১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজাকার হওয়া সহজ হয়ে যাচ্ছে ॥ কঠিন হয়ে উঠছে মুক্তিযোদ্ধা থাকা

  • মুনতাসীর মামুন

‘জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক সমাবেশে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে হঠাৎ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিনিট পাঁচেক বক্তব্য দেন। মৃদু লয়ে মুখে একটি বিতৃষ্ণার ভাব নিয়ে তিনি কথাগুলো উচ্চারণ করেন। অনেকে এতে স্তম্ভিত হয়ে যায়। শুনেছি, বিএনপির অনেক সমর্থক হতাশ হয়ে বলেছেন, যখনই দল একটু চাঙ্গা হয়ে ওঠে তখনি তিনি বা তার পুত্র এমন সব কথা বলেন যে, দলের পারদ আবার নিচে নেমে যায়। তাদের কেউ কেউ আবার ঠাট্টা করে বলেছেন, শেখ হাসিনা সাকসেসফুল। বিএনপির পরামর্শদাতাদের মধ্যে তার এজেন্টদের অনুপ্রবেশ করাতে পেরেছেন। পৌর নির্বাচনে একঘেয়ে সংবাদের মধ্যে এরকম একটি সংবাদ পেয়ে মিডিয়াকর্মীরা হামলে পড়ে। এ নিবন্ধ যখন লিখছি তখন ছাপা ও বিদ্যুতায়িত মাধ্যমে খালেদার বক্তব্য নিয়ে বাদ প্রতিবাদ নিন্দা চলছে।

আমরা অনেকে এ বক্তব্যে বিস্মিত বা বিচলিত হইনি। খালেদা জিয়া যা বলেছেন, তা তার জন্য স্বাভাবিক। না বললেই মনে হতো অস্বাভাবিক। মনেপ্রাণে তিনি পাকিস্তানের পূজারী, বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় তার মধ্যে একটি যন্ত্রণা আছে, তার বহির্প্রকাশ মাঝে মাঝে ঘটে যায়। কী করা, মনের ওপর তো কারও হাত নেই!

যখন যুদ্ধ শুরু হয়, অনেকের বিবৃতি টক শো শুনেছি, তিনি ঢাকা ছেড়ে যেতে রাজি হননি। যে সব সেনা কর্মকর্তা যুদ্ধে গিয়েছিলেন, তারা পরে তাদের স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে গিয়েছিলেন অথবা অবরুদ্ধ দেশে লুকিয়ে ছিলেন। বলা হয়, জিয়াউর রহমান তার স্ত্রীর জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি গেরিলা সদস্যদের পাঠিয়েছিলেন স্ত্রী-পুত্রকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। একইভাবে, অনেকের স্ত্রীকে গেরিলারা নিয়ে গিয়েছিলেন। খালেদা চলে যেতে রাজি হননি। ঘটনাটি সত্য কী মিথ্যা জানি না। এর সত্যতা নিরূপণ করতে পারবেন একমাত্র খালেদা জিয়া। যেহেতু বিষয়টির সত্যাসত্য নিরূপণ করা যাচ্ছে না, সে কারণে আমি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেব না। তবে, অনেকে মনে করেন সেটি তার পাকি প্রেমের প্রথম উদাহরণ।

এরপর আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। খুব সম্ভব হারুন হাবিবের একটি বইয়ে পড়েছিলাম অথবা হারুন হাবিব ঘটনাটি বলেছিলেন। তিনি তখন যুদ্ধ-সাংবাদিক। জিয়ার সঙ্গে এক নৌকায় অবস্থান করছেন। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এমন সময় একদল এসে খবর দিলেন, তার স্ত্রী আসতে রাজি হননি। মুহূর্তে জিয়ার ভঙ্গি বদলে যায়। থম মেরে তিনি সিগারেট টানতে থাকেন। একটি কথাও বলেননি সেদিন রাতে। জিয়া যেহেতু নেই, তাই এর সত্যতা নিরূপণ কঠিন, হাবিব আছেন। তাই এটি ৫০% সত্য মেনে নিলাম। এর পরের ঘটনাটি বলেছেন আরেকজন যিনি সিলেটের এক সময় আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ গাজীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি বললেন, সিলেট মুক্ত হয়েছে। প্রশাসনের ভার ফরিদ গাজীর ওপর। একদিন সকালে দেখেন এক বিপর্যস্ত মহিলা তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। জানালেন, তিনি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। দেখা করতে চান স্বামীর সঙ্গে। পরে ফরিদ গাজী জিয়াকে খবর দিয়ে আনেন এবং জানান তার স্ত্রী তার জন্য অপেক্ষা করছেন [ফরিদ গাজীর বাসায় নয়]। জিয়া দেখা করতে অস্বীকার করেন। এটি ঠিক কিনা তা একমাত্র খালেদা জিয়াই বলতে পারবেন। কারণ, ফরিদ গাজী ও তার সহচর এখন প্রয়াত।

