২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিল্প ও প্রেম ॥ শিল্পাচার্য আক্তারুজ্জামান সিনবাদ

শিল্পী যে ছবি আঁকেন তাতে অবচেতনভাবে নিজেকেই আঁকেন। নিজের মনের কথার প্রতিবিম্ব রূপ পায় তাঁর চিত্রে। ঠিক তেমনি কবিতায় কবি নিজের কথা বলেন। নিজের মনের ভাবনা দিয়েই সবকিছুকে ভাবতে শেখেন। যিনি সৃষ্টিশীল মানুষ তিনি সৃজনশীল কাজের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করেন। তাতে তিনি সব কিছুকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিতে বা তৃতীয় নয়নে দেখেন। আর এটি সম্ভব সাধনার দ্বারা। এতে আছে জ্ঞানের গভীরতা এবং অভিজ্ঞতা। যার জন্য প্রয়োজন পৃথিবীর সবকিছুকে সূক্ষ্মভাবে দেখার ক্ষমতা এবং গভীরতম পর্যবেক্ষণ এবং পরে তা নিজের বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করা। আবার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিরপেক্ষ দৃষ্টি, সবকিছুকে সমন্বয় করে দেখা এবং তার মাঝ থেকে একটি ধারণা, একটি রূপকে তুলে আনা। মানুষের প্রত্যেকের দেখবার দৃষ্টিক্ষমতা আছে। একজন শিল্পীরও সে ক্ষমতা আছে, তবে তাঁর দৃষ্টি ভিন্নতর। প্রকৃতির অনেক কিছুই সে দেখে, কিন্তু সবকিছুকেই তিনি প্রকাশ করেন না। সবকিছুর মাঝে একটি বিষয়কে তিনি নির্বাচন করেন, নিজের অনুভূতি দিয়ে একটি ভাষা বা রূপ তৈরি করেন এবং পরে তা প্রকাশ করেন। শিল্পীর মনের ভাবনায় বা অনুভূতিতে কখনও কখনও কিছু বিষয়বস্তু, আকৃতি বা রঙ প্রতীক হিসেবে দেখা দেয় যা তাঁর শিল্পে আসে। তাই, শিল্প হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত বা অনুভূতি লব্ধ জ্ঞান। “সমগ্র মানব জাতির জন্য সুন্দর জীবন নির্মাণ করাই হচ্ছে শিল্পকলার মৌল উদ্দেশ্য। আমি প্রায়ই বলি, একটি সুন্দর রঙ সুন্দর, কিন্তু তার চেয়ে বেশি সুন্দর হলো একটি সুন্দর মন বা সুন্দর মুখাবয়ব। তারও চেয়ে সুন্দর একটি সুন্দর মন বা সুন্দর চরিত্র। মন ও চরিত্রকে সুন্দর করার জন্য গুণের সাথে শৈল্পিক গুণ থাকা এবং শিল্পকলার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকা বাঞ্ছনীয়”- শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

এদেশের শিল্পচর্চা, শিল্প আন্দোলনের প্রধান পুরুষ হচ্ছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে যাঁর নাম প্রথম সারিতে প্রথমে উচ্চারিত হয়। যাঁর কল্যাণের পথ ধরে আমরা শুধু শিল্পকেই নয়, ভালবাসতে শিখেছি দেশ, মৃত্তিকা, মা, মানুষ, নারী, প্রকৃতি, সমাজ, সামাজিকতা। চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এদেশের শিল্পীদের আচার্য বা শিক্ষক। অসাধারণ শিল্পমানসিকতা ও কল্পনাশক্তির জন্য তিনি শিল্পাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন। মূলত জয়নুল আবেদিনের শিক্ষার সূত্রপাত কলকাতায়। সেখানে তিনি শিখেছিলেন চিত্রে অন্তর্গত মানুষ, স্থান ও আলোকের সৃষ্টিশীল সম্পর্কের