১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ মোহিত কামালের উপন্যাস জাদু ও পরাবাস্তবতার নান্দনিক মিশ্রণ

  • সিরাজুল এহসান

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল ‘চন্দন রোশনি’ উপন্যাসের ভূমিকার বদলে ‘শুরুর কথা’য় কাহিনী, উপস্থাপন রীতি ও বিশেষ তত্ত্বের বশীভূত হয়ে নিরীক্ষার কথা কবুল না করলেও পারতেন। কেননা পাঠকের বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না- বাংলা কথাসাহিত্যে এ এক নতুন সংযোজন, ভিন্নস্বাদের শিল্পদুগ্ধে পূর্ণ। আর এ পাঠকশ্রেণী যে বিশেষ কাতারের সেটাও উপলব্ধি করতে হবে। মোহিত কামালের পাঠক সবশ্রেণীর নন- এখানেই তার স্বাতন্ত্র্য। তার সৃষ্টিকর্ম বোধে গ্রহণ করতে হলে বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়। বক্ষ্যমাণ উপন্যাসটি বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার মিশেলে এক নান্দনিক উপস্থাপন। আমাদের কথাসাহিত্যে বিশেষত উপন্যাস ও গল্পে জাদুবাস্তবতা প্রয়োগের দৃষ্টান্ত গত শতাব্দী থেকে দৃশ্যমান। পরাবাস্তবতা প্রয়োগও লক্ষণীয়। এ বিষয় নিয়ে আলোচনার পরিসর এটা নয়। তবে উপন্যাস ‘চন্দন রোশনি’ সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক ও অবধারিতভাবেই তা এসে যায়।

উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বাস্তবতা থেকে পরাবাস্তবতায় এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে পাঠক প্রতি পৃষ্ঠায় নয় প্রত্যেক লাইনে হবেন চমৎকৃত। শৈল্পিক, নান্দনিক ও সাহিত্যরসে টইটম্বুর; উপস্থাপনাগত ভিন্নতায় পাঠক আস্বাদন করবেন বিশেষ মার্গের স্বাদ। অর্ণব ও উর্বশী নবদম্পতি মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে সাথীহারা হয়ে পড়ে। অর্ণব হারিয়ে যায় উত্তাল সাগরে। সাগরে তলিয়ে যাওয়ার যে বর্ণনা তা এক কথায় অপূর্ব। তলিয়ে যাওয়ার পরও তার মৃত্যু হয় কি হয় না তা পাঠক নির্ণয় করতে পারেন না। বোধ ও আত্মিক যোগাযোগ থাকে অর্ণবের সঙ্গে উর্বশীর। সাগরতলে অর্ণবের অস্তিত্ব, নিজে যখন আবিষ্কার করল এবং বাস্তবতা অনুধাবন করল সেটার বর্ণনা বেশ লোভনীয়। একটু উদ্ধৃত করা যাক। ... ‘হঠাৎ মনে পড়ে গেল সাগরতলে লুকিয়ে থাকা সবুজ জলজ উদ্ভিদে ঠাসা সুপ্ত অগ্নিগিরিসদৃশ ভয়াল পর্বতগুহার কথা। গুহা থেকে অনবরত বেরুতে থাকা কার্বন-ডাই অক্সাইডের বুদবুদ উঠতে থাকে ওপরে। সমুদ্রতলে প্রায় তেরো হাজার ফুট নিচে থাকতে পারে এমন ভয়াবহ গুপ্তগুহা! গুহামুখ থেকে নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড ক্রমশ গলে তৈরি করে কার্বনিক এসিড। ... ঝিঁঝি নীরবতার অদৃশ্যস্তরে হারিয়ে গেল তার ডাক। নিজের অস্তিত্বের শিকড় কীভাবে গেড়ে বসল সাগরতলে মৃত্তিকা-গর্ভে বোঝার চেষ্টা করল না।’ ...