জিয়া যে ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন তা একেবারে মিথ্যা নয়। কারণ, ওয়াজেদ মিয়া তার গ্রন্থে জানিয়েছেন, জিয়া কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। বারবার খালেদা তখন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরে ধরনা দিচ্ছিলেন। তা দেখে ওয়াজেদ মিয়ার খুব মায়া হয় এবং তার স্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা মিটিয়ে দিতে। হাসিনা মধ্যস্থ করার কাজটি করেন। বঙ্গবন্ধু জিয়াকে ডেকে একরকম নির্দেশ দেন তার স্ত্রীকে গ্রহণ করার এবং তারপর কুমিল্লার জিওসি করে তাকে পাঠিয়ে দেন। এই বই যখন বের হয় তখন এ বিষয়ে খালেদা বা অন্য কেউ প্রতিবাদ জানাননি। ওয়াজেদ মিয়া অসত্য লিখবেন এটি বিশ্বাস করা কষ্ট। কিন্তু এখান থেকে দুটি বিষয় অনুমান করে নিতে পারি-

১. জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিশ্চয় খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এবং সে রাগটি পুষে রেখেছিলেন।

২. অন্যদিকে, খালেদা কখনও ভাবেননি, হাসিনা তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবেন। অবশ্য তিনি নিজেও ভাবেননি রাজনীতিতে আসবেন। কিন্তু, হাসিনাও নেত্রী হয়েছেন এবং ঐ বিষয়টি জানেন, এটি সব সময় হয়ত তার মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সে কারণেই আদর্শগত দিক ছাড়াও তিনি ক্ষুব্ধ। হাসিনার সৌজন্য বোধ এখনও প্রবল, খালেদার বিরুদ্ধে তিনি অনেক কথা বলেন বটে, কিন্তু এ বিষয়টি বলেননি কখনও এতেই দু’জনের পার্থক্যটি প্রবল হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু কাউকে খুশিতো করতে পারেনইনি বরং নিজের ও পরিবারের জন্য বিপদ ডেকে এনেছেন এবং উত্তরাধিকারীকে যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে গেছেন, জিয়াকে ঐ নির্দেশ দিয়ে।

আমি এসব পটভূমিকা বাদ দিই। কিন্তু, একটি বিষয়ে খালেদার পাকিপ্রেম প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি যখন প্রথম প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি যার হাতে বন্দী ছিলেন সেই জেনারেল জানজুয়া পাকিস্তানে সেনাপ্রধান হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে খালেদা সবাইকে হতবাক করে দিয়ে শোকবার্তা পাঠান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও শোক জানাননি তখনও। পরাজিত জেনারেলের জন্য সরকারপ্রধান শোক প্রকাশ করেন না। পাকিস্তান সরকারও মহাবিব্রত। এই বিভ্রাট কীভাবে সামাল দেয়া হয়েছিল জানি না। পরাজিত কোন জেনারেলের জন্য বিজয়ী দেশের সরকারপ্রধান শোক জানিয়েছেন বিশ্বে এমন ঘটনা ঘটেনি আলেকজান্ডারের সময় থেকে। পাকিস্তানের সহযোগী জামায়াতও এমন কাণ্ড করেনি। এমনকি খালেদা জিয়া কয়েকদিন আগে যা বলেছেন, জামায়াত নেতারাও এভাবে এদেশে এক নিশ্বাসে এমন সব মন্তব্য করার সাহস পায়নি।