বিষয়টি। তিনি বুঝেছিলেন সাম্প্রতিক জীবনের সঙ্গে শিল্পের প্রয়োজনীয় দিকটির প্রসঙ্গে। এদেশের মাটি ও মানুষের শিল্পী তিনি। আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। তিনি আমাদের জাতিসত্তাকে রঙ তুলির মাধ্যমে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যাঁর চিন্তা ও দর্শনে ছিল মানব কল্যাণবোধ। জয়নুল আবেদিনের মধ্যে আমরা পাই বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্য, চেতনা, প্রকৃতি, পরিমণ্ডল, প্রাণের আকুতি ও ভাষার স্ব-প্রকাশ প্রতিবিম্ব। বাংলার মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, দেশীয় সংস্কৃতি, কৃষক, মজুর, জেলে, নৌকা, মাঝি, কাক, গরু, সাঁওতাল রমণী, বেদেনী, গ্রামের বধূ, সমাজের অবহেলিত চাষী মূলত এরাই তাঁর শিল্প চরিত্রের প্রধান চিত্ররূপ। তাঁর ছবিতে প্রধান হয়ে উঠেছে এদেশের লোকসমাজ। আবহমান বাংলার নিসর্গ ও মানুষের চিত্র কালজয়ী হয়ে আছে তাঁর শিল্পকর্মে। তিনি যে প্রকৃতি ও মানুষ এঁকেছেন তাতে নাগরিক জীবনের তেমন খোঁজ নেই। আছে ঘামঝরা শ্রমজীবী মানুষের প্রতিচ্ছবি, আছে সোদা মাটির গন্ধ। জয়নুল আবেদিন শিল্পসৃষ্টিতে একই সাথে প্রয়োগ করতেন কিউবিজম, রিয়েলিজম, ফবইজম, রোমান্টিসিজমের অতি সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রয়োগরীতি। তাঁকে কখনও দেখা যায় সেজানের ভূমিকায়, কখনও পিকাসো পরক্ষণেই অবনীন্দ্র বা যামিনী রায়ের ভূমিকায়। এক কথায় বলা যায় জয়নুল ও তাঁর শিল্পকর্ম ছিল উচ্চমানের শিল্প সৃষ্টির পরিপূরক এবং অবিচ্ছেদ্য। তাঁর কাছে প্রাচ্যের অঙ্কন ধারা অতিমাত্রায় রীতিনির্ভর ও অপরিবর্তনশীল মনে হয়েছে, যা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ধারা তাঁর কাছে সীমাবদ্ধ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। এসব মিলিয়ে তিনি রিয়েলিজমের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাই তো প্রথম দিকে তিনি বাস্তবধর্মী চিত্র রচনা করেন, কিছুটা কিউবিস্ট ঢংয়ে আধা বিমূর্তায়ন আসে তাঁর চিত্রকর্মে।

রেখাচিত্রের উপর তাঁর দুর্বলতা অবশ্য থেকেই যায় এবং দৈনন্দিন জীবনচিত্রের উপস্থাপনায় তিনি এর ব্যবহারে এনেছেন বহ্ন বৈচিত্র্য। মূলত রেখাচিত্রের মাধ্যমেই তাঁর খ্যাতি আসে। তাঁর চিত্রের রেখার প্রাধন্য হলো মূল বৈশিষ্ট্য। রেখার প্রবাহমানতায় ছন্দময় রূপ আর কোন শিল্পীর কাজের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। সব ছবিতে দেখা যায় তাঁর রেখার প্রাধান্য। জয়নুল আবেদিনের এই বাস্তববোধ পূর্ণতা পায় তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায়। যা তাঁর প্রতিভার দীপ্তিকে সর্ব ভারতীয় পর্যায় থেকে বিশ্ব পরিসরে বিস্তৃত করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় ফুটে উঠেছে সব সওদাগরদের নিষ্ঠুরতা ও নৈতিক কলুষতা, সেই সাথে নিপীড়িতের অমানবিক