২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তিন দিনেও শনাক্ত হয়নি বাগমারার মসজিদে বোমা হামলাকারী

  • এলাকায় আতঙ্ক ॥ আইএসের দায় স্বীকার- পুলিশ বলছে ভুয়া

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী ॥ বাগমারা উপজেলার সৈয়দপুর চকপাড়া গ্রামে শুক্রবার জুমার নামাজে ঘটে যাওয়া আত্মঘাতী বোমা হামলার তিন দিনেও শনাক্ত হয়নি নিহত যুবকের পরিচয়। এখনও সেই গ্রামবাসীর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। নানাভাবে পুলিশ চেষ্টা অব্যাহত রেখে খোঁজখবর নিলেও ওই যুবকের পরিচয় রবিবারও শনাক্ত করা যায়নি। এরই মধ্যে বাগমারার মসজিদে বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। অনলাইনে ‘ট্র্যাক টেররিজম’ নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জানায়, আইএস তাদের বার্তায় জানিয়েছে আবুল ফিদা আল বাঙালী নামে একজন এ হামলা চালিয়েছে। এ নিয়েও পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করেছে। তবে আবুল ফিদা আল বাঙালী নামে এ অঞ্চলে কেউ আছে নাকি ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছেÑ এ নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আইএসের দায় স্বীকার স্রেফ ভুয়া বলে মনে করছে রাজশাহী পুলিশ।

রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার নিসারুল আরিফ বলেন, পুলিশ এখন নিহত যুবকের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করছে। তাছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া যুবকের সন্ধানও শুরু করেছে। তিনি বলেন, নিহত যুবকের কাছে কোন মোবাইল, ডিভাইস এমনি চিরকুট কিংবা মানিব্যাগও পাওয়া যায়নি। আর আইএসের দায় স্বীকার কতটা যুক্তিযুক্ত সেটাও খোঁজার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সুপার বলেন, ঘটনার অনেক আগে থেকেই পুলিশ সতর্ক ছিল। বিশেষ করে বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলার পর থেকেই পুলিশ এ্যালার্ট। তবে বিচ্ছিন্ন গ্রামে এমন ঘটনাও তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে উপজেলার সৈয়দপুর চকপাড়ায় এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে। জানা গেছে, বাগমারা উপজেলার প্রত্যন্ত সৈয়দপুর, শঙ্করপুর ও তেঘোর গ্রামের প্রায় ২৩টি পরিবার বিভিন্ন সময়ে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর তারা সৈয়দপুর গ্রামে আলাদা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন ২০০০ সালে। তখন থেকেই বিভিন্ন গ্রাম থেকেও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মুসল্লিরা ওই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। একটি মাঝারি আকারের ঘরের মতো ওপরে টিনের ছাউনি আর চারদিকে ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি করা মসজিদটিতেই কোরান শিক্ষাসহ ধর্ম প্রচারের কাজও করা হয়। মসজিটির বাঁ পাশে পুরুষ এবং ডানপাশে পর্দার আড়ালে নারীরা নামাজ আদায় করেন। মসজিদে আত্মঘাতী হামলা হতে পারে এমন কখনও মনে করেননি ওই এলাকার বাসিন্দারা।

সোহার্দ্য-সম্প্রীতির এমন অজোপাড়াগাঁয়ে আত্মঘাতী ওই বোমা হামলার ঘটনাটি নিয়ে এখনও অনেকেই হতবাক, বিস্মিত। ঘটনাস্থল দেখার জন্য এখনও ভিড় করছেন মসজিদটির আশপাশে স্থানীয় গ্রামবাসীসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় তিন হাজার জনবসতিপূর্ণ গ্রাম বাগমারার সৈয়দপুর। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে ওই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অজানা এক আতঙ্ক এখনও তাড়া করে ফিরছে তাদের।

