেতে পারে। তাদের বয়স যা ভাবা হয় তার চেয়ে তা তিন কোটি বছর বেশি হতে পারে। গ্রীনল্যান্ডে পাওয়া ২০ কোটি বছরের পুরনো এক জীবাশ্ম পুনর্পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এই অভিমত দিয়েছেন।

প্রথম দিকের স্তন্যপায়ী ও তাদের নিকট আত্মীয়দের নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীদের মধ্যে ওদের বয়স নিয়ে বিতর্ক আগে থেকেই চলছিল। গত নবেম্বরে সংবাদপত্রে একটা খবর বের হয় যা সেই বিতর্ককে আরও জোরে শোরে নাড়া দিয়েছে। পত্রিকার সেই খবরটি হচ্ছে আদি স্তন্যপায়ী বিশেষজ্ঞ শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ঝে-জি-লুওর নেতৃত্বে একদল গবেষক সিটি স্ক্যানকে কাজে লাগিয়ে হারামাইয়াভিয়া ক্লিমেনসেনি নামে ইঁদুরের সাইজের একটি প্রাণীর জীবাশ্ম নতুন করে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা এর শরীর বৃত্তীয় খুঁটিনাটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে যা দেখতে পেয়েছেন তাতে এই ক্ষুদে প্রাণীটিকে স্তন্যপায়ী পরিবার থেকে সরিয়ে এর শাখা পরিবারে স্থান দিতে হয়। সকল স্তন্যপায়ীর বয়সের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য অতি বিশাল।

আদি স্তন্যপায়ী গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি হবার মতো বিষয় একটি হচ্ছে এই যে, স্তন্যপায়ী কাকে বলে? আজ সাত বছরের যে কোন শিশুকে এ প্রশ্ন করা হলে সে চট করে উত্তর দিয়ে বলবে, সে বাঘ, সিংহ, হাতি, আর্মাঢিলোÑ এ গুলোই হচ্ছে স্তন্যপায়ী প্রাণী। কিন্তু তাঁকে ২৩ কোটি বছর আগে নিয়ে গিয়ে তখনকার প্রাণীদের দেখালে তার পক্ষে উত্তর দেয়া এত সহজ হতো না। যদি টাইম মেশিন থাকত তাহলে ফিল্ম তৈরির সাজসরঞ্জাম দিয়ে একটি দলকে প্রামাণ্য ছবি বানানোর জন্য সেই সময়টিতে পাঠিয়ে দেয়া যেতে পারত। তারা প্রামাণ্য ছবি বানিয়ে এসে আমাদের দেখাতে পারত আজকের স্তন্যপায়ীদের এই প্রাচীন পূর্বপুরুষরা ডিম পারত কি না, দুধ দিত কিনা, কিংবা তাদের সারা শরীর পশমে ঢাকা থাকত কিনা। শুধু এটুকুই নয়, তাদের সঙ্গে যাওয়া কোন বিজ্ঞানী ওসব প্রাণীর রক্তের নমুনা এনে বিশ্লেষণ করে এবং জিন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বলে দিতে পারতেন কোন প্রাণী কার আত্মীয় এবং কত নিকট আত্মীয়। কিন্তু যেহেতু টাইম মেশিন আজও উদ্ভাবণ করা যায়নি এবং আদৌ করা যাবে কিনা সন্দেহ তাই প্রমাণ হিসেবে আমাদের জীবাশ্মর উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই। সেই জীবাশ্ম পরীক্ষা করেই আমাদের সূত্র বের করতে হবে কোন সময়ের দিকে স্তন্যপায়ীদের মতো দেখতে সরীসৃপরা সত্যিকারের স্তন্যপায়ীতে পরিণত হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা আদি স্তন্যপায়ীদের হয় ম্যামলিফরমেস কিংবা ক্রাউন ম্যামলস এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করে থাকেন। ম্যামলিফরমেস স্তন্যপায়ীদের মতো দেখতে তবে ঠিক স্তন্যপায়ী নয়। আর ক্রাউন ম্যামলসকে স্তন্যপায়ী বলে গণ্য করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছে আমাদের প্রাচীন আত্মীয়রা এবং সেই সঙ্গে তাদের বিলুপ্ত জ্ঞাতিরা। চোয়ালের বিভিন্ন খাঁজ এবং কানের ভিতরের হাড়ের বিকাশ দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এই প্রাণীগুলো পরবর্তীকালের স্তন্যপায়ী গোত্রগুলোর অধিকতর নিকট আত্মীয় কিনা। হারামিয়াইদান প্রাণীরা অর্থাৎ যে গোত্রের মধ্যে আছে হারামিয়াভিয়া ক্লিমেনসেনি নামে এক ধরনের ইঁদুর জাতীয় প্রজাতি তারা প্রকৃত স্তান্যপায়ী কিনা এনিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল বিভক্ত। ট্রিয়াসিক যুগের ইউরোপের শিলারাশির বুকে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একেকটি দাঁতের জীবাশ্ম থেকে হারামিয়াইডানদের গোড়াতে শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এই দাঁতগুলো কিভাবে চোয়ালের মধ্যে খাপ খেয়ে থাকত বিজ্ঞানীরা তা নির্ণয় করতে পারেননি। এই তথ্যটি জানা না থাকার ফলে স্তন্যপায়ী গোত্রের কোথায় তাদের অবস্থান তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকদের ধারণা, এরা ছিল মাল্টিটিউবারকিউলেট নামক স্তন্যপায়ীদের আরেকটি বিলুপ্ত গ্রোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্তন্যপায়ীদের ঐ গ্রুপের সঙ্গে এই প্রাণীদের দাঁতের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে। কালক্রমে আরও অনেক হারামায়িডান প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। তার মধ্যে হারামাইয়িডান ক্লিমেনসেনিও ছিল যার জীবাশ্ম গ্রীনল্যান্ডের বরফ জমাট শিলারাশির মধ্যে পাওয়া গেছে। এই জীবাশ্মের মধ্যে কিছু দাঁত ছিল যা চোয়ালের সঙ্গে খাপ খেয়ে গেছে। এছাড়াও কঙ্কালের কিছু কিছু অংশও ছিল। দীর্ঘদিন ধরে এটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম যা হারামিয়িডান নিয়ে বিতর্কের বিষয় হিসেবে কাজ করেছে। ফারিশ জেনকিন্সের নেতৃত্বে এক গষেকদল একে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে হারামিয়িডানদের একেবারে প্রকৃত স্তন্যপায়ীদের ভিত্তিমূলে স্থান দেয়। তাদের যুক্তি হলো এই ক্ষুদে প্রাণীটির দাঁত অন্যান্য আদি স্তন্যপায়ীর দাঁত থেকে সুস্পষ্টরূপে আলাদা হলেও এরা বাস্তবিকই আদিযুগের প্রকৃত স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের চোয়ালের খাঁজগুলোই এর প্রমাণ। অন্যরা অবশ্য এর সঙ্গে একমত নন। তারা বলেন, এগুলো কোন অকাট্য প্রমাণ নয়। প্রাণীটি সম্ভবত স্তন্যপায়ীদের মতো দেখতে হলেও স্তন্যপায়ী ছিল না।