দুর্দশা। মানুষের দুর্দশা, কষ্ট ও প্রতিবাদকে সামনে এনে বাস্তবধর্মী চিত্র অঙ্কনে তাঁর স্বকীয়তাকে বিকশিত করে। উচ্চ মার্গের নন্দনতত্ত্বের মিশেলে সামাজিক অনুসন্ধিৎসা ও প্রতিবাদের সম্মিলিত প্রকাশ রিয়েলিজমের এ ধারা বিভিন্ন সময়ে জয়নুলকে প্রেরণা যুগিয়েছে। দুর্ভিক্ষের রেখাচিত্রগুলো তিনি এঁকেছিলেন সাধারণ কাগজের উপর কালো কালিতে মোটা ব্রাশের টানে। চিত্রের বিষয় মর্মান্তিক অভাবগ্রস্ত মৃতপ্রায় মানুষের, জীবন আনন্দের ছিটেফোঁটাও সেখানে নেই, সেহেতু শোকের দিক থেকে তিনি কালো কালি ও সাধারণ কমদামী কাগজ ব্যবহার করেছেন, ফলে দুর্ভিক্ষের ভাষার সার্থক রূপায়ণ এসেছে। দুর্ভিক্ষের ছবির মধ্যে মানুষ ও পশুর সহাবস্থান, কাকে মানুষে কিংবা কুকুরে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। আছে হাহাকার। চারদিকে নিরন্ন, রুগ্ন মানুষের অবয়বে অসহায়ত্বের প্রকট রূপ। ডাস্টবিনের মধ্যে মানুষ উচ্ছিষ্ট খাবার কুড়াচ্ছে। ডাস্টবিনের পার্শ্বে উচ্ছিষ্ট খাবারের অন্বেষণে কাক ও মানুষের মধ্যে কাড়াকাড়ি। ফুটপাথে মৃতপ্রায় শায়িত মানুষের মুখের ভিতর কাক খাদ্যের জন্য ঠোকরাচ্ছে। ফুটপাথে ক্ষুধার্ত মানুষ ও কুকুর একসাথে শায়িত। মানুষের শরীরের উপর উপবিষ্ট কাক, তাকে ক্ষুধার্ত রোগাক্রান্ত জীর্ণ মানুষটির তাড়াবার শক্তিটুকু পর্যন্ত নেই। ফুটপাথে ও গাছের নিচে কাক ও শিশুদের খাদ্যের আহাজারি, এমনই সব চিত্রের মধ্যে পৃথিবীর সভ্য মানুষের যে মানবতার লঙ্ঘন ও নৈতিক অবক্ষয় তা সার্থকভাবে রূপায়িত হয়েছে। মানবতার চরম অপমানের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তাঁর “ম্যাডোনা-১৯৪৩” ছবিটি। ফুটপাথে মৃতপ্রায় ছিন্নভিন্ন বস্ত্রের এক হতভাগ্য মা, যার শুষ্ক স্তন মুখে নিয়ে দুধ খাবার বৃথা চেষ্টা করছে তার সন্তান। দুর্ভিক্ষের কড়াল গ্রাসে সে তার মায়ের বুকের দুধ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। জয়নুল আবেদিন তাঁর এইসব দুর্ভিক্ষের ছবিতে রেখার ব্যবহারে আনলেন বেগবান গতি, বিষয়বস্তুর রুক্ষতা ও দুর্ভিক্ষের কদর্য রূপ, যা সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্বতার দাবিদার। বেঙ্গল স্কুল বা ভারতীয় অন্যান্য রীতির রেখার সাথে এর কোন মিল নেই। তবে জাপানী, চীনা ঐতিহ্যবাহী রেখাচিত্র বা দেশীয় লোকচিত্রকলার রেখার যে বেগ, তার সাথে এই রেখার মিল পাওয়া যায়। রেখার চিত্রগুলোর মূল বিষয় বা অবয়ব চিত্রপটের পুরো স্থান জুড়ে থাকায় চারপাশের চিত্রপটে অন্য কোন অলংকরণ তেমন চোখে পড়ে না। শুধুমাত্র কম্পোজিশনের খাতিরে কিছু অবজেক্ট ব্যবহার করেছেন। যা তাঁর হৃদয়ে যন্ত্রণার নান্দনিক উপস্থাপনা মাত্র। এই রেখা স্বতঃস্ফূর্ত, বলিষ্ঠ, দ্রুত, স্থূল, কর্কশ ও স্পষ্ট। কোথাও রেখা থমকে যায়নি এবং রেখার পরিপ্রেক্ষিত পাওয়া যায়। পারিপার্শ্বিকতার প্রাচুর্যতা নেই, আছে বিষাদের কালো ছায়া। জয়নুলের