স্থানীয় শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের সদস্য আব্দুস সাত্তার বলেন, এ ধরনের হামলার কথা আমরা আগে কখনও কল্পনাও করিনি। আমরা এ এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। একে অপরের প্রতি সহনশীল। অথচ এ গ্রামের ভেতরেই এসে একজন যুবক বোমা হামলা করে নিজেকেও শেষ করে দিল। এটি ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন, ঘটনার পর থেকেই আমরা আতঙ্কিত। এ রকম একটি গ্রামে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটতে পারে তা কল্পনাতীত।

রাজশাহী জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাগমারার মচমইল বাজার। সেখান থেকে সৈয়দপুর গ্রামটি আরও প্রায় তিন কিলোমিটার। কেশরহাট-ভবানিগঞ্জ রাস্তার দক্ষিণ পাশে ওই গ্রামটিতে প্রবেশের পথটি সরু পাকা রাস্তা হলেও ভেতরের রাস্তাগুলো মাটির। আর মসজিদটি গ্রামের একেবারে ভেতরের অংশে। চিকন আঁকা-বাঁকা রাস্তায় যেতে হবে সেখানে। গ্রামটিতে এখনও পৌঁছেনি বিদ্যুত।

সেই গ্রামের মনির এবং ময়েজ নামের দুই চাচাত ভাইয়ের দান করা জমিতে গড়ে উঠেছে পাশাপাশি দুটি মসজিদ। একটি মোহাম্মদিয়া সম্প্রদায়ের এবং আরেকটি হলো আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। আগে গ্রামের সবাই একসঙ্গে পুরাতন মসজিদটিতেই নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু গ্রামের কিছু লোক আহমদিয়া সম্প্রদায়ে যোগ দেয়ার কারণে আলাদাভাবে ওই মসজিদের পাশেই আরেকটি মসজিদ গড়ে তুলে সেখানে নামাজ আদায় করেন তারা।

অপরদিকে শুক্রবারের ওই হামলাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ধর্মপ্রচারক মাওলানা সালাউদ্দিন আহমেদ। ঘটনার পর রাজশাহী থেকে ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রায় মাস দেড়েক আগে একটি গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাদের সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হতে পারেÑ এমন শঙ্কার কথা বলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করে বলেন, তাদের মসজিদে বা সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর হামলার বিষয়টি সুপরিকল্পিত।

চকপাড়া আহমদিয়া মসজিদ কমিটির সভাপতি এসএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাগমারার বেশ কিছু এলাকায় তাদের সম্প্রদায়ের সমর্থক ও অনুসারী রয়েছেন। তবে ওই সব এলাকায় এখনও পৃথক মসজিদ নির্মাণ হয়নি। তারা এলাকায় আহলেহাদিস সম্প্রদায়ের মসজিদে নামাজ আদায় করলেও মনেপ্রাণে আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। এই তিন এলাকা হলোÑ হামিরকুৎসা, গোয়ালকান্দি ও ঝিকরা। সে কারণে এই তিন এলাকায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের লোকজনের বাসাবাড়িতে বা তাদের একত্রিত স্থানে হামলার আশঙ্কা করছেন তারা।

বাগমারা উপজেলার সৈয়দপুর চকপাড়া গ্রামে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় ঘটে যাওয়া আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় বোমা বহনকারী নিহত ও অপর ১০ জন আহত হন। এদের মধ্যে তিনজন এখনও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন ॥ এদিকে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনায় নিহত বোমা বহনকারীর লাশ অবশেষে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা হয়েছে। রবিবার রাজশাহীর হেতম খাঁ গোরস্তানে তার লাশ দাফন করা হয়। এর আগে হেতম খাঁ গোরস্তান মসজিদে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

রাজশাহীর বাগমারা থানার ওসি মতিয়ার রহমান দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কাছে লাশটি হস্তান্তর করেন। ময়নাতদন্তের পর লাশটি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের হিমঘরে রাখা ছিল।

এই মাত্রা পাওয়া