১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পলাতক জঙ্গীরা ফিরছে

  • জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার ও চিহ্নিত আসামিরা নির্বাচনী প্রচারে

ডি এম তালেবুন নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত ঘুরে এসে ॥ পলাতক একাধিক সন্ত্রাসী জঙ্গী গ্রুপ পৌর নির্বাচনকে সামনে রেখে দলে দলে ফিরে আসছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বৃহত্তম রাজশাহী অঞ্চলে। এদের অধিকাংশ বিগত দিনে তথাকথিত আন্দোলনের নামে নানান ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের চিহ্নিত আসামি। এদের প্রায় সকলেই বিএনপি জামায়াত, শিবির সমর্থক কর্মী ও ক্যাডার। অধিকাংশ এসব সন্ত্রাসী পৌর নির্বাচনের ভোটার না হয়েও ইতোমধ্যেই ইউনিয়ন ছেড়ে শহরে এসে প্রচার প্রচারণাসহ নানানমুখী নির্বাচনে কাজ করছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বৃহত্তর রাজশাহী ও বগুড়া অঞ্চলের প্রায় ডজন দেড়েক সীমান্ত শহরে এবার পৌর নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে ওইসব কর্মী ও ক্যাডাররা। কিন্তু এই উত্তাপ অন্যভাবে সন্ত্রাসে রূপ নিয়ে অরাজগতা সৃষ্টির পাঁয়তারাও হতে পারে। কারণ এবার তারা অনেকটা নির্বিঘেœ তাদের মৌলবাদী কর্মকা-ের এবং সাংগঠনিক কাজের অবাধ সুযোগ পেয়েছে নির্বাচনকে অছিলা ধরে নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে একটি অংশ ধরা পড়ে জেলখানায় রয়েছে, অপর বৃহত্তর অংশটি সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে পশ্চিম বাংলার মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থান নেয়, তবে তারা বসে ছিল না। এপারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে মাদক অস্ত্রসহ নানান ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান করেছে খুবই নির্বিঘেœ। এরা শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল থেকে নয় বৃহত্তর রাজশাহী, বগুড়া ও জয়পুরহাট থেকেও পালিয়েছিল ভারতে। পরবর্তীতে এরা কৌশল পরিবর্তন করে। তারা প্রায় এক বছর আগে টার্গেট করে বিভিন্ন পৌরসভাসহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে। তারই প্রতিফলন শুরু হয়েছে একাধিক পৌরসভায়।