রেখায় কথা বলে। দুর্ভিক্ষের ছবির সবকটি মানুষের মুখে নিজ নিজ অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। কারো মুখে অসহায়ত্ব, কারো মুখে বিভীষিকা, কারো মুখে বিষাদের ছাপ, আবার কারো মুখে অনাগত দিনের অনিশ্চয়তার আতঙ্ক। ছবিগুলো অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও জীবন্ত। ফিগারগুলোকে দীর্ঘ ও শীর্ণকায় অতিরঞ্জিতভাবে করেছেন। শীর্ণতাকে স্পষ্ট করতেই মূলত তিনি শরীরকে দীর্ঘ করেছেন। তাঁর চিত্রের অন্যতম গুণ ব্যঞ্জনাদ্যোতক ভঙ্গি। এই ভঙ্গি শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের আবেগের নয়। কাক-কুকুরের মধ্যে, ফুটপাতের সাংকেতিক রেখায়, ডাস্টবিন ও থামের রেখায় এবং গাছের রেখায় বিদ্যমান। যেখানে মৃত মানুষ আনুভূমিকভাবে বা তীর্যকভাবে পড়ে আছে, সেখানে ডাস্টবিন ও থালা উলম্ব। এর বিপরীত তীর্যক রেখায় কাকের অবস্থান একটি মজবুত রেখার বিন্যাস তৈরি করে।

সমগ্র পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ধরে জয়নুল আবেদিনের চিত্রে রিয়েলিজম, নান্দনিকতা, পল্লীর বিষয়বস্তু ও প্রাথমিক রঙের প্রতি তাঁর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। তবে কর্মপরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি লোকশিল্পকলার সীমাবদ্ধতা উপলদ্ধি করেন। এ সময়ের কাজে তাঁর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার সেই তুলির সাবলীল বলিষ্ঠতা প্রকাশ পায়। বিষয়ে আসে গ্রাম-বাংলার অতি সাধারণ দৃশ্যাবলী, যেখানে বাস্তবতা থাকবে মুখ্য কিন্তু অবয়ব হবে আধুনিক। যা অধিকাংশ জলরঙে আঁকা। জয়নুলের কাছে “আধুনিকতাবাদ” বলতে শুধুই বিমূর্ততা ছিল না, বরং তাঁর কাছে “আধুনিকতা” শব্দটির ছিল এক সুগভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যেখানে সামাজিক উন্নয়ন ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশই মুখ্য। তাই প্রাকৃতিক ও মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত নয়-নারীর বলিষ্ঠ শারীরিক গড়ন স্মরণ করিয়ে দেয় ব্যক্তিক সীমাবদ্ধতার মাঝে আধুনিকতাবাদের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে। জয়নুলের কর্ম কেন্দ্রায়িত হয়েছে সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নর-নারীর শ্রম ও সংগ্রাম এবং সেই সাথে তাদের ক্ষমতার বহির্প্রকাশের মাঝে। এসময় তিনি আঁকেন নারীর বিভিন্নরূপ, ভঙ্গিমা। নিছক নারী সৌন্দর্য চিত্রিত করার জন্য নয়, বরং দেশমাতৃকার স্বরূপ তুলে ধরাই ছিল মূল লক্ষ্য। মানব সভ্যতা নির্মাণের পেছনে শ্রমজীবীদের অবদানই মুখ্য। সে কারণে শ্রমজীবীর শরীরকেই তিনি লক্ষ করেছেন প্রকৃত সৌন্দর্য, সুস্থতা ও কল্যাণের রূপ। এই সময়ের কাজের সাথে যামিনী রায়ের ছবির সামঞ্জস্য দেখা যায়। তাঁর এই কাজে বাংলার লোকশিল্পের নানা মোটিভ এবং রঙ বিন্যাসের প্রভাবও লক্ষণীয়। চিত্রের বিষয় উপস্থাপনে আছে সারল্য এবং লোকচিত্রের রৈখিক চরিত্র। তবে পট চিত্রের রেখার চেয়ে এই রেখার পার্থক্য হলো-এতে আছে একাডেমিক দক্ষতা। বিজ্ঞানসম্মত আলোছায়া, পরিপ্রেক্ষিত ও মাত্রা সংবলিত রেখার ব্যবহার।