১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাফল্যের অর্থনীতির এক বছর

  • খায়রুল আলম

শেষ হয়ে যাচ্ছে আরও একটি বছর। ব্যক্তি এবং জাতীয় জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই চলছে এর হিসাব-নিকাশ। তেমনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অর্থনীতিটা ২০১৫ সালে কেমন গতিশীল ছিল সেটাও জানা জরুরী। দেশের অর্থনীতির জন্য ২০১৫ সাল ছিল সাফল্যের। আর এই অর্থবছরের সবচেয়ে বড় অর্জন পদ্মা সেতু। এমনকি চলতি বছরে বাংলাদেশ অর্জন করেছে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি। দেশের প্রথম জাতীয় বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার। চার দশক পরে সে বাজেট এখন ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার। ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার অর্থনীতি নিয়ে ১৯৭১ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার বেশি। অর্থনীতির এ বিস্তার শুধু আকারে নয়, ধারাবাহিকভাবে ৬-এর বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। এক সময়কার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩৩তম। নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে যাওয়া বাংলাদেশ অর্থনীতি ও আর্থ-সামাজিক বেশিরভাগ সূচকেই ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। বাংলাদেশের অর্থনীতির এ অগ্রযাত্রায় বিস্মিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফসহ বিশ্বের তাবত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষকরা। আইএমএফের মতে, প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে একইসঙ্গে উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রীতিমতো বিস্ময়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও টানা ছয় বছর বাংলাদেশের ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ‘অসাধারণ’ বলেছেন। এসব কারণেই তো অর্থনীতিবিদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স বলেছে, নেক্সট ইলেভেনের প্রথমে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০৫০ সালে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে মোট আমদানি ব্যয়ের সম্পূর্ণ মেটানো হচ্ছে অভ্যন্তরীণ আয়ে। কমেছে দারিদ্র্যের হার। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশের বেকারত্বের হারও কমেছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার বা ১ লাখ টাকার বেশি। বাংলাদেশ ১৯৯০-এর পর সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। দারিদ্র্যের হার অর্ধেক কমে গেছে। মেয়েদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে, জনসংখ্যা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার বৃদ্ধি, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণের হার বৃদ্ধি ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের সাফল্য যে বেশি, অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ভারতের বাঙালী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তা বার বার লিখেছেন।

সর্বশেষ টানা গত ছয় বছর ৬ শতাংশের ওপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখে বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত সেখানে পৃথিবীর মাত্র চারটি দেশ এ সাফল্য পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইনডিকেটস ডাটাবেইস এবং আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে ৫৮তম অবস্থানে ছিল। ২০১৫ সালে ২০৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার জিডিপি অর্জনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির আঙ্গিনায় ১৪ ধাপ ওপরে উঠে ৪৪তম স্থানে অবস্থান করছে। ভিয়েতনাম, তাজিকিস্তান, পর্তুগাল, কাতার, নিউজিল্যান্ড ও পেরুকে পেছনে ফেলে ওপরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে (জিডিপি বেজড অন পিপিপি) বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৩৩তম। ২০১৩ সালে ছিল ৩৬তম। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স বা পিডব্লিউসি ২০০৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির বেশকিছু বিষয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস দিয়েছিল। তখন ‘পরবর্তী ১১’ শিরোনামে একটি দলের কথা জানিয়েছিলেন অর্থনীতিবিদ ও’নিল। সে দলটির প্রথম দেশটির নাম ছিল বাংলাদেশ। এ দলভুক্ত অন্য দেশগুলো হচ্ছেÑ মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো, নাইজিরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা বিভাগের তৈরি করা ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অনেক চ্যালেঞ্জ থাকার পরও দেশটির সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসির তৈরি করা ‘বাংলাদেশ গেটিং বেক টু বিজনেস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলা হয়- রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি চাঙ্গা। এইচএসবিসির মতে, পাঁচটি অনুঘটক বাংলাদেশের ইতিবাচক ইকুইটি মার্কেটের গতিপ্রবাহে ভূমিকা রাখছে। সেগুলো হচ্ছে- সামষ্টিক অর্থনীতি, পোশাক রফতানি, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজার। পোশাক খাত ও রেমিটেন্সকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় দুটি স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

২০৫০ সালে কেমন হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি? বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর কত কাছে থাকবে বাংলাদেশ? কতটা এগোবে বাংলাদেশ? এ নিয়ে বৈশ্বিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এতে বলা হচ্ছে, ২০৫০ সালে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ।

একটি দেশের অর্থনীতি কতটা বড় ও শক্তিশালী, সেটি নির্ধারণে সর্বস্বীকৃত দুটি উপায় আছে। একটি হলোÑ ক্রয়ক্ষমতার সক্ষমতার (পিপিপি) ভিত্তিতে জিডিপির আকার, অন্যটি হলোÑ বাজার বিনিময় হারের (এমইআর) ভিত্তিতে জিডিপির আকার। দুই হিসাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নতি উঠে এসেছে গবেষণাটিতে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে আবারও নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ২৭ বিলিয়ন (২ হাজার ৭০০ কোটি) মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান রিজার্ভ সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। রিজার্ভের দিক দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। যা পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। রফতানি আয় বৃদ্ধি ও রেমিটেন্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা, বিদেশ থেকে কর্পোরেট ঋণ গ্রহণ এবং কাক্সিক্ষত হারে আমদানি ব্যয় না হওয়া রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে বিদায়ী বছরের মধ্য দিয়ে পরপর তিন অর্থবছরে (২০১১-১৪) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে এনবিআর। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। পরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা কমিয়ে করা হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এ অর্থবছর সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। যা অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৬৯৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব আদায় প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।

