১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তুলির আঁচড়ে চিরায়ত বাংলার মুখ- কথা সুর ও কণ্ঠের জাদুকর

তুলির আঁচড়ে চিরায়ত বাংলার মুখ- কথা সুর ও কণ্ঠের জাদুকর
  • প্রচারবিমুখ শিল্পী আব্দুল হাই

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল

শিল্পী আব্দুল হাই। তাঁর তুলির ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে চিরায়ত বাংলার মুখ। বাংলার প্রকৃতি, মানুষের জীবন সংগ্রাম, সংস্কৃতি সবই স্থান পেয়েছে তার তুলির আঁচড়ে। তাঁর আঁকা তৈলচিত্র বিমোহিত করবে যে কাউকেই। তাই দেশ-বিদেশের রাজপ্রাসাদেও স্থান পেয়েছে এই গুণী শিল্পীর ছবি। মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী তীরের নয়গাঁও গ্রামে বেড়ে ওঠা এই কালজয়ী শিল্পী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ছবি এঁকে যেমন প্রসিদ্ধ করেছেন চারুকলাকে তেমনি গান লিখে, নিজে সুর করে আবার নিজ গলায় গেয়ে আলোকিত করেছেন সঙ্গীত জগতকে। নাটকেও কম যাননি তিনি। সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় তাঁর ছোঁয়া ছিল আলোকবর্তিকার মতো। তার চিত্রকর্ম যেমন জাগরিত করেছে, তেমনি গানের কথা, সুর আর কণ্ঠ আন্দোলিত করছে বাঙালীর সার্বিক মুক্তি। পাশাপাশি স্বচ্ছ, সুন্দর, শান্ত ও ¯িœগ্ধ রোমান্টিকতাও রয়েছে তাঁর শিল্পকর্মে। কিন্তু প্রয়াত সেই গুণী শিল্পীকে যথাযথভাবে স্মরণ করা হচ্ছে না।

বাঙালী সংস্কৃতিতে আজ বিদেশী আগ্রাসন চলছে। বাঙালী হয়েও অনেকে বিদেশী সংস্কৃতি লালন করছে। এই আগ্রাসন কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। তা রুখতে হলে শিল্পকর্মের মাধ্যমে জোরালো সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরী। আর এক্ষেত্রে দেশজ সংস্কৃতির ধারক বাহক শিল্পী আব্দুল হাইদের মতো গুণী শিল্পীদের নাম চলে আসে।

শিল্পী আব্দুল হাই ১৯৩৭ সালের ৯ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্ব নয়াগাঁও গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আফাজ উদ্দিন ও মা মরহুম খোদেজা বেগম। বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা খ্যাতনামা এই শিল্পী ছিলেন প্রচার বিমুখ। ১৯৬১ সালে ঢাকা আর্ট কলেজ থেকে ফাইন আর্টে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন তিনি। মুন্সীগঞ্জের প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত্ব আর্শেদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, শিল্পী আব্দুল হাই ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার কণ্ঠশিল্পী, নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা ও প্রখ্যাত তুলি শিল্পী। অভিনয় করে মুন্সীগঞ্জের মঞ্চ মাতিয়েছেন তিনি। ভাল তবলা বাজাতেন। দোতারায় গান গেয়ে তিনি মন জয় করেছেন লাখো দর্শকের। তাঁর রচিত গান রয়েছে অসংখ্য। বাংলাদেশ বেতারে এখনও অনেক প্রচারিত হয়। তবে তাঁর সবগুলো গান সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন তাঁর অমূল্য চিত্রকর্মগুলো ধরে রাখা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর গান “স্বর্গ থেকে দেখতে এলাম মোরা শহীদ সেনা দল... তোমরা যারা ভাইরা আমার আজও আছো বেঁচে। শোষণবিহীন সমাজ গড়...” আজও আলোড়িত করে। শিল্পী আব্দুল হাইয়ের “তোমার বিয়ের নিমন্ত্রণে এসেছি... মনে অনেক দ্বন্দ্ব নিয়ে তবু হেসেছি...” এমন অনেক প্রেম, বিরহ ও ভালবাসার গান হৃদয়কে নাড়া দেয়। আন্তর্জাতিক সেবা সংগঠন এ্যাপেক্সের সঙ্গীতটিও তাঁরই রচিত। এই শিল্পীর অবদান অনেক। শিল্পী কৌতুক অভিনেতা টেলি সামাদ ছবি আঁকা শুরু করেন বড় ভাই শিল্পী আব্দুল হাইয়ের অনুপ্রেরণায়। পরবর্তীতে আব্দুস সামাদ (টেলি সামাদ) চারুকলা ইনস্টিটিউটে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। টেলি সামাদ ছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদীনের ছাত্র। এছাড়াও টেলি সামাদ তখন শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, শিল্পী বাছেদ ও শিল্পী খাজার দীক্ষা নেন। টেলি সামাদ জানান, তাঁর নিজের আঁকা ছবির পরিমাণই প্রায় পাঁচ হাজার। টেলি সামাদ এখনও অবসরে ছবি আঁকেন। প্রয়াত ভাই শিল্প আব্দুল হাইয়ের কথা স্মরণ করতেই তাঁর ছবি আঁকা। গেল বছর আমেরিকায় ছেলের কাছে বেড়াতে গিয়েও প্রায় ৪০টি ছবি আঁকেন টেলি সামাদ। কিন্তু টেলি সামাদ যে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তা এতকাল প্রচারিত হয়নি কেন? এ প্রশ্নের জবাবে টেলি সামাদ বলেন, আমার বড়ভাই (প্রয়াত আবদুল হাই) যে এত বড় চিত্রশিল্পী একই ঘরে থেকে তার ধারে কাছেও আমি যেতে পারিনি। অভিনেতা পরিচয়ের বাইরে এই পরিচয়টা তেমন করে বলার সুযোগও হয়নি। তিনি বলেন, “আমার ভাই বলে কথা নয়, শিল্পী আব্দুল হাই ছিলেন ক্ষণজন্মা একজন মানুষ। তিনি দেশ ও জাতির জন্য অনেক অবদান রেখে গেছেন। তাঁর উৎসাহেই আমার ছবি আঁকা শুরু। এই গুণী শিল্পীর স্মরণে রাষ্ট্রের কিছু করা প্রয়োজন।”

১৯৭৮, ১৯৮৭, ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালে মুন্সীগঞ্জের সরকারী হরগঙ্গা কলেজে, মুন্সীগঞ্জের পুরনো মুক্তার লাইব্রেরিতে, মুন্সীগঞ্জ এভিজেএম সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে একক চিত্র প্রদর্শনীর সঙ্গে ছিলেন শিল্পীর ঘনিষ্ঠজন অভিজিত দাস ববি। ববি বলেন, সর্বশেষ ২০১২ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্য সচিব মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বলের প্রচেষ্টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে প্রয়াত এই শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। শিল্পীর পরিবারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে শিল্পীর ছবিগুলো সংগ্রহ করে এই প্রদর্শনী করা হয়। সেখানে অন্তত শিল্পীর ২৫-৩০টি ছবি স্থান পায়।

ঘনিষ্ঠ জনদের মতে, আব্দুল হাইয়ের আঁকা ছবির সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। ক্যানভাসে আঁকা তৈলচিত্রের সংখ্যাই বেশি। এছাড়াও তিনি জলরংয়ে অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। তাঁর অসংখ্য একক ও গ্রুপ চিত্র প্রদর্শনী হয় দেশে বিদেশে। তাঁর চিত্রকর্মে গোটা বাংলার রূপ ভেসে আসতো। তাই বিশিষ্ট কলামিস্ট, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত এই শিল্পীকে ‘পল্লী চিত্রশিল্পী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর তৈলচিত্র কর্মের মূলবিষয় ছিল প্রকৃতি ও মানুষ। শিল্পী থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে থাই রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে উঠেছিল। তাঁর চিত্রকর্ম দেখে রাজপরিবারের সদস্যরা অভিভূত হন। তিনি থাই ও জাপানী ভাষায়ও অসংখ্য গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর বহু দেশে তাঁর চিত্রকর্ম জাদুঘরসহ বিভিন্নস্থানে সংরক্ষিত রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর তাঁর অঙ্কিত চিত্রকর্মগুলো ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এছাড়াও আবহমান বাংলার ষড়ঋতুর ওপর অঙ্কিত চিত্রকর্মগুলো দেশের মানুষকে উদ্বেলিত করেছে। তিনি অসংখ্য সমাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশে বিদেশে চিত্রকর্মের জন্যে বিভিন্ন সময়ে পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবর্ধিত হয়েছেন এই গুণী শিল্পী। দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক এই শিল্পী মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ১৯৯৪ সালের ৮ সেপ্টম্বর সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। পূর্ব নয়াগাঁও গ্রামে নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার সঙ্গে এই গুণী শিল্পী চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছেন। কিন্তু তিনি অমর। তাঁর সৃষ্টিশীলতা আর শিল্পকর্ম আজও বাঙালীর হৃদয়ে দোলা দেয়।