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের বিষয়কে ভিত্তি করে আঁকেন ৬৫ ফুট দীর্ঘ ও ৬ ফুট প্রস্থের স্ক্রল পেইন্টিং “নবান্ন”। এতে চিত্রিত হয় সোনার বাংলার সুখ ও শান্তি। তারপর শত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রমশ নিঃস্বতার পরিণতি। শেষ পর্যন্ত অসহায় দরিদ্র ও দুঃখী গ্রামবাসীদের গ্রামত্যাগ করে শহরমুখী যাত্রা। ক্রিমশান কালো রং আর রেখায় কখনও সাথে ব্যবহার করেছেন হাল্কা কিছু রং অথবা মোমের আঁচড়। এই স্ক্রলচিত্রে তাঁর শক্তিশালী ড্রইং পরিলক্ষিত হয়। গণমানুষের জন্য সহজবোধ্য করে তুলে ধরেছেন তিনি সোনার বাংলার শ্মশান হওয়ায় প্রক্রিয়া। এ ছবির বক্তব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারানো হাজারো মানুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আঁকা ৩০ ফুট দীর্ঘ “মনপুরা” স্ক্রল চিত্রটির মাঝে তাঁর কর্মের বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। কালো কালি ও মোম সহযোগে আঁকা ছবি জুড়ে সারি সারি লাশ। এদের মধ্যে শিশু, পুরুষ, মহিলা ও গবাদি পশু কোন কিছুই বাদ যায়নি। মৃত্যু ধ্বংস যজ্ঞের এক করুণ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। শেষ প্রান্তে স্থাপন করেছেন এক সমর্থ পুরুষকে। এখনও জীবিত ও মাথা নিচু করে বসে আছে। ধ্বংস স্তূপ থেকে সে উপকূলীয় বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক, আবার জেগে উঠবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এমন এক মানব, বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত, তবে একেবারে নিঃশেষিত নয়। এ যেন বাঙালির সম্ভাব্য পুনরুত্থানের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উপর আঁকেন “শরণার্থী” ও “মুক্তিযোদ্ধা” ছবিগুলো। জয়নুল আবেদিন তাঁর চিত্রকলায় জীবনের সত্যকে উপলদ্ধি করতে শিখিয়েছেন। এবং এই সত্যকে দর্শকের মাঝে, সর্বসাধারণের মাঝে সঞ্চারিত করেছেন, প্রভাবিত করেছেন। দেশের মানুষকে একটি আদর্শে একটি সত্তায় এনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর চিত্রে প্রকৃতি এবং মানুষ সর্বাঙ্গীণ একাত্ম হয়ে সৌন্দর্য লাভ করেছে, এই সৌন্দর্য এসেছে কখনও সুখী জীবন প্রণালীতে আবার কখনও এসেছে শোষণ আর অত্যচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ও বিদ্রোহের রূপ নিয়ে। শিল্পাচার্য যে মুকুটের একটি পালক মাত্র, ক্ষয়িষ্ণু ধর্মান্ধতার যুগে সে প্রগতিশীল নান্দনিকতারুচত্বর তিনি গড়েছিলেন তারই লালিত আলোক আজ ছড়িয়ে যাচ্ছে, যাবে শত সহস্র শিল্প-মনের মাঝ দিয়ে। তাঁর প্রজ্বলিত শিখা জ্বলে যাচ্ছে, জ্বলে যাবে অনন্তকাল।