১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে স্নাইপার রাইফেল উদ্ধার, জঙ্গী আটক

চট্টগ্রামে স্নাইপার রাইফেল  উদ্ধার, জঙ্গী আটক

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ ঢাকার পর এবার চট্টগ্রামে জেএমবির আস্তানায় হানা দিয়েছে পুলিশ। জঙ্গী আস্তানা থেকে উদ্ধার হয়েছে স্নাইপার রাইফেল, সেনা পোশাকসহ বিপুলসংখ্যক গুলি ও বিস্ফোরক। আটক করা হয়েছে নাহিম, রাসেল ও ফরসাল নামে তিন যুবককে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জঙ্গীপনায় জড়াচ্ছে। শনিবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের স্নাতকোত্তর বিভাগের ৩ শিক্ষার্থীকে গ্রেফতারের পর জেএমবির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত থাকার চমকপ্রদ তথ্য উদ্ধার করেছে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ। জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তারা আমেরিকার একটি বিশেষ বাহিনীর অস্ত্র এমকে-১১ কালেকশন করেছে। এ অস্ত্র দিয়ে প্রায় এক মাইল দূরে থাকা শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। তারা এর প্রশিক্ষণও নিয়েছে। শুধু এ অস্ত্রই নয়, তাদের কমান্ডার ফারদিনের কাছে আরও অত্যাধুনিক ছোট অস্ত্র রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। চবির শিবিরকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরাই নাশকতার উদ্দেশে জেএমবিতে যোগ দিচ্ছে বলে গ্রেফতারকৃতরা তথ্য দিয়েছে। রবিবার সকালে সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল ম-ল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটত।

জিজ্ঞাসাবাদে জেএমবির বিভিন্ন দিক নির্দেশনা ও সংগঠিত হওয়ার কৌশল এবং অচিরেই আঘাত করার মতো নীলনক্সাও তৈরি করেছে তারা। চবির বিজ্ঞান বিভাগের এসব শিক্ষার্থী বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে গ্রেনেড থেকে শুরু করে বিধ্বংসী ও শক্তিশালী বোমা তৈরির কাজ চালিয়ে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। অবশেষে হাটহাজারী থানাধীন আমানবাজার এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ব্যবসায়ী পরিচয়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে ঠাঁই নিয়েছিল জেএমবির এসব সদস্য। রবিবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গোয়েন্দা বিভাগের চৌকস টিম এডিসি বাবুল আকতারের নেতৃত্বে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছিল।

ইন্টার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, এমকে-১১ নামের আগ্নেয়াস্ত্রটি আমেরিকায় তৈরি। আমেরিকার একটি বাহিনী এ অস্ত্রের ব্যবহার করছে। তবে একই ধাঁচের হলেও উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি একটু পুরনো মডেলের। তবে এর শক্তি অনেক বেশি। কমপক্ষে ১৫শ’ গজ দূর পর্যন্ত এটির গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।

পুলিশের ধারণা, একে-২২ এবং একে-৪৭সহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র এ পর্যন্ত পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে এমনকি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে। তবে এ অস্ত্র এ পর্যন্ত কেউ উদ্ধার করেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে ছোট বড় বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার হলেও এ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র আগে কখনও চোখে পড়েনি অভিযানে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের। তবে পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পেয়েছে কয়েক মাস আগে গ্রেফতারকৃত জিএমবির এসব সদস্য বান্দরবানে গিয়েছিল এ অস্ত্রটি কালেকশনের জন্য।

সম্ভবত, মিয়ানমার থেকে পার্বত্য অঞ্চল হয়ে এ অস্ত্র দেশে প্রবেশ করেছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ওসব অভিযানেও এ অস্ত্রের সন্ধান মেলেনি। নিখুঁত নিশানার এ অস্ত্র নিয়ে রয়েছে সংশয়। কারণ, পুলিশ এ অস্ত্র নিয়ে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের যেমন চেষ্টা চালাচ্ছে, তেমনি অস্ত্রের যোগান ও হস্তান্তরের সঙ্গে কাদের যোগসাজশ রয়েছে তা নিয়েও চলছে গবেষণা।

