২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীনা পুঁজিপতিদের বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার॥ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেশের প্রতিটি কোণায়। সামরিক শক্তিতেও গোটা বিশ্বের সমীহের পাত্র। এ হেন মজবুত রাষ্ট্র অসহায় হয়ে নিজেদের কোষাগার খালি হয়ে যেতে দেখছে।

চীনা পুঁজিপতিদের অনেকেই দেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে এখন পাড়ি দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, স্পেন। নিজেদের পুঁজিও চেঁছেপুঁছে নিয়ে যাচ্ছেন সঙ্গে। চীনে জীবন কাটানো খুব সহজ নয়। দেশান্তরী চীনা বিলিয়নেয়ার, মিলিয়নেয়ারদের মুখে এখন অনেকটা এই ধরনের কথাই শোনা যাচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে চীন ছেড়ে পুঁজিপতিদের বিদেশে চলে যাওয়া। প্রবণতা বছর বছর বাড়ছে। কারণ পুঁজিপতিরা চীন ছাড়তে চাইছেন বুঝেই তাঁদের আশ্রয় দেওয়ার লোভনীয় প্যাকেজ ঘোষণা করে দিয়েছে বেশ কয়েকটি দেশ। যে দেশের প্যাকেজ পছন্দ হচ্ছে, চীনের বিভিন্ন অংশ থেকে সেই দেশেই পাড়ি দিচ্ছেন ধনী মানুষজন। সঙ্গে করে অবশ্যই নিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের অতুল ঐশ্বর্য।

এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক এই সব বিদেশি পুঁজিপতিদের আকর্ষণের জন্য কী ধরনের প্রস্তাব রেখেছে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ব্রিটেন এবং অন্যান্য পশ্চিমি দেশ। শুধুমাত্র চীনা পুঁজিপতিদের কথা উল্লেখ করে কোনও আলাদা নীতি কোনও দেশ তৈরি করেনি। কিন্তু, বিদেশি পুঁজিপতিকে আশ্রয় দেওয়ার শর্ত একটু শিথিল হলেই যে চীন থেকে অনেক ধন-সম্পদ নিজেদের দেশে টেনে আনা সম্ভব, তা বুঝেছে এই সব দেশ। সেই অনুযায়ীই এই সব দেশ প্যাকেজ তৈরি করেছে বিদেশি আশ্রয়প্রার্থীর জন্য। নিলামের মতো এই দর হাঁকাহাঁকিতে অস্ট্রেলিয়া সবাইকে পিছনে ফেলেছে। ৫০ লক্ষ অস্ট্রেলিয়ান ডলার বা ৩৬ লক্ষ মার্কিন ডলার খরচ করলেই বিদেশি আশ্রয়প্রার্থীকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। ইনভেস্টমেন্ট ভিসা দেওয়া হচ্ছে বিদেশি পুঁজিপতিদের। পরিকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে ষথেষ্ট উন্নত অস্ট্রেলিয়া চীনা পুঁজিপতিদের কাছে সব সময়ই বেশ লোভনীয় জায়গা। তাই সবচেয়ে বেশি চীনা পুঁজিপতি গত কয়েকবছরে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়।

আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে গ্রিন কার্ড জরুরি। গ্রিন কার্ড পেতে মাত্র ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার খরচ করতে হয়। ২ বছরের জন্য ১০ জনের কর্মসংস্থান করতে পারে এই অর্থ। দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্যই মার্কিন সরকার এইভাবে বিদেশ থেকে পুঁজি টানতে চাইছে। তবে ইবি-৫ প্রোগ্রাম বলে একটি প্রকল্পও মার্কিন সরকার চালু করেছে। সেই প্রকল্পে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে পাড়ি জমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শহরাঞ্চলে বিনিয়োগ করলে ১০ লক্ষ মার্কিন ডলারই দিতে হবে। যাঁরা একটু ঝুঁকি নিয়ে গ্রামীণ আমেরিকায় বিনিয়োগ করবেন, তাঁদের জন্য বিনিয়োগের পরিমাণ অর্ধেক। তার বিনিময়ে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের ছাড়পত্র মিলবে। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের দেওয়া হিসেব বলছে, গত এক বছরে লগ্নিকারী ভিসা পাওয়ার জন্য আমেরিকায় যতগুলি আবেদনপত্র জমা পড়েছে, তার ৮০ শতাংশই চীন থেকে এসেছে। চীনা পুঁজিপতিরা এ ভাবেই দলে দলে দেশ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন আমেরিকায়।

ব্রিটেনে বসবাসের শর্ত একটু শক্ত। ১০ লক্ষ পাউন্ড বিনিয়োগ করলে সেখানে ৫ বছরের জন্য থাকার ছাড়পত্র মিলবে। স্পেনে পাড়ি দেওয়া আবার খুব সহজ। ন্যূনতম ৫ লক্ষ ইউরো মূল্যের একটি সম্পত্তি সে দেশে কিনতে পারলেই হল। সারা জীবন স্পেনে থাকার অনুমতি মিলে যাবে। শুধু ওই সম্পত্তি বিক্রি করা চলবে না।

কানাডা অবশ্য উল্টো পথে হেঁটেছে। বলা ভাল হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। আগে সহজ শর্তে কানাডার লগ্নিকারী ভিসা মিলত। তাতে চীনের ধনী শ্রেণির এত বিপুল হারে মানুষ কানাডায় ভিড় জমাতে শুরু করেন, যে এ বছরের গোড়াতেই নিজেদের লগ্নিকারী ভিসা নীতি বাতিল করেছে কানাডার সরকার। কানাডায় বসবাসের অনুমতি বড্ড সস্তা হয়ে যাচ্ছিল বলে কানাডার সরকার জানিয়েছে।

চীনের পুঁজিপতি এবং উচ্চবিত্তের মানুষ মনে করছেন, এত কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কাম্য নয়। প্রধানত সেই কারণেই সমস্ত পুঁজি সঙ্গে নিয়ে দেশান্তরী হওয়া। তবে চীনা উচ্চবিত্ত নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যতের দোহাইও দিচ্ছেন। বলছেন, চীনের বাতাস খুব দূষিত। চীনে বিশুদ্ধ পানীয় জলের আকাল। চীনের সরকার চিনা পড়ুয়াদের ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তে দেয় না। তাই সন্তানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেই বিদেশে যাওয়া জরুরি। বিদেশে সন্তান জন্মালে আরও সুবিধা। জন্মসূত্রে বিদেশি নাগরিক পড়ুয়া যদি দেশে ফেরে, তা হলে ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তেও বাধা থাকবে না।

১০ লক্ষ মিলিয়নেয়ারের বাস চীনে। তাঁদের সঙ্গে তাঁদের টাকাপয়সাকেও নিজেদের দেশে নিঃশেষে টেনে নিতে সচেষ্ট পশ্চিমি বিশ্ব।চীনের অর্থনীতি বড়সড় ধাক্কা খেয়ে যেতে পারে এতে। বেজিং-এর কমিউনিস্ট সরকার সতর্ক হবে কি?