২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে ॥ খালেদা জিয়া

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, মানুষ ধানের শীষে ভোট দেয়ার জন্য বসে আছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি ৮০ ভাগ পৌরসভায় বিজয়ী হবে। রবিবার দুপুরে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

খালেদা জিয়া বলেন, পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ সম্প্রতি একটি মনগড়া জরিপ প্রকাশ করেছে। দুর্নীতি হালাল করতে সরকার এসব জরিপের মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। যতই জরিপ হোক, এসব মিথ্যা জরিপ দিয়ে কিছু হবে না। সত্যিকারের জরিপ আমি জানি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। আর হেরে যাবে নিশ্চিত জেনেই আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার ভোট কেন্দ্রে যেতে না দিলেও আপনারা ভোট কেন্দ্রে যাবেন এবং নির্বাচনের সঠিক চিত্র তুলে ধরবেন।

পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র করছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। এর আগেও শেখ হাসিনা আর রকিব মার্কা নির্বাচন জনগণ গ্রহণ করেনি। এবারের নির্বাচনেও প্রমাণ হবে আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের বড় দালাল বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, এভাবে বেশিদিন নয়। নিশ্চয় আমাদের সুদিন আসবে।

বর্তমান সরকারের আমলে আগেও নির্বাচন কেন্দ্র দখল ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, এখন আর ভোট দিতে ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে হয় না। সরকার এমন পদ্ধতি চালু করেছে যে, ভোটাররা কেন্দ্র যাওয়ার আগেই বাক্স ভরে যায়। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য পৌর নির্বাচনে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, সত্যিকার অর্থে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ৮০ ভাগ ভোট পেয়ে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হবে।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, এ সরকার জাতীয় প্রেসক্লাবের মতো ৬০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন দখল করেছে। এর প্রতিবাদ করায় ২২ মামলা দিয়ে প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদকে জেলে বন্দী করা হয়েছে। একুশে টিভির চেয়ারম্যান আব্দুস সালামকে বন্দী রেখে কৌশলে চ্যানেলটি দখল করে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আইসিটি অ্যাক্ট, সম্প্রচার নীতিমালা এসব কালাকানুন করে গণমাধ্যম বন্ধের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ইইউ পার্লামেন্টে এসব কালাকানুন বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার সমর্থক সাংবাদিকদের সঙ্গে বিএনপিমনা কিছু সাংবাদিক জোট করে প্রেসক্লাব, বিএফইউজে ও ডিইউজে দলীয়করণ করেছে। বিএনপিপন্থী এ বিভাজন সৃষ্টিকারী সাংবাদিকদের বেঈমান, দালাল ও মীর জাফর আখ্যা দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, এই বেঈমান, দালাল ও মীর জাফরদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের পরিণতি কখনও ভাল হবে না। এরা বেশিদিন টিকবে না। আমি কখনও বেঈমানদের সঙ্গে হাত মিলাইনি, ভবিষ্যতেও মিলাবো না।

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি অংশ নিয়েছে বলেই পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তাইতো আজকে তাদের ভয়। বিএনপি যাতে নির্বাচনে না থাকতে না পারে তার জন্য যত কৌশল আছে প্রয়োগ করেছে। ভোট কেন্দ্রে যাতে কারচুপি ও জাল ভোট দিতে পারে সেজন্য কেন্দ্রে সাংবাদিকদের যেতে না দেয়ার চক্রান্ত করছে সরকার। সারাদেশে চলছে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের দখল উৎসব। ভোটের অধিকারও তারা দখল করেছে। এভাবে বর্তমান সরকার তৃতীয়বারের মতো ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আওয়ামী মার্কা নির্বাচনের মুখোশ আপনারা আগেই খুলে দিয়েছেন। আপনারা যারা ভোট কেন্দ্রের ভেতরে যাবেন তাদের কাছে আমার আহ্বান থাকবে সবকিছু তুলে ধরবেন। তারা যে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে না সেটা প্রমাণ করে দিবেন আপনারা।

পৌর নির্বাচনে প্রশাসন ও পুলিশকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে দেশের জন্য কাজ করার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আপনাদের সঙ্গে বিএনপির কোন বিরোধ নেই। আপনারা দেশের জন্য কাজ করছেন, আগামীতেও করবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ অপপ্রচার চালাচ্ছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাদের চাকরি চলে যাবে। কিন্তু আপনাদের কারও চাকরি যাবে না। পৌর এলাকার ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি সকল ভোটারকে বলবো ভোট কেন্দ্রে যেতে এবং নিজের ভোট প্রয়োগ করতে।