তারা এবার দখলে নিতে চাচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংলগ্ন রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জসহ একাধিক পৌরসভা। বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চল নিয়ে গঠিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভা। গত পৌর নির্বাচনে এখানে জামায়াতের মেয়র থাকার কারণে এবারও তারা চাচ্ছে তাদের নিয়ন্ত্রণ। জট বেঁধেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে। এখানে বিএনপি কোন যোগ্যপ্রার্থী খুঁজে না পেয়ে জামায়াত থেকে বহিষ্কৃৃত সাবেক বহু বিতর্কের জন্ম দেয়া পৌর মেয়র আতাউর রহমানকে বিএনপির প্রার্থী করে ধানের শীষ দিয়ে ভোটযুদ্ধে নামিয়েছে। বহিষ্কৃত এই জামায়াত নেতা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ থেকে (শিবগঞ্জ, কানসাট) নির্বাচন করার খায়েশ নিয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষমেশ অনেক তদবির করে এখানকার নেতাদের হাত করে বিএনপিতে ঢুকে পড়ে। এই নিয়ে চারদিকে চাউর রয়েছে জামায়াতের বহিষ্কৃত এ নেতাকে বিএনপিতে প্রবেশ করতে প্রায় কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। পৌরসভায় জামায়াত বিএনপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে রয়েছে। আর তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরসহ শিবগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে পলাতক জামায়াত শিবির নেতাকর্মীরা ফিরে এসেছে নিজ নিজ এলাকায়। এমনকি এই সুযোগে জামায়াত শিবিরকর্মীদের আড়ালে পলাতক বিএনপি কর্মীরাও ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফিরে আসেনি এমনটি বলা যাবে না। পৌরসভার নির্বাচনে ফিরে আসা পলাতক বিএনপি কর্মীরা ভোটার না হয়েও তাদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। ভারতে পলাতক থাকা অবস্থায় বিএনপির বহু মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জামায়াতের বিশাল নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়ে অনেকটাই জামায়াতমুখী হয়ে পড়েছে। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আলাতুলি, চর অনুপনগর, চরবাগডাঙ্গা, দেবিনগর, ইসলামপুর, নারায়ণপুর, রানিহাটি, শাহজাহানপুর ও সুন্দরপুর ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের কয়েক সহস্র জামায়াত শিবির ও বিএনপির পলাতক কর্মীরা ফিরে এসে সারাদিন প্রচারের কাজ করে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে বা নিজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। সবচেয়ে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত শিবগঞ্জ পৌরসভা ও তৎসংলগ্ন সীমান্ত ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে ১৪টি ইউনিয়নের হাজার হাজার জামায়াত শিবির ও বিএনপি কর্মীতে ভরে গেছে। গিজগিজ করছে এলাকা তাদের পদচারণায়। বিশেষ করে বিনোদপুর, শ্যামপুর, দাইপুকুরিয়া, দুর্লভপুর, ঘোড়াপাখিয়া, কানসাট, মোবারকপুর, মনাকষা, নয়ালাভাঙ্গা, পাঁকা, শাহবাজপুর, ছত্রজিতপুর, উজিরপুর ও ধাইনগর ইউনিয়নের প্রায় প্রত্যেকটিতে জামায়াত বিএনপির প্রভাব খুবই বেশি। অধিকাংশ ইউপির চেয়ারম্যান জামায়াত ও বিএনপি হওয়ার কারণে তারা শিবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব খাটিয়ে চলেছে। শাহবাজপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ হলেও মেম্বার ও কাউন্সিলরদের অধিকাংশ আওয়ামীবিরোধী। এই ইউনিয়নের হাজারদীঘিতে একটি বড় কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। আমবাগানসহ স্থাবর সম্পত্তিও রয়েছে অঢেল। অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ শিক্ষক জামায়াতপন্থী। ছাত্ররা ইতোমধ্যেই জামায়াতের পক্ষ নিয়ে প্রচারে মেতে উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম জঙ্গী উত্থানের কালে হুজরাপুর এলাকার একটি বাড়ি রেড করে পুলিশ একাধিক জঙ্গীকর্মীকে আটক করেছিল। এরা ছিল বাংলা ভাইয়ের অনুসারী। মনাকষা ইউনিয়নের ভবানীপুর, বগলু চৌকা, চৌকা, পার চৌকা, আরাজী বফুল, কালাপাহাড়ী, চান্দপুর, দুটি নতুনচর, বাঘববাটি, রাজনগর, সিংনগর, নামোটোলা, কায়াতপাড়া, শাহপাড়া, তারাপুর, পুড়াপাড়া, মাজেদ মৌলভীপাড়া, ঠুটাপাড়াসহ ১১১টি মহল্লার প্রতিটি বাড়ি জামায়াত শিবির ও বিএনপি কর্মীতে ঠাঁসা। এসব কর্মীরা দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ফিরেছে। পুরো ইউনিয়ন খুবই দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন। এই ইউনিয়নের সিংহভাগ যুবক শ্রেণী অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা বছর ধরে পলাতক থাকলেও তাদের চোরাচালান ব্যবসা থেমে থাকেনি। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে বিএনপি, জামায়াতের প্রার্থীদের বড় মাপের অর্থের যোগান দিচ্ছে সীমান্ত ইউনিয়নের চোরাকারবারিরা। আরও জানা গেছে নির্বাচনের পূর্বদিন বা রাত পর্যন্ত চোরাকারবারি পণ্যের লভ্যাংশ তারা তাদের সমর্থক মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের হাতে তুলে দিবে।