অস্থিতিশীলতার মধ্যদিয়ে ২০১৫ সাল শুরু হলেও বছরের শেষে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পোশাক শিল্প। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের হরতাল-অবরোধের বিভীষিকায় বহির্বিশ্বে ইমেজ সঙ্কটে পড়েছিল। তবে বছরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে শেষভাগে এসে তার অনেকটাই কাটিয়ে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী ও বৈদেশিক মুদ্রা আহরণকারী এ শিল্প খাতটি। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিট পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। আয় হয়েছে ১২ হাজার ৪২৬ মিলিয়ন ডলার।

২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষে ওভেন পোশাকে রফতানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ শতাংশ। একইসঙ্গে হোম টেক্সটাইলের রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ওভেন পোশাকে রফতানি হয়েছে ১৩ হাজার ৬৪ মিলিয়ন ডলার ও হোম টেক্সটাইলে রফতানি হয়েছে ৮০৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য। এসবের ফলে ২০১৫ সালে রফতানিতে পোশাক শিল্প খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাংলাদেশ পণ্য রফতানি করে এক হাজার ২৮৮ কোটি ডলার আয় করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি। আর এ বছর নবেম্বরে গত বছরের একই মাসের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-নবেম্বর সময়ে এক হাজার ২৮৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাংলাদেশ এক হাজার ২৮৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে।

জানা যায়, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের মধ্যে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে অথবা এটি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, সে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১তম।

বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে পৃথিবীতে চতুর্থ। হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনে বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। শুধু ধান নয়, গম ও ভুট্টা উৎপাদনেও বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। বিশ্বে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হারের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম। বাংলাদেশ আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। মাছ চাষে বাংলাদেশ এখন শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, ১০ বছর ধরে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৫-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মিষ্টি পানিতে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম এবং চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ। সব মিলিয়ে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরি প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।

এদিকে বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট তার সাম্প্রতিক সংখ্যায় বলেছে, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য রহস্যের মতো। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় কম বরাদ্দ, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ব্যাপক দারিদ্র্য সত্ত্বেও গত চার দশকে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন ব্যতিক্রমি।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদন ২০১৫’ অনুসারে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম। এ ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের থেকেও বাংলাদেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে। ১৪৫টি দেশের নারীর উন্নয়নচিত্র নিয়ে তৈরি করা তালিকায় ক্রমেই উন্নতি করতে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৬৪ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় শুধু সবার ওপরে নয়, বাংলাদেশ অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। জাপানের মতো দেশও এখন বাংলাদেশের পেছনে।

জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার, ছাত্রছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার দ্রুত কমে যাওয়াসহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। ইউনেস্কো বলছে, দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষাদানের সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বে বাংলাদেশকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে তৈরি পোশাক (গার্মেন্ট) শিল্প। পৃথিবীতে এখন এমন কোন দেশ নেই যেখানে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা পোশাক পাওয়া যায় না। গার্মেন্ট রফতানিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এখন যেখানে পোশাক খাত থেকে বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, সেখানে লক্ষ্য নেয়া হয়েছে এ খাতে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের। পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওষুধ এখন ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার ৮০টি দেশে রফতানি হচ্ছে। দেশীয় ওষুধশিল্প কারখানাগুলো দেশের মোট চাহিদার শতকরা ৯৭ ভাগ ওষুধ যোগান দিচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশের ৯০ লাখের বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। এ জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশে পরিণত করেছে।

জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশকে করেছে রোল মডেল। ২০০০ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদী এমডিজির আটটি সূচকের মধ্যে সাতটিতেই বাংলাদেশের সাফল্য এসেছে। বাকিটি পূরণের খুব কাছাকাছি অবস্থায় আছে দেশ। চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল সূচকে নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এ সময় সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো সূচকে এসেছে বিস্ময়কর সাফল্য। এরই স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন সাউথ সাউথ পুরস্কার ও ইউএনএমডিজি পুরস্কার। এ ছাড়া মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এইচআইভি এইডস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগব্যাধি দমনেও চোখে পড়ার মতো উন্নতি হয়েছে টানা এক দশক ধরে ৬ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা বাংলাদেশে। বাংলাদেশের এখন পরবর্তী টার্গেট সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল ( এসডিজি )। আর এটি অর্জনে ইতোমধ্যেই সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এদিকে বর্তমান সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

দেশের মানুষের হাড়ভাঙ্গা শ্রম আর বর্তমান রাষ্ট্রনায়কের অসীম দূরদর্শিতায় আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে অর্থনীতি। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতি দিয়েই বাংলাদেশ এখন নিজের শক্তিতে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণকাজে হাত দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।