২০ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দরিদ্রদের ‘দয়ালু প্রাচীর’

  • আরাফাত পারভেজ

ইরানের বেশিরভাগ মানুষই ধনী। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা আবহাওয়া এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা চললেও সেটা মোকাবেলা করার সাধ্য তাদের রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানকার বেশিরভাগ ধনী ইরানী ভুলে যায়নি যে, তাদের ভেতরে কিছু মানুষ এখনও গৃহহীন। শীতের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় গরম পোশাক নেই, থাকার জন্য নেই ঘর, নেই পর্যাপ্ত খাবার। তাই এই সমস্ত দরিদ্র গৃহহীনদের জন্য ইরানবাসী শুরু করেছে একটি অভিনব দানশীল কর্মকাণ্ড। নিজ নিজ বাড়ির সামনের দেয়ালে তারা গৃহহীনদের জন্য ঝুলিয়ে রাখছে পোশাক, খাবার ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য। ইরানের বেশিরভাগ বড় শহরে গেলেই দেখা মিলবে এই ‘ওয়াল অব কাইন্ডনেস’ বা ‘দয়ালু প্রাচীর’। এই ব্যতিক্রমী সাহায্য প্রাচীর ইতেমাধ্যেই সাড়া ফেলেছে ইন্টারনেটে। গরিবের সাহায্যার্থে এটা আসলে কতটা কার্যকরী সে ব্যপারেও শুরু হয়েছে বাগবিতণ্ডা।

দয়ালু প্রাচীরের এই ধারণাটা শুরু হয়েছিল ইরানের উত্তর-পূর্ব শহর মাশাদে। মাশাদ শহরের কোন একজন বাসিন্দা প্রথমে তার বাড়ির দেয়ালে কিছু আংটা এবং হ্যাঙ্গার টাঙ্গিয়ে তাতে কোট, ট্রাউজার এবং অন্যান্য গরম কাপড় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। সে সঙ্গে দেয়ালে লিখে দিয়েছিলেন, ‘আপানার যদি প্রয়োজন না হয় তাহলে রেখে যান। যার প্রয়োজন সে নিয়ে যাবে।’

ইরানের স্থানীয় সংবাদপত্রের তথ্য মতে, গরিবদের সাহায্য দেয়ার এই প্রক্রিয়াটি পরবর্তীতে দয়ালু প্রাচীর নামে পরিচিত হয়। তবে যে ব্যক্তি প্রথমে এটা শুরু করেছিলেন তিনি নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন। কিন্তু ধারণাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ইরানের অন্যান্য শহরে অনেক মানুষ উৎসাহ নিয়ে তৈরি করেছে তাদের দয়ালু প্রাচীর। ইরানে সম্প্রতি অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পড়ায় দয়ালু প্রাচীর তৈরির কাজ সবার মাঝে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ রাস্তায় বসবাসরত মানুষ শীতে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। শুধু যে নিজেরা দেয়ালে কাপড় চোপড় টাঙ্গিয়ে দিচ্ছে তাই না, সেসঙ্গে সারা দেশব্যাপী এই রকম অসংখ্য প্রাচীরের ছবি অনলাইনে পোস্ট করছে। যাতে তাদের দেখাদেখি অন্যান্য নাগরিকেরও এই কাজে অংশগ্রহণ করছে। একজন ইরানী ফেসবুক ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘এটা চমৎকার একটা উদ্যোগ। আমি আশা করি এটা যেন সমগ্র ইরানে ছড়িয়ে পড়ে।’ অপর আরেক ব্যক্তি বলেছেন, ‘এই দেয়ালটা যদিও দরিদ্রদের সঙ্গে আমাদের মধ্যকার পার্থক্যকে মনে করিয়ে দেয় তবু অনেক ক্ষেত্রে এটা আবার আমাদের পরস্পরের কাছাকাছিও নিয়ে এসেছে।’ তবে, অনেকেই এই স্বতঃস্ফূর্ত দান কাজে অংশগ্রহণ করেছেন দরিদ্র দূরীকরণে ইরান সরকারের ব্যর্থতার কথা ধরে নিয়ে। এ ব্যাপারে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘ইরানের মতো ধনী দেশে সাধারণ মানুষ একে অপরকে উপলব্ধি করছে এবং সাহায্য করছে। কিন্তু যারা ক্ষমতায় রয়েছেন তাদের ভেতরে এই সহানুভূতি দেখা যাচ্ছে না।’ অপর আরেকজন অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ ধন সম্পদ রয়েছে তাতে আমাদের যদি জ্ঞানী ও যতœবান রাষ্ট্রশাসকরা থাকতেন তাহলে একজনও গৃহহীন দরিদ্র মানুষ থাকত না।’

গত জুলাই মাসের বহুল আলোচিত পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানের সঙ্গে বাকি বিশ্বের যে দুরত্ব তৈরি হয়েছে সেটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশায় ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রূহানীর নানা অঙ্গীকার সত্ত্বেও ইরান এখনও অনেক সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করছে। অনেক সাধারণ ইরানী নাগরিককে অর্থনৈতিক দুরবস্থার শিকার হতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। ইরানের সরকারি তথ্যমতে, প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বর্তমানে গৃহহীন। তবে অন্যান্য সংস্থার মতে, এই সংখ্যাটা শুধুমাত্র রাজধানীতে এবং সমগ্র দেশের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। গৃহহীন মানুষদের সাহায্যের জন্য ইরানে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। কিন্তু মানুষ যেভাবে গণহারে দরিদ্রদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তাতে প্রশ্ন জাগে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আসলে কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরী। একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী বলেছেন, ‘আমাদের নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে এই জাতীয় কাজ করতে হবে। জীবনটা খুবই ছোট। যত বেশি পারা যায় দয়ালু হওয়া উচিত সবার।’ ফেসবুকের আরেকটি পোস্ট থেকে এ ব্যাপারে ইরানের সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার একটা উদাহরণ পাওয়া যায়, ‘আমরা মানুষরাই হচ্ছি আসল মিডিয়া। দয়ালু প্রাচীরের ছবি পোস্ট করে আমরা দেখিয়েছি যে, আমরাও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারি।’ দয়ালু প্রাচীরের মতো আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন ইরানের অনেক নাগরিক। যেমন একজন একটি ফ্রিজ রেখে দিয়েছেন শহরের রাস্তায়। সেখানে দরিদ্রদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার রেখে যায় মানুষ।

সূত্র : বিবিসি