অর্ণবের সাগরতলে হারিয়ে যাওয়ার পর তার অন্য জীবন শুরু হয়। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না উর্বশীর সঙ্গে। প্রতিনিয়ত অনুভব করে উভয়কে দুটি হৃদয়। সে যোগাযোগ টেলি প্যাথিজমকেও ছাড়িয়ে যায়। উর্বশী বিশ্বাস করে না অর্ণব নেই। পিতামাতার পুনর্বিয়ের চাপকে অগ্রাহ্য করে একা থাকার চেষ্টা করে। চলমান সমাজের নেতিবাচক কাঁটা বিদ্ধ হয় প্রতি পদক্ষেপে। একা এক তরুণী এ সমাজে চলতে-ফিরতে বাস করতে গিয়ে যে বিড়ম্বনার শিকার হয় তার চেয়ে অধিক কিছু ঘটে উর্বশীর জীবনে। এমনকি ‘পতিতা’ আখ্যা দিতেও বাধে না সমাজচক্ষুর। নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে উর্বশীর বয়ে চলা জীবনেও নির্ভর করে অতিশক্তির প্রাবল্য। এটা কি জাদুবাস্তবতা নয়? একটু দেখা যাক সেই নিপুণ চিত্রÑ ... “দেহে কি বাসা বেঁধেছে বৈদ্যুতিক কোন শক্তি? সেই শক্তি কি ঘটিয়ে দিচ্ছে অবিশ্বাস্য ঘটনা? কী সেই শক্তি? ভেবে কূল পেল না উর্বশী। ইন্টারকমের শব্দে চমকে উঠে রিসিভার ধরে উর্বশী বলল, কিছু কি বুঝলেন?’ না। মাডাম। আপনি এত দ্রুত নেমে আবার কীভাবে গেলেন চৌদ্দতলার ফ্ল্যাটে? উর্বশীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল গার্ড।” ... এমন অতিশক্তির ঘটনা বা জাদুবাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ, প্রসঙ্গে শিহরিত হবেন পাঠক। আলোচিত উপন্যাসে বাস্তবতা এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এই প্রেক্ষাপটটা এতটাই বাস্তব খুবই নিকট অতিতের ঘটনা। রাজনৈতিক কর্মসূচীর নামে মানুষ হত্যার নারকীয়যজ্ঞ উঠে এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবে। একটু উদ্ধৃত করা যাকÑ ‘বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধের ১৩তম দিন গতকাল ১৩টি জেলায় সহিংসতা ঘটেছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আগুন দেয়া হয় ১৯টি যানবাহনে। ভাঙচুর করা হয় আরও ১১টি। ... এই দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৫ দিনে সহিংসতায় নিহত হলেন ২৭ জন।’ ... উপন্যাসে এ প্রসঙ্গ সংযোজন ও তথ্য সন্নিবেশ করা বিশেষ পারঙ্গমতা ও মুন্সিয়ানার পরিচায়ক। শুধু তাই নয় ইতিহাস ও সময়কে ধারণের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক পালন করেছেন সামাজিক দায়বদ্ধতা।

এ লেখার শেষদিকে এসে উপন্যাসের শুরুর দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে মোহিত কামালের পাঠক একটি বিশেষ শ্রেণীর। মোহিতকে পড়তে হলে আগে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হয়। ‘চন্দন রোশনি’র ঘটনাক্রমকে এগিয়ে নেয়ার অন্যতম নিয়ামক অর্ণব যখন সাগরের তলে তলিয়ে যাচ্ছিল তখন অবশ্যম্ভাবীভাবে এসেছে বিজ্ঞানের বিশেষ টার্ম। আকাশম-ল থেকে শুরু করে সাগরতলার নানা বৈজ্ঞানিক অনুষঙ্গ। এই যেমনÑ গ্যালাক্সির কক্ষপথ, সেখানে ঘূর্ণনরত আলোক তরঙ্গ, রেডিয়েশন, বোসন কণা, সুপার কনজাকটিভিটির নবতর প্রযুক্তি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী লার্জ হাড্রন কোলিডার মতো বৃত্তাকার টানেল। অর্ণব তলিয়ে যাওয়ার সময় সে মনে করে এখন টানেলের মধ্যদিয়ে প্রবেশ করে আবার চলে যায় গ্যালাক্সির কক্ষপথে। নিজে হয়ে পড়ে দু’সত্তা। নিজেকেই নিজে দেখতে পায় আলোক তরঙ্গে উজ্জ্বল কণা হিসেবে। তাহলে কি ওটা অর্ণবের আত্মা-সত্তা, যা সে দেখতে পাচ্ছে দেহ-সত্তা দিয়ে? এমন অনেক কুহক আর প্রশ্নের জাল রয়েছে উপন্যাসে। জালে পাঠক জড়াবেন, আবার বের হওয়ার পথও পাবেন। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী বা বিজ্ঞান নিয়ে উৎসুক পাঠককে সমৃদ্ধ করবে, কৌতূহলও জাগাবে। সবমিলিয়ে মোহিত কামালের এক অনবদ্য-নান্দনিক সৃষ্টি সুখ ‘চন্দন রোশনি’। এক কথায় বলা যায়Ñ যারা উপন্যাসের ফরমেট ভাংচুর করেন, নন্দিত নিরীক্ষণ, বৈশ্বিক তত্ত্ব বা দর্শন প্রয়োগ করেন সেই মিছিলে এক নবতর সংযোজন মোহিত কামালের উপন্যাস ‘চন্দন রোশনি’। গ্রন্থটি পাঠক আদৃত হবে নিঃসন্দেহে। চমৎকার, দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন কারুতিতাস। প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ।