১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশের অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ॥ অধিকার সংগ্রামের শৈল্পিক চিত্রায়ন ‘লালচর’

দেশের অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ॥ অধিকার সংগ্রামের শৈল্পিক চিত্রায়ন ‘লালচর’

সাজু আহমেদ ॥ নাটকের মানুষ নাদের চৌধুরী। প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে যা বানিয়েছেন তা দেখে এ অঙ্গনের নিয়মিত পরিচালকদের শিক্ষা নেয়া উচিত। চলচ্চিত্রটি দেখে হল থেকে বেরিয়ে এমনটাই মনে হয়েছে। এ ধরনের চলচ্চিত্র নিয়মিত নির্মিত হলে সংশ্লিষ্টরা বলতেই পারেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তথা আমাদের চলচ্চিত্র। বলছি নাদের চৌধুরী পরিচালিত, দেশব্যাপী সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লালচর’ চলচ্চিত্রের কথা। বছরের শেষ চলচ্চিত্র হিসেবে শুক্রবার মুক্তি পেয়েছে ‘লালচর’। চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি দেখার সময় দর্শকদের মনোযোগ অন্যদিকে নেয়ার সুযোগ নেই। চলচ্চিত্রের গল্প অতি সাধারণ। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশের নদী পাড়ের মানুষের কাহিনী। নদী ভাঙ্গনে বিপর্যস্ত একটি গ্রামের মানুষের প্রকৃতি আর প্রভাবশালীদের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে চলচ্চিত্রের কাহিনীতে। এর গল্প বলার ভঙ্গি অন্যরকম ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয় দর্শকদের। চলচ্চিত্রের গল্পে দেখা যায় নদী গর্ভে বিলীন একটি গ্রামের বাসিন্দা উসমান শেখ। নদী ভাঙ্গনের ফলে জমি জিরাত শেষ হওয়ায় চরম অভাব অনটনে পড়ে তার সংসার। উসমান শেখের বড় ছেলে নাদেরের অসুস্থ বউ তাকে ছেড়ে চলে যায়। রেখে যায় এক মাত্র সন্তান রতন। অভাবের সংসারে আর্থিক যোগান দিতে হিমশিম খাওয়ায় এক সময় ডাকাতি করতে গিয়ে জনৈক ব্যক্তিকে খুন করে বসে নাদের। তার পর ফেরারি হয় সে। এদিকে বাবার অনুপস্থিতিতে রতন বড় হয়ে বৃদ্ধ দাদা আর বিধবা ফুফুকে নিয়ে সংসারের ঘানি টানতে থাকে নদীতে মাছ ধরে বিক্রির মাধ্যমে। হঠাৎ একদিন সে স্বপ্ন দেখে নদীতে চর জাগছে। ঘুমের ঘোরের স্বপ্ন এক সময় সত্যি হয় রতনের, নদীতে সত্যি সত্যি চর জাগে। আর এই চরকে ঘিরে তার মতো গ্রামের মানুষগুলো আবার নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখে। তবে বাদ সাধে গ্রামের প্রভাবশালী লোক তালুকদার। সে বলে, যে চর জাগছে সেখানে সব জমি তার। গ্রামের কারও কোন জমি নেই। কিন্তু গ্রামের সব মানুষের স্বপ্ন জেগে ওঠা চরের দখল নিতে রতনের নেতৃত্বে একত্রিত হয়। গ্রামের মানুষের পাশাপাশি রতনের প্রেরণা তার ভালবাসার মানুষ। সেও তাকে সাহস যোগায়। এমনি সময় ফিরে আসে নাদের। নিজের ফেরারি জীবন থেকে মুক্তি পেতে তালুকদারের চর দখলের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেয় সে। তবে বাড়ি ফিরে ছেলের প্রতিবাদী আর অধিকার রক্ষার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেখে সেও যোগ দেয় তালুকদারের বিরুদ্ধে চরের জমি দখলের সংগ্রামে। এদিকে তালুকদারও থেমে নেই। সেও প্রশিক্ষিত লাঠিয়াল আর তার বন্দুকসহ গ্রামবাসীর মুখোমুখি হয়। সংঘর্ষে তালুকদারের গুলিতে প্রাণ যায় নাদেরের। তবে বাবার খুনের প্রতিশোধ আর স্বপ্নের চর ফিরে পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যায় সংগ্রামী রতন। এভাবেই শেষ হয় চলচ্চিত্রের গল্প।

