১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাক-আফগান স্টাইলে মসজিদ মন্দিরে হামলা জঙ্গী গোষ্ঠীর

  • স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মদদ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ হামলার ধরন পাল্টাচ্ছে জঙ্গীরা। ব্যক্তির চেয়ে হামলার টার্গেট হিসেবে মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে তারা। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর মসজিদের পর শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারার একটি মসজিদে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে। তবে বাগমারার মসজিদেই সর্বপ্রথম আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছে। আত্মঘাতী দুই হামলাকারীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পলাতক অপরজনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এমন হামলার সঙ্গে বৃহস্পতিবার মিরপুর জেএমবির গ্রেনেড তৈরির কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড ও বিস্ফোরকসহ গ্রেফতারকৃত তিন জেএমবি সদস্যের কোন যোগসূত্র আছে কিনা সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ‘সহজ টার্গেট, কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার ও প্রভাব অনেক বেশি।’ নতুন এই সূত্র অনুযায়ী হামলা চালাচ্ছে জঙ্গীরা। তারই ধারাবাহিকতায় ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যার পর এখন মসজিদ, মন্দিরসহ নানা ধর্মীয় উপাসনালয়ের ওপর হামলা চালাচ্ছে তারা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের আদলে এমন হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলার সঙ্গে বিভিন্নভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশী জঙ্গীরা জড়িত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটার প্রচার চালাতেই এমন কৌশল বেছে নিয়েছে জঙ্গীরা। আর তাতে মদদ যোগাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী ইসলামী দলটির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কতিপয় গোষ্ঠী। সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত জঙ্গীদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্যই বেরিয়ে এসেছে।

চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহআলী থানাধীন মিরপুর-১ নম্বরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এ ব্লকের ৯ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর বাড়িতে জেএমবির গ্রেনেড তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হয়। সেখান থেকে উদ্ধার হয় শক্তিশালী ১৬টি হ্যান্ডগ্রেনেড ও ১টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ গ্রেনেড, সুইসাইডাল ভেস্ট (আত্মঘাতী হামলা চালানোর জন্য শরীরের সঙ্গে গ্রেনেড বেঁধে রাখার বিশেষ বেল্ট) ও ২শ’ হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক। গ্রেফতার হয় ইলিয়াস, ওমর ফারুক ও মহসীন নামে জেএমবির তিন সদস্য। তাদের ৬ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশ। এ ঘটনায় ৭ জেএমবি সদস্যকে আসামি করে শাহআলী থানায় মামলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মিরপুরে জেএমবির গ্রেনেড তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হওয়ার পরদিনই রাজশাহীর বাগমারা এলাকার একটি মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। হামলায় অংশ নেয়া আত্মঘাতী এক জঙ্গীর মৃত্যু হয়। অপরজন পালিয়ে যায়। জেএমবির কোন কারখানা বা গুরুত্বপূর্ণ কেউ গ্রেফতার হলে জেএমবি সাধারণত কোথাও না কোথাও নাশকতা চালিয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। এটি জেএমবির সাংগঠনিক কৌশল। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই মিরপুরে জেএমবির ৩ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গ্রেফতারের পর রাজশাহীর বাগমারায় মসজিদে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।

মসজিদে হামলার ধরন বলছে, আত্মঘাতী হামলাকারী নিজে অথবা কারও মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। নিহত জঙ্গী পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের কোন জঙ্গী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আবার দেশ দুইটিতে জঙ্গী প্রশিক্ষণে থাকা কোন প্রশিক্ষিত জঙ্গী বা জঙ্গী গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকতে পারেন। তবে আত্মঘাতী হামলার সঙ্গে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে জঙ্গী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা জঙ্গী প্রশিক্ষণে থাকা কোন জঙ্গী বা কোন জঙ্গী গোষ্ঠীর যে যোগসূত্র আছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এর আগে চলতি বছরের ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঈশা খাঁ ঘাঁটির সুরক্ষিত মসজিদে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে অন্তত ছয়জন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি বোমা উদ্ধার হয়। তাৎক্ষণিকভাবে রমজান আলী এবং পরে আব্দুল মান্নান নামে আরেকজন গ্রেফতার হয়। তারা নৌবাহিনীর ব্যাটম্যান বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে বাহিনীটির স্থায়ী সদস্য নন।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ব্লগার, লেখক, প্রকাশক হত্যার পর দেশে জঙ্গীবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটাতে মসজিদ মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়কে বেছে নিয়েছে জঙ্গীরা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো তুলনামূলক সহজ। আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালালে সারা দুনিয়ায় ব্যাপক প্রচার হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কায়দায় একের পর এক মসজিদ, মন্দিরে হামলা চালানো হচ্ছে। পাবনায় খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের লুক সরকার নামের এক ফাদারকে হত্যাচেষ্টা এবং অন্য ফাদারদের হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে। যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব কর্মকা-ের সঙ্গে দেশী-বিদেশী চক্র মদদ যোগাচ্ছে। বাংলাদেশে ভয়াবহ জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটার বিষয়ে অপপ্রচার চালাতেই এমন অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।

তদন্তকারী সূত্রগুলো বলছে, যেসব জেলায় যুদ্ধাপরাধীদের গঠিত ইসলামী দলটির প্রভাব বেশি, সেসব জেলায় ইদানিং জেএমবির হামলা চালানোর বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি ইতোপূর্বে যেসব জেলায় জেএমবির তৎপরতা ছিল, সেসব জেলায়ই নতুন করে জেএমবির তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যেই দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলায় জেএমবির সাংগঠনিক বিস্তার ঘটেছে। আর এসব জেলাতেই একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব নাশকতার সঙ্গে জেএমবির জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট।

এদিকে শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, বিদেশী খুন, যাজকদের হুমকি এবং আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর সম্প্রতি হামলার ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তুলনায় নিরাপদ। রাজশাহীর বাগমারার মসজিদে হামলা আত্মঘাতী কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে জঙ্গীদের মদদ দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আগে জেএমবি মিছিল করলে তাদের পেছনে পুলিশ থাকত। তখন বলা হতো, জেএমবি বলে কিছু নেই। বর্তমান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনায় অপরাধীদের চিহ্নিত করে তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এসব হামলার পেছনে দেশী ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত কাজ করছে।

নির্বাচিত সংবাদ