১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধৃষ্টতা

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সীমাহীন ধৃষ্টতা জাতিকে আবারও অবলোকন করতে হচ্ছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস, শান্তি কমিটির হায়েনারা দেশের অভ্যন্তরে ত্রিশ লাখ বাঙালীকে হত্যা করেছে। এ কথা আজ শুধু অনুমানই নয়, মীমাংসিত সত্য। এর বাইরেও সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় সাগর এবং শরণার্থী শিবিরেও অনেকে মারা গেছেন। ইউনিসেফের হিসেবে একাত্তরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে শরণার্থী শিবিরসহ সেখানে যাতায়াতকালে মৃত্যুর সংখ্যা ২০ লাখের বেশি বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধে যে ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন বা দিতে বাধ্য হয়েছেন, তা নতুন কোন তথ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী দলিলপত্রেই এই সংখ্যাটি উঠে এসেছে। তাই দেখা যায়, দেশ ও জাতি যখন মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৪তম বার্ষিকী উদ্্যাপন করছে, তখন তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকা বিএনপি-জামায়াত জোট প্রধান বেগম জিয়া মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সরকারী ও স্বীকৃত পরিসংখ্যান অস্বীকার করে প্রমাণ করেছেন আবারও যে, একাত্তরে তিনি যেভাবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অনুগত ছিলেন, এখনও সেই অবস্থানে অটল রয়েছেন। পুত্রের পর এবার মায়ের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিয়ে বিকৃত তথ্য আক্রমণাত্মক ভাষায় উপস্থাপন পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করলেও বিস্মিত করেনি তাদের অতীত কার্যকলাপের কারণে। চলমান ইতিহাসের সত্য পাঠের ধারাবাহিকতায় যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষ সেদিন অবলীলায় স্বীকার করলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ প্রাণ দিয়েছিলেন, আর দু’লাখ মা-বোন সম্ভ্রব হারিয়েছিলেন। এই স্বীকৃত সত্যের বিপরীতে কোন্ উদ্দেশ্যে এই সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হলো। কী ভাবে তিনি উক্তি করলেন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই উক্তি তো পাকিস্তানীদের ভাষ্য। তারাই এসব প্রশ্ন তুলে আসছে। যে সংশয় পাকিস্তানী গোয়েন্দা বাহিনীর মদদপুষ্ট গবেষকরা প্রকাশ করছেন, সেই প্রশ্ন ও সংশয় তিন দফা প্রধানমন্ত্রী থাকা জামায়াত-বিএনপি জোট নেত্রীর মুখে একেবারেই শোভা পায় না বলে মনে হবে। কিন্তু এটাই বাস্তবতা যে পাকিস্তানী চেতনা ও তাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই তিনি এ সব কথা বলছেন। যেমন বলে আসছেন তার পুত্র লন্ডনে বসে। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি এসব প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসেননি। তার সহযোগী যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতসহ একাত্তরের পরাজিত শক্তি এসব বাক্য অতীতে প্রলাপের মতো উচ্চারণ করত। এখন তাদের কণ্ঠ ধারণ করে তিনি একইভাবে একই ভাষায় বিতর্ক তুলেছেন। ঠিক যেমনটা পাকিস্তান করছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমালোচনা করে পাকিস্তান যখন একাত্তরের গণহত্যার কথা অস্বীকার করছে, তখন এই বক্তব্য পেশের অবশ্যই মাজেজা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনা ক্যাম্পে অবস্থান করা খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্য করে ধৃষ্টাচারে লিপ্ত হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর সাংবাদিক সিডনি সেনবার্গ দেশের প্রায় সব জেলায় সফর করে এসে যে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন তাতে লিখেছিলেন, এমন কোন পরিবার নেই, যে পরিবারের সদস্যরা শহীদ হননি। আর দেশজুড়ে শুধুই বধ্যভূমি। সোভিয়েত বার্তা সংস্থা ‘তাস’ ‘ইউনএনআই’ ও ‘ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বলেছে। পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশনও বলেছে, গণহত্যা হয়েছে। কিন্তু গণহত্যায় জড়িত জামায়াতীরা সব সময় অস্বীকার করে এসেছে এই পরিসংখ্যান। তারা এমনটাও বলছে, এ দেশে কোন গণহত্যা হয়নি, কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির পর পাকিস্তানও তা বলছে।

বঙ্গবন্ধুর ’৭১-এর ৭ মার্চের ও ’৭২-এর ২০ জানুয়ারির ভাষণেই স্পষ্ট আছে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি এবং দেশে কত শহীদ হয়েছেন তার পরিসংখ্যানও। ৪৪ বছর আগে সংঘটিত যুদ্ধ ইতিহাসের অংশ। তা কোন ব্যক্তি বিশেষের ভাষ্যে পরিবর্তন হতে পারে না। তবে পেট্রোলবোমা মেরে জীবন্ত মানুষ হত্যা করে যিনি সেই দায় অস্বীকার করতে পারেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় নাশকতার পথ অবলম্বন করতে পারেন তিনি মুক্তিযুদ্ধকে হেয় করতে দ্বিধা করবেন, তা নয়। তার এই অবস্থান কখনই দেশপ্রেমের পরিচায়ক নয়, তা শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতা, শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের মাধ্যমে অপরাধ করেছেন জঙ্গী নেত্রী হিসেবে খ্যাত বেগম জিয়া। সরকারের উচিত, আইন করে এসব মিথ্যাচার বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ। ‘হলোকস্ট ডিনাইয়াল এ্যাক্ট’-এর মতো আইন প্রণয়নের দাবি ইতোমধ্যে উঠেছে দেশবাসীর পক্ষ থেকে। অবিলম্বে জাতীয় সংসদে এই আইন পাস করা হবে- বাঙালী তাই চায়।