কী বলেছিলেন খালেদা জিয়া? কোন পত্রিকা কিন্তু সম্পূর্ণ ভাষ্য হুবহু দেয়নি। এটিএন নিউজে শুধু পুরো ভাষ্য শুনিয়েছে। এমনকি দৈনিক জনকণ্ঠ ছাড়া কেউ শিরোনামও করেনি তেমনভাবে। খালেদা জিয়ার সমব্যথী যে অনেক এটি বোঝা যায়। যে কারণে, খালেদা অবলীলাক্রমে এসব বলতে পারেন। আগেও বলেছেন, সেসব আবার অনেকে ভুলে গেছেন। তাই সাম্প্রতিক বক্তব্য তাদের অবাক করেছে। জিয়া-গোলাম আযম-খালেদা-এরশাদের অনেক কীর্তিকাণ্ড, আমাদের ভুলে যাওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা আছে। আবার অসম্ভব ক্ষমতা আছে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড ভুলে না যাওয়ার। যা হোক খালেদা যা বলেছিলেন তার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা এরকম-

১. মুক্তিযুদ্ধে কি ৩০ লাখ শহীদ হয়েছে? আদৌ নয়, আদৌ নয়। ‘আজকে বলা হয় এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে, এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে।’

২. “যারা যুদ্ধ করেনি, বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত তারাই এখন আওয়ামী লীগের প্রিয় লোক।” [জনকণ্ঠ, ২২.১২.১৫]

৩. “আওয়ামী লীগের নিজের ঘরেই মুক্তিযোদ্ধার নাম দিয়ে যুদ্ধাপরাধী পালে, মন্ত্রী বানায়। এসব তারা চোখে দেখে না। তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেই। মাওলানা নুরুল ইসলাম কি মুক্তিযোদ্ধা ছিল? সেই রাজাকারকে মন্ত্রী বানিয়ে জাতীয় পতাকা দিয়েছিল শেখ হাসিনাই। নিজের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও অনেক বড় রাজাকার আছে, তাদের তিনি চোখে দেখেন না। নিজেদের কথা তারা অতি সহজে ভুলে যান। কিন্তু জনগণ তা সহজে ভোলে না।” [ঐ]

৪. “সরকার ক্ষমতায় থাকলে মুক্তিযোদ্ধারা সঠিক সম্মান পায় না। অথচ যারা মুক্তিযুদ্ধ করেনি তারা আজ বড় মুক্তিযোদ্ধা। ক্ষমতায় গেলে এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।” [ঐ]

৫. “অনেকেই আছেন যারা মুক্তিযুদ্ধের সত্য কথা লিখেন। এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারও সত্য কথা লেখেন। কিন্তু সত্য লেখার পর এ কে খন্দকারকে বইগুলো প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে। জবাবে উনি বলেছেন, যা সত্য তাই লিখেছি, প্রত্যাহার করব কেন? তাজউদ্দীন আহমদের মেয়েও সত্য কথা বলেছেন। কিন্তু সত্য কথা লেখায় এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। অথচ তিনি আওয়ামী লীগেরই অত্যন্ত প্রিয় লোক ছিলেন।” [ঐ]

৬. “আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের দল নয়- তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, কিন্তু তাদের দলে কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই। ১৯৭১ সালে তারা স্বাধীনতা চাননি। চেয়েছিলেন কেবল ক্ষমতা।” [ঐ]

৭. “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ না করে খালেদা জিয়া দাবি করেন, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না।” [প্রথম আলো, ২২.১২.১৫]

৮. “খালেদা জিয়া একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে সত্যিকারে যারা সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করেছিল, বিএনপি তাদের বিচার চায়। কিন্তু সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্মত, স্বচ্ছ।” [ঐ]

মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নিয়ে ৮টি বক্তব্য। এতে সময় যতটুকু লেগেছে তা অনুমেয়। এ ধরনের বক্তব্য তিনি আগেও দিয়েছেন। জাতীয় নীতি-কৌশল বিষয়ে কখনও কিছু বলেননি। চলবে...