প্রশ্ন হলো, ক্ষুদে ইঁদুরের মতো প্রাণীটি স্তন্যপ্রাণী কি স্তন্যপায়ী নাÑ এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত মাথাব্যথা কেন? কেন এ নিয়ে এত বিতর্ক? কারণ এর উত্তরের মধ্যেই পাওয়া যাবে স্তন্যপায়ীদের উৎপত্তি কোন সময়ে হয়েছিল অর্থাৎ আমাদের স্তন্যপায়ীদের বয়স কত।

হারামিসাইডানরা প্রথম আবির্ভূত হয়েছিল ট্রিয়াসিক যুগের শেষদিকে। হারামিয়াইডান ক্লিমেনসেনি প্রাণীটি হলো এ পর্যন্ত প্রাপ্ত এ জাতীয় সবচেয়ে পুরনো প্রাণীগুলোর একটি। প্রাণীটি যদি প্রকৃতই স্তন্যপায়ী হয়ে থাকে তাহলে আমাদের এই অভিন্ন পূর্বপুরুষটির স্থান হবে সময়ের দিক থেকে আরও পিছনের দিকেÑ ট্রিয়াসিক যুগে। তার মানে সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষদিকে। মহাপ্রলয়ের মতো এক ঘটনায় ডাইনোসররা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও স্তন্যপায়ীরা ঠিকই টিকে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়। ২০ কোটি বছর আগে ট্রিয়াসিক যুগের শেষ দিকের মহাবিলুপ্তির ঘটনার হাত থেকেও রক্ষা পেয়েছিল। এই মহাবিলুপ্তির ঘটনা সম্পর্কে আজ অবধি খুব বেশি জানা যায়নি। তবে ঐ ঘটনার পর ডাইনোসররা পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়। অবশ্য হারামিয়াইডানরা যদি প্রকৃত স্তন্যপায়ী না হয়ে স্রেফ তাদের নিকটাত্মীয় হয় তাহলে বুঝতে হবে যে স্তন্যপায়ীদের উৎপত্তি অনেক পরেÑ জুরাসিক যুগে হয়েছিল। বিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণের জন্য তাই এসব খুঁটিনাটি বিষয় বিজ্ঞানীদের বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন। ট্রিয়াসিক যুগের শেষে গণবিলুপ্তি সামলে নিয়ে জীবন আবার নতুনভাবে স্পন্দিত হতে থাকায় জুরাসিক যুগের প্রথমভাগে প্রচুর নতুন নতুন প্রাণের আবির্ভাব ঘটে। কাজেই এ সময় স্তন্যপায়ীদের আবির্ভাব ঘটে থাকলে তার একটা অর্থ আছে। অবশ্য মহাবিলুপ্তির সেই ঘটনার আগে প্রকৃত স্তন্যপায়ীদের যদি বিভিন্ন পথে শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে থাকে তাহলে প্রশ্ন ওঠে তাদের বিবর্তনের পিছনে কোনটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

এখন প্রকৃত স্তন্যপায়ীরা ট্রিয়াসিক যুগে নাকি জুরাসিক যুগে আবির্ভূত হয়েছিল সে এক বিরাট প্রশ্ন। কারণ এই দুইয়ের মধ্যে সে সময়ের ব্যবধান সেটা প্রায় ৩ কোটি বছর। এখন গ্রীনল্যান্ডে ইঁদুর আকৃতির যে প্রাণীটির ২০ কোটি বছরের পুরনো জীবাশ্ম পাওয়া গেছে সেটি যদি প্রকৃত স্তন্যপায়ী হয়ে থাকে তাহলে এই স্তন্যপায়ীরা আমাদের জানা হিসাবের চাইতে ৩ কোটি বছর বেশি আগে আবির্ভূত হয়েছিল। সেক্ষেত্রে প্রাইমেটরা আমাদের অভিন্ন পূর্বপুরুষ ও শিম্পাঞ্জীদের থেকে প্রায় ৭৫ লাখ বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ৩ কোটি বছর একটা মামুলি সময়। কিন্তু এই ৩ কোটি বছরের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে।

সূত্র : গার্ডিয়ান