১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি সই

  • ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি সই করেছে সরকার। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে রাশান ফেডারেশনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, যা টাকার অঙ্কে এক লাখ এক হাজার কোটি টাকায় রূপপুরে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণ করবে রাশান ফেডারেশন।

সরকারের পক্ষে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোঃ মনিরুল ইসলাম এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির সাভুসকিন এ চুক্তিতে সই করেন। নির্মাণ শুরুর সাত বছরের মাথায় বিদ্যুত কেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুত কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে। অন্যদিকে এর এক বছর পর দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ অক্টোবরে উৎপাদনে আসবে। কেন্দ্রটি ৫০ বছর ধরে বিদ্যুত উৎপাদন করবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম, বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সজান্ডার এ নিকোলায়েভ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান আমলেই পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় সীমিত আকারে ১০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একই স্থানে রাশিয়ার সহযোগিতায় পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রথম অবস্থায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের কথা থাকলেও এখন এ বিদ্যুত কেন্দ্রে দুটি ইউনিটে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হবে। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের জ্বালানি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এতে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম বর্জ্য অনেকখানি নিরাপত্তার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশের জন্য কঠিন এ কাজটির দায়িত্ব নিয়েছে রাশিয়া, যা আমাদের জন্য খুবই ভাল দিক।

স্বাধীনতা উত্তর ১৯৬১ সালে পরমাণু কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার পরে ১৯৬৩ সালে প্রস্তাবিত ১২টি এলাকার মধ্য থেকে বেছে নেয়া হয় রূপপুরকে। পরবর্তী সময়ে রূপপুর নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও কার্যক্রম আর এগোয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় ৫০ বছর আগের নেয়া উদ্যোগটি সক্রিয় করে তোলা হয়। দ্রুত পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২০১০ সালে সংসদে প্রস্তাব পাস করে গঠন করা হয় একটি জাতীয় কমিটি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুরে এ বিদ্যুত কেন্দ্রের ভিত্তি স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত আগস্ট মাসে পাবনার রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র পরিচালনায় কোম্পানি গঠন করতে সংসদে বিল পাস হয়। আইন অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশনের হাতে। আর কেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্ব পাবে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ’।

গত ১৫ ডিসেম্বর ঢাকায় এটি অনুস্বাক্ষর করেছে রাশিয়া এবং বাংলাদেশ। আর চুক্তিটি গত বুধবার সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করে। চুক্তিতে বিদ্যুত কেন্দ্রটির নক্সা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ, উৎপাদন, নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি, পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুত কেন্দ্র পর্যন্ত যন্ত্রাংশ পরিবহন এবং গ্যারান্টি পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা প্রদানের কথা উল্লেখ করেছে। রাশিয়া এবং বাংলাদেশের মধ্যে ১৩ দফা আলোচনার ভিত্তিতে ৪৭টি অনুচ্ছেদ এবং ৫৭৩টি উপ-অনুচ্ছেদের চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণ এবং পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল সৃষ্টি করবে। বিদ্যুত কেন্দ্রটির প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। এরপর মূল বিদ্যুত কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে বিদ্যুত কেন্দ্রটির নক্সা প্রণয়নের কাজ শেষ করেছে এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট।

মোট ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির মধ্যে বিদ্যুত কেন্দ্রের মূল্য ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ২৫৩ বিলিয়ন ডলার। বিদ্যুত কেন্দ্রের ভূমি উপযুক্ত করার জন্য ৫৪৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে; এছাড়া ইতোমধ্যে বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার জন্য ব্যয় হওয়া ৫৫১ মিলিয়ন ডলার বাদ যাবে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে রাশিয়ান ঋণ ১১ দশমিক ৩৮৫ বিলিয়ন ডলার আর বাংলাদেশ সরকারের তহবিল থেকে এক দশমিক ২৬৫ বিলিয়ন ডলার রয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের সময়কাল সাত বছর ধরা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের সময়কাল ২৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ বছর গ্রেস প্রিরিয়ড রয়েছে। ছয় মাসের লাইবরের সঙ্গে এক দশমিক ৭৫ শতাংশ যোগ করে ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হবে। তবে কোনক্রমেই বছরে চার ভাগের বেশি সুদের হার হতে পারবে না।