মহানগর গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানাধীন খোয়াজনগর এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ গুলি, অস্ত্র, গ্রেনেড ও বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। জেএমবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক বাহিনীর প্রধান জাবেদকে ওই ঘটনায় গ্রেফতারের পর ৬ অক্টোবর সকালে কুয়াইশ এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে গিয়েছিল গোয়েন্দা টিম। সেখানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তার দলের সদস্যরা তাকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত বোমা বিস্ফোরণে মারা যায় জাবেদ। তার সঙ্গীদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ধার করে পুলিশ। সে তথ্যের ভিত্তিতে জাবেদের পর জেএমবির চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সকল বাহিনীর প্রধান ফারদিনকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। ফারদিনের ছবি নিয়ে পুলিশ যেমন ঘুরছে, তেমনি ফারদিনও পুলিশকে বেকায়দায় ফেলতে চৌকস টিমের ছবি নিয়ে আক্রমণাত্মক অবস্থায় পরিভ্রমণ করছে বিভিন্ন স্থানে। এমন তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।

শনিবার গভীর রাতে জেএমবির সকল বাহিনীর প্রধান ফারদিনকে গ্রেফতারে নানা কৌশল অবলম্বনে অভিযান চালানো হয় হাটহাজারী থানাধীন আমানবাজার এলাকায়। সেখানকার জয়নব কলোনীর জনৈক ইসহাকের মালিকানাধীন একটি দ্বিতল ভবনে অভিযান পরিচালনা করেন সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এডিসি বাবুল আকতারের নেতৃত্বে এসআই সন্তোষ কুমার চাকমা, শরীফুল ইসলাম, আফতাব, রাজেশ বড়ুয়া, মিনহাজ ও এএসআই আজমীর শরীফসহ ২০ জনের একটি টিম। সুবিশাল প্রাচীরঘেরা এ ভবনের পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে বায়েজিদ থানা ও হাটহাজারী থানা থেকেও অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে আসা হয় গভীর রাতে। রাত এগারোটা থেকে অভিযানের প্রস্তুতি নেয় পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন বেশে। পৃথক পৃথকভাবে তথ্য কালেকশনের মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় অবস্থান নেয় গোয়েন্দা টিমটি। আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের কারণে এলাকার টি-স্টল থেকে শুরু করে অলিগলি এমনকি খালি মাঠগুলোতেও আলোচনার ঝড় চলছে নির্বাচনকেন্দ্রিক। এরই মাঝে পুলিশও মিশে গেছে সাধারণের মাঝে। তবে টার্গেট ছিল জেএমবির বর্তমান আঞ্চলিক প্রধান ফারদিনকে গ্রেফতারের।

এর আগে শনিবার বিকেলে কাজির দেউড়ি থেকে নাঈমুর রহমান প্রকাশ নয়নকে ও উত্তর নালাপাড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় ফয়সল মাহমুদকে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ফারদিনের শিষ্য হিসেবে খ্যাত শওকত রাসেলকে শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার করা হয় নগরীর কসমোপলিটন এলাকা থেকে। মূলত, রাসেল ফারদিনের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশকে একিভূত করেছে। কারণ, রাসেলের কাছেই ফারদিনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং বিস্ফোরক দ্রব্যের বিভিন্ন ধরনের তথ্য ছিল। এছাড়া ফারদিনের কাছ থেকেই রাসেল শিখেছিল কিভাবে বোমা তৈরি করতে হয়। এমনকি বোমা তৈরির সরঞ্জাম, জিহাদী বই ও সায়েন্টিফিক ধারণা অর্জন করেছিল রাসেল ফারদিনের কাছে থেকে।

রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ উদ্ধার করেছে ফারদিনের গতিবিধি, অবস্থান এবং বিভিন্ন কলাকৌশলের নীলনক্সা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান ও কমান্ডার ফারদিন গত কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে যায় কিন্তু একমাত্র রাসেলই ফারদিনের আবাসস্থলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্য সদস্যরা ফারদিনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। কারণ, জেএমবির এসব সদস্যরা কখনই নিজেদের আবাসস্থল সম্পর্কে অন্য সদস্যদের তথ্য প্রদান করত না। এমন তথ্য গোয়েন্দা পুলিশকে দিয়েছেন গ্রেফতারকৃত নাঈমুর ও ফয়সাল।

রাসেলের তথ্য অনুযায়ী গোয়েন্দা পুলিশের চৌকস দলটি ফারদিনকে গ্রেফতারে জনৈক ইসহাকের দ্বিতল ভবনে অবস্থান নেয় তখন সুউচ্চ প্রাচীর দেখে পুলিশের ধারণা আরও ঘনীভূত হয়। কারণ এর আগে চট্টগ্রামে জেএমবি যেসব সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সকলেই বেছে নিয়েছিল জনসমাগমহীন সড়ক ও বাড়ি। ফারদিনের ক্ষেত্রেও একই মন্তব্য কাজ করেছে। আমানবাজার এলাকার ওই দ্বিতীয় ভবনটি চিহ্নিত করার পর সিভিল পোশাকধারী পুলিশ সদস্যরা বাড়ির চারদিক ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে সুউচ্চপ্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে কয়েক পুলিশ সদস্য। বাড়ির প্রবেশদ্বারে কলাপসিবল গেটে তালা ঝুললেও কাটার দিয়ে তা কেটে ফেলা হয়েছে। ভবনের নিচতলা তালাবদ্ধ দেখে বাড়িওয়ালার দরজায় নক করে পুলিশ। ফারদিনের বিষয়ে তারা ফারদিন নামের কোন ভাড়াটিয়া নেই বলে জানান। পরে রাসেলের তথ্য অনুযায়ী নিচতলার তালাবদ্ধ কক্ষ কাটার দিয়ে কেটে প্রবেশ করে পুলিশ।

তিন কক্ষের এ ভবনের ড্রয়িং রুমে পড়েছিল কয়েকটি গুলি। গুলি দেখেই পুলিশের সন্দেহ হয়, যেখানে গুলি, সেখানে অস্ত্রও থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। পরে বাকি কক্ষগুলোও একইভাবে খুলে কয়েক ধরনের ব্যাগ থেকে উদ্ধার করা হয় অস্ত্র, গুলি, ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্য। উদ্ধার করা হয় এমকে-১১ নামের অটোমেটিক স্নাইপার রাইফেল। রাইফেলের দুটি ম্যাগাজিন, ২৫০ রাউন্ড গুলি, ৫ কেজি ওজনের বিস্ফোরক জেল, ১০ ডেটোনেটর, বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, জিহাদী বই, জেএমবি সংগঠনের কলাকৌশলের নানা কাগজপত্র সেনাবাহিনীর ১২ সেট পোশাক, একজোড়া র‌্যাংকস ব্যাজ, রফিক নামের একটি পুলক ও দুটি কম্পিউটার প্রিন্টার।

এ ব্যাপারে গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও জনসংযোগ কর্মকর্তা বাবুল আকতার জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, ফারদিনকে গ্রেফতারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে ফারদিনের বাসা থেকে যে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তা নিয়ে ইন্টারনেটেও খতিয়ে দেখা হয়েছে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে। এক্ষেত্রে প্রায় এক মাইলের মধ্যে এ অস্ত্রের নিখুঁত নিশানা নিশ্চিত থাকে বলে জানা গেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স পড়ুয়া ও গ্রেফতারকৃত ৩ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ফারদিনের নানা তথ্য মিলেছে।