১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদ্যুতে সহায়তা বাড়াচ্ছে বিশ্বব্যাংক

  • সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত কেন্দ্রে অতিরিক্ত অর্থায়নে চুক্তি সই

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ কমে গেছে সিস্টেম লস, তাই বিদ্যুত খাতে সহায়তা বাড়াচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এর আগে সিস্টেম লসের কারণেই বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন থাকলেও এ খাতে বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখায়নি সংস্থাটি। তবে এখন সিস্টেম লস সহনীয় পর্যায়ে আসায় আবারও ফিরে আসছে বিশ্বব্যাংক। এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ইফফাত শরীফ বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা পাঁচ বছর মেয়াদী যে কান্ট্রি পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম তৈরি করছি সেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বিদ্যুত খাতকে। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য নিরসনে বিদ্যুত খাত বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক বিদ্যুত উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরিতে আপাতত বিশ্বব্যাংক যাবে না। বিশ্বব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, এখন বিদ্যুত খাতে সিস্টেম লস সাড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ, যা অত্যন্ত সহনীয় এবং ভারতে যে পরিমাণ সিস্টেম লস হয় তার চেয়েও কম। এর চেয়ে নিচে সিস্টেম লস নিতে চাইলে বিদ্যুত বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। সেখানে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তবে এখন যেটি রয়েছে সেটি স্বাভাবিক সিস্টেম লস হিসেবেই ধরা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, শুরু থেকেই বিদ্যুত খাতে কোন বিনিয়োগ করেনি বিশ্বব্যাংক। এর প্রধান কারণ ছিল সিস্টেম লস। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে প্রথম সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরিতে ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে। তারপর তেমন কোন প্রকল্পে অর্থায়ন না থাকলেও ২০১৪ সালে এসে বিদ্যুত বিতরণ ও সঞ্চালন সংক্রান্ত একটি প্রকল্পে মোট ৮২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগে চুক্তি করে। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুতের সিস্টেম লস কমে আসায় এ খাতে সহায়তা সম্প্রসারণ করছে সংস্থাটি। এরই অংশ হিসেবে ২০০৮ সালে নেয়া সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত কেন্দ্র কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টে উন্নীত করতে নতুন করে প্রায় ১ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা (১৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার) দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্যে রবিবার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব কাজী সফিকুল আযম এবং বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর ইফফাত শরীফ। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে দুপুরে এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০০৮ সালে এ বিদ্যুত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হয়। সে সময় মোট ব্যয় ছিল ৪৭ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দিয়েছিল ৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। পরবর্তীতে গ্যাস স্বল্পতার কারণে এটিকে পিকিং পাওয়ার প্লান্টে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থায়ন হিসেবে বিশ্বব্যাংক এ অর্থ দিচ্ছে। ৬ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩৮ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। ২০১৬ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুত প্রকল্পের টিম লিডার মোহাম্মদ ইকবাল এর আগে বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের ২০১৩ সালের এন্টারপ্রাইজ জরিপ অনুসারে, দেশে বিদ্যুত বিভ্রাটের কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কম হচ্ছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুত ব্যবহারের কারণে ৬৫ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন অনুসারে বিদ্যুতের এ চাহিদা ২০৩০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হবে বলে জানান তিনি। এ অবস্থায় সিদ্ধিরগঞ্জে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা বাড়াচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এতে আরও বলা হয়, এ অর্থ দিয়ে বিদ্যুত কেন্দ্রটি নির্মাণ করার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুত খাতের তিন সংস্থা শক্তিশালী করার কাজও করা হবে। এগুলো হচ্ছেÑ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জিটিসিএল), বাংলাদেশ ইলেক্ট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি (ইজসিবি) ও বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি)।

অন্যদিকে ঘোড়াশাল চতুর্থ ইউনিটের বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে ২১ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিচ্ছে বিশ^ব্যাংক। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। শীঘ্রই সংস্থাটির বোর্ড সভায় ঋণটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে আরও ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, রি-পাওয়ারিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুত উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। কারণ রি-পাওয়ারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাসের ব্যবহার কমানো সম্ভব। পুরাতন বিদ্যুত কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং দূষণ কমানোও সম্ভব হয়। এজন্য ঘোড়াশালে দুটি ইউনিটের কাজ শুরু হচ্ছে। তৃতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে অর্থ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। আর চতুর্থ ইউনিট বাস্তবায়নের জন্য বিশ^ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ আলোচনা শেষ হয়েছে। বিদ্যুত বিভাগ সূত্র জানায়, ঘোড়াশাল চতুর্থ ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ^ব্যাংক ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেবে। অবশিষ্ট অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেয়া হবে। ২০১৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিশ^ব্যাংক সহজ শর্তে এ ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সংস্থাটির ঋণের বিপরীতে বার্ষিক শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। এ ঋণের অর্থ ছয় বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

ইআরডির অতিরিক্ত সচিব বিশ^ব্যাংক উইংয়ের প্রধান কাজী শফিকুল আযম জনকণ্ঠকে বলেন, ঋণের শর্তসহ যাবতীয় বিষয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। এখন পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদন দিলে ঋণচুক্তি হবে। সিদ্ধিরগঞ্জের বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়নের পর ঘোড়াশাল চতুর্থ ইউনিটের রি-পাওয়ারিংয়ে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে রাজি হয়েছে। তিনি বলেন, সংস্থাটি গত কয়েক বছর ধরে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বেশি বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বর্তমানে অবকাঠামো উন্নয়নেও অবদান রাখছে, যা বাংলাদেশের দিক থেকে বিবেচনায় ইতিবাচক।

সূত্র জানায়, ঘোড়াশাল চতুর্থ ইউনিট ১৯৮৯ সালে স্থাপিত হয়। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়ায় ২১০ মেগাওয়াটের ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত কেন্দ্রটিতে ১৮০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে না। এ বিদ্যুত কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে ৪০৩ মেগাওয়াট করা হবে। একই সঙ্গে রি-পাওয়ারিং করলে গ্যাস ব্যবহারের দক্ষতা ৫৪ শতাংশ বাড়বে। বিদ্যুত বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, রি-পাওয়ারিংয়ের ব্যয় নতুন বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। একই সঙ্গে রি-পাওয়ারিংয়ের সময় বিদ্যুত কেন্দ্রের উৎপাদন হতে থাকে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়, যা নতুন কম্বাইন্ড সাইকেল প্ল্যাট স্থাপন করার সময় সম্ভব নয়।