খালেদা জিয়া বলেন, দেশে সুশাসন, মৌলিক অধিকার, মানুষের বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা আজ ভুলুণ্ঠিত। সমাজের কোথাও ন্যায়বিচার নেই। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। দেশে গুম, খুন, হামলা, মামলা কায়েম করা হয়েছে। হামলা মামলা দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বাড়ি-ঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট থেকে ভোটের অধিকার পর্যন্ত দখল করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বিএনপি কার্যালয় দখলের অপচেষ্টা করছে। দেশে এখন আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা দখলের মহোৎসব চালাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ ও অনলাইন নীতিমালা কিছুদিন বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার শুধু গণতন্ত্রকে হত্যা করেই থেমে থাকেনি, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকও বন্ধ করে দিয়েছিল। নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে টিভি টকশোর ক্ষেত্রেও। এমনকি অনলাইন নীতিমালার নামে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। সমালোচনা করলেই সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছে সরকার। সরকারের অপকর্ম তুলে ধরায় বেশ কয়েকটি টিভি ও পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ঢাকার বাইরের শত শত পত্রিকা। ফলে হাজার হাজার সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ঘরে-বাইরে কিংবা কর্মক্ষেত্রে কোথাও আজ সাংবাদিক-পেশাজীবীরা নিরাপদ নয়। এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সাগর-রুনিসহ ২৪ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি। এ সময় তিনি গণমাধ্যম সংস্কারের নামে কালো আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান। এ ছাড়া তিনি সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ, আব্দুস সালাম ও মাহমুদুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, পৌর নির্বাচন নিয়ে সরকার কৌশলে ভুল করেছে। তারা ভেবেছিল বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনমুখী দল তাই এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রমনা। ভোট আসলে তারা উৎসব করে। বিএনপি অংশ নেয়ায় এ নির্বাচন নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ ধানের শীষে ভোট দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, এ সরকারের আমলে গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা তাদের বলয়ের বাইরে কাউকে রাখতে চায় না। এই শাসন হিটলারী ফ্যাসিবাদী শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতাসীনরা তাদের বলয়ের বাইরে কোন রাজনৈতিক শক্তি বা ভিন্নমতের অস্তিত্ব রাখতে চায় না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ছয় বার কারাগারে নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৮৬টি মামলা দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনা হিটলারের ফ্যাসিবাদী শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমানে এক নিকৃষ্ট স্বৈরশাসক জগদ্দল পাথরের মতো বাংলাদেশের মানুষের ঘাড়ে চেপে বসেছে। সমাজের কোথাও ন্যায়বিচার নেই। স্বাধীনতার চেতনা যে স্বাধীন গণমাধ্যমের মধ্যে নিহিত সেই গণমাধ্যমকে এ সরকার গলাটিপে হত্যা করেছে। সরকারবিরোধী অনলাইন বন্ধ করে দেয়ার জন্যই অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের গণমাধ্যমের ওপর দুর্যোগ নেমে এসেছে। এ সরকার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা নারীর অধিকার ও সকল ধর্মের সমান অধিকারে বিশ্বাসী।

বিএফইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে কাউন্সিলে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী, এম এ আজিজ, মোস্তফা কামাল মজুমদার, সৈয়দ আবদাল আহমেদ, আব্দুল হাই শিকদার, জাহাঙ্গীর আলম প্রধান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ভাইস-চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, আব্দুল মান্নান, এজে মোহাম্মদ আলী, যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম, সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ, কারাবন্দী সাংবাদিক শওকত মাহমুদের স্ত্রী ফেরদৌসি মাহমুদ, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, মহিলা দল সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা প্রমুখ।

অনলাইনে খালেদার ভিডিও বার্তা ॥ পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ভিডিও বার্তা অনলাইনে দেয়া হয়েছে। ২৬ সেকেন্ডের এই ভিডিও বার্তায় খালেদা জিয়া ভোটারদের কাছে ধানের শীষে ভোট চেয়েছেন। ভিডিও বার্তায় তার বক্তব্য হচ্ছে, ‘প্রিয় পৌরবাসী ভাই ও বোনেরা, দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকলে ভোট কেন্দ্রে যাবেন, আপনার ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য; শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য বিএনপির মনোনীত প্রার্থীকে ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করুন।’ জানা যায় খালেদা জিয়ার নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলা হচ্ছে। সেখানেও এই ভিডিও বার্তাসহ নির্বাচনী প্রচার চালানো হচ্ছে।