চলচ্চিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য রতনরূপী অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলনের দুর্দান্ত অভিনয়। একজন মঞ্চ অভিনেতা বলেই ভাল অভিনয় তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। তার সঙ্গে অন্য অভিনেতারাও ভাল অভিনয় করেছেন। বিশেষ একটি চরিত্রে অভিনয় করে পরিচালক নাদের চৌধুরীও অনেকটা চমকে দিয়েছেন। তবে চলচ্চিত্রে তালুকদাররূপী শহিদুজ্জামান সেলিমের নেতিবাচক চরিত্রের অভিনয় মনে রাখার মতো। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যখন দক্ষ অভিনেতা অভিনেত্রীর সংকট চলছে বিশেষ করে রাজীব, নাসির খান এবং সর্বশেষ হুমায়ূন ফরীদির মৃত্যুর পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে সে অবস্থায় শহিদুজ্জামান সেলিমের মতো জাঁদরেল মঞ্চ অভিনেতা চলচ্চিত্রের খল চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করছেন। ‘চালচর’ চলচ্চিত্রের তালুকদারের চরিত্রে শহিদুজ্জামান সেলিমের অভিনয় দেখে মনে হয়েছে আরও একজন খল চরিত্রের অভিনেতা পেয়ে গেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের চেহারাও বদলে দিতে পারেন তিনি। এর আগে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে সুঅভিনয়ের মাধ্যমে তিনি তার প্রমাণও দিয়েছেন। এছাড়া চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন দৃশ্যের চিত্রায়ন, সংলাপ, আলোর ব্যবহার, আবহ সঙ্গীত সবই মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। শিল্প নির্দেশনার বিষয়টি ছিল চমৎকার। সব মিলে ভাল একটি চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন অভিনেতা পরিচালক নাদের চৌধুরী। তবে কিছু কিছু বিষয় খটকাও লেগেছে। যেমন চলচ্চিত্রে নায়িকার চরিত্রে রূপদানকারী মোহনা মোস্তফা মীম সেরা নাচিয়ে হওয়ায় একটি গানে ভাল নেচেছেন নিঃসন্দেহে। ভাল অভিনয়ও করেছেন। তবে চলচ্চিত্রে তার চরিত্রের ব্যাপ্তি অনেকটাই কম মনে হয়েছে। গ্রামের সংগ্রামী মানুষগুলোর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তার ভূমিকা ও তার পরিচয়ও তুলে ধরা হয়নি। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের দুই তিনটি দৃশ্যে একটি পাগলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাবিহা জামান। কাহিনীর ধারাবাহিকতায় চরিত্রটির প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট নয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় খটকা লেগেছে যে নামে চলচ্চিত্রের নাম সে ধরনের কোন শব্দও উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি অভিনেতা অভিনেত্রীদের। কেন চলচ্চিত্রের নাম লালচর সে বিষয়ে কোন ইঙ্গিত নেই।

সব শেষে নদীমাতৃক বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীতে যখন পানি শূন্যতায় হাহাকার করছে মানুষ তখন জলছল ছল নদী এবং এর পাড়ের মানুষের গল্প নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ কতটা যুক্তিযুক্ত সেটাও প্রশ্নের দাবি রাখে। কারণ চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্প যেটা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি চলমান সময়কে ধরে রাখে। এই চলচ্চিত্র কোন সময়কে ধরে রাখল সেটাই প্রশ্ন জেগেছে। যদিও চলচ্চিত্রের গল্প বাংলাদেশের মানুষের জন্য সব সময়ই প্রাসঙ্গিক। সব মিলে ভাল একটি চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নদী পাড়ের মানুষের অধিকার সংগ্রামকে শৈল্পিকভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। এমন ভাল প্রচেষ্টার জন্য বাহবা পেতেই পারেন পরিচালক নাদের চৌধুরীসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা।