১৯ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাড হিস্ট্রি থেকে গুড নিউজ

  • তাপস মজুমদার

‘খারাপ ইতিহাস থেকে ভাল কিছু তৈরি হতে পারে’- কথাটি আমাদের নয়, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর। এতদিনে সবাই জেনে গেছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আমন্ত্রণে তিনি কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। সরেজমিন বিভিন্ন স্থান ও প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন।

পাবলিক বক্তৃতা দিয়েছেন, সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সর্বোপরি সুদীর্ঘ সাক্ষাতকার দিয়েছেন গণমাধ্যমে। প্রায় সর্বত্রই তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। সত্যি বলতে কি, এক্ষেত্রে আমাদের ভুল ও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, বাংলাদেশ সম্পর্কে কৌশিক বসুর কোন নেতিবাচক মন্তব্য আমাদের চোখে পড়েনি। হতে পারে তিনি কলকাতার বাঙালী ভদ্রলোক। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ-দার্শনিক অমর্ত্য সেনের গুণমুগ্ধ এবং বাঙালী বিধায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কিছুটা হলেও আবেগতাড়িত। এরপরও বলতেই হয়, কৌশিক বসু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ, দেশে-বিদেশে স্বনামে গবেষণা কার্যক্রমের জন্য সুপ্রসিদ্ধ ও স্বনামখ্যাত, সর্বোপরি বিশ্বব্যাংকের মতো একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের প্রায় সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল পদে প্রতিষ্ঠিত। সেক্ষেত্রে তার সঙ্গে শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং বিশ্বের প্রায় সব দেশ, নিদেনপক্ষে ১৯৫-১৯৬টি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির ছোট-বড় অন্তত আণুবিক্ষণিক চালচিত্র তার চোখের সামনে প্রতিভাত। সেই তিনি যখন প্রায় সব ক্ষেত্রে, এমনকি পদ্মা সেতুসহ প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সূচকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ও অগ্রগতির আন্তরিক প্রশংসা করেন, তখন আবেগের আতিশয্যে ভেসে না গিয়েও সত্যের খাতিরে অন্তত বলতেই হয়, ভাল লাগে বৈকি। সেক্ষেত্রে শুরুতেই কবুল করে নেয়া ভাল যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৌশিক বসুর প্রশংসায় যৎকিঞ্চিত আবেগ ও উচ্ছ্বাসের ছোঁয়া থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাটা তিনি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে তুলে ধরেছেন। একজন রাজনীতিবিদ অথবা কূটনীতিক এ জাতীয় প্রশংসা করলে যতটা না গুরুত্ব পেত; একজন প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ হিসেবে সে প্রশংসা করায় কৌশিক বসুর বক্তব্য গুরুত্ব পেয়েছে অনেক বেশি এবং বহুলাংশে।

পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের যখন টানাপোড়েন চলছিল, তখন সম্ভবত কৌশিক বসু সে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন না। তার দেয়া তথ্যমতে জানতে পারছি, বিশ্বব্যাংকে তার কার্যকালের তিন বছর চলছে। অতএব পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দোষ ও দায়িত্বের ভার কোনভাবেই তার ঘাড়ে বর্তায় না। তবু যেহেতু তিনি সেখানে বর্তমানে একটি উঁচু পদে অধিষ্ঠিত, সেহেতু তিনি কথাটি বলেছেন পরোক্ষভাবে। বলেছেন, ‘খারাপ ইতিহাস থেকে ভাল কিছু তৈরি হতে পারে।’ পদ্মা সেতু হচ্ছে তাই। তার মতে, নিজস্ব অর্থায়নে এবং নিজেদের উদ্যোগে বাংলাদেশ এত বড় একটি প্রকল্প ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এটা দশ বছর আগে ভাবাও যেত না। তার মানে বাংলাদেশ এখন অনেক পরিপক্ব এবং এরপরই আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন মাত্রার অংশীদারি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। তার সহজ মানে দাঁড়ায়, যে বিশ্বব্যাংক তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু থেকে ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা থেকেই এখন বলা হচ্ছে অংশীদারি সম্পর্ক তৈরির প্রস্তাব। এখানেই বাংলাদেশের সাফল্য ও সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি নিহিত।

পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ এবং তার আদৌ কোন সুরাহা না হওয়ায় ভাবমূর্তির সমস্যা সম্পর্কে কৌশিক বসু বলেন, ‘এতে কোন ক্ষতি আছে বলে মনে হয় না...’ তবে আমাদের বিবেচনায়, এখন যেহেতু বাংলাদেশ স্বউদ্যোগ ও আয়োজনে পদ্মা সেতু বানাচ্ছে, সেহেতু বহুকথিত দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণের দায় ও দায়িত্ব বিশ্বব্যাংকের ঘাড়েই বর্তায়। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্রশাসনের না হোক, অন্তত অতীতে যিনি এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং যার কলমের এক খোঁচায় বিদায়ের প্রাক্কালে এই গর্হিত কাজটি (তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক) করে গেলেন, জবাবদিহির দায়িত্ব তো তারই। কেন জানি একই সঙ্গে সরে দাঁড়ায় এডিবি, জাইকা, আইডিবিও। এর কারণ ও রহস্য বোঝা গেল না। এর পাশাপাশি অবশ্য তাদেরও অর্থাৎ এদেশীয় ‘বিভীষণদের’ যে বা যারা এর পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছিলেন এবং প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা দিয়েছিলেন। নামোল্লেখ না করলেও তারা নিশ্চয়ই প্রতিদিন আয়নায় নিজেদের চেহারা অবলোকন করেন। বড় জানতে ইচ্ছা করে, দেশদ্রোহিতার দায়ে তারা কখনও নিজেদের অভিযুক্ত করেন কিনা! অন্তত তখন, যখন পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে বেশ জোরেশোরে। যতদূর জানি, পদ্মা সেতু নিয়ে তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগের মামলাটি একরকম ঝুলে আছে কানাডার এক আদালতে এবং আদৌ সেটি কোনদিন প্রমাণিত অথবা আলোর মুখ দেখবে কিনা, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। তবু আমরা চাই যে, অন্তত কিছু না কিছু বেরিয়ে আসুক, দু’দিন আগে অথবা পরে। তাতে অন্তত বর্তমানে যে পদ্মা সেতু হচ্ছে এবং এর পাশাপাশি অন্যান্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজ, সেগুলোতে একটা অনিবার্য চাপের সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংক যাই বলুক না কেন, দুর্নীতি তো কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং সারাবিশ্বের এক নম্বর সমস্যা। এমনকি বিশ্বব্যাংকেও এর উদাহরণ বিরল নয়। এমনকি নারীঘটিত কেলেঙ্কারিও। এর সর্বশেষ উদাহরণ হতে পারে বিশ্ব ফুটবল সংস্থা বা ফিফা। বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে কি বলবে? কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে সর্বত্রই।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে। এ বিষয়েও গত কয়েক বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরে তর্ক-বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে সিপিডিসহ দু’একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা অহেতুক জল ঘোলা করার প্রয়াস পায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিয়ে। সরকারীভাবে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি বলা হচ্ছে ৬ দশমিক ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত। এ বিষয়ে কৌশিক বসু বিশ্বব্যাংকের সদর দফতর ওয়াশিংটনে সেখানকার গবেষণা সেলের পরিসংখ্যান থেকে যা পেয়েছেন তা হলো, বর্তমানে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বিশ্বের খুব কম দেশেই হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকার প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশেরও কম। ব্রাজিলে মাইনাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ভেনিজুয়েলাতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি। জাপানেও, এমনকি ফিনল্যান্ডেও। মোটকথা বৈশ্বিক মন্দার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গড় সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। ‘এসব এখানকার লোকদেরও বোঝা দরকার’ বলেই তিনি বোধহয় বিনয় করেই বলেছেন, ‘এটা কার জন্য হচ্ছে, সেটা জানি না। কিন্তু এটা অবশ্যই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি।...’ আমরা আদৌ অর্থনীতিবিদ বা তথাকথিত বিশারদ বা বিশেষজ্ঞ শ্রেণীর নই। এক্ষেত্রে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকার কথা স্বীকার করেও বলব, বাংলাদেশের এই অগ্রগতি ও উন্নয়নের কৃতিত্বের দাবিদার এ দেশের জনগণ, সাধারণ মানুষ, মুটেমজুর- কৃষক-জনতা, গার্মেন্টস শ্রমিক প্রমুখের। যাদের কথা কেবল ভোটের সময় ছাড়া আমরা মনেও রাখি না। এই ১৬ কোটি সাধারণ মানুষের অব্যাহত ও নিরন্তর প্রচেষ্টারই অনিবার্য সুফল হচ্ছে জাতীয় প্রবৃদ্ধি। যদিও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ প্রমুখের মতে, জাতীয় প্রবৃদ্ধি দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনমান সব সময় পরিমাপ করা যায় না, তবুও বলতেই হয়, সার্বিকভাবে দেশের মানুষ সাধারণভাবে ভাল আছেন। অন্তত দু’বেলা দুমুঠো ভাত, একটু শাকপাতা, একটু ডাল ও নুন পাতে পড়ছে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ানোর ব্যাপারেও প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৌশিক বসু। তার মতে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে যাওয়া সম্ভব যদি বিনিয়োগের হার বর্তমানের ২২ শতাংশ থেকে ৩২-৩৩ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগ। এর পাশাপাশি অত্যাবশ্যক গণতন্ত্র, সুশাসন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুত- গ্যাস-জ্বালানি সর্বোপরি সুশাসন। এ বিষয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই যে, এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশের ভাবমূর্তি, আত্মসম্মান এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার খাতিরেও আমাদের সেসব অর্জন করতে হবে।

এই মাত্রা পাওয়া