১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুখী বাংলাদেশ, দুঃখী বাংলাদেশ!

  • জাকারিয়া স্বপন

অনেক দিন জুডিথ আর বব ক্রসের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। গতকাল ক্রিসমাস উপলক্ষে পুরনো টেলিফোনের খাতা খুঁজে ওদের নাম্বার বের করে আমার স্ত্রী ফোন করে জানতে চাইল, ‘হ্যালো জুডি, আমি নিশ্চিত নই, আমাদের কথা তোমাদের মনে আছে কি না!’ ওপাশ থেকে সেই একই মায়াকাড়া গলায় জুডিথ বললেন, ‘ওহ ডিয়ার, তোমাকে আমি ভুলি কিভাবে!’ জুডিথের গলায় এটা শুনলে যে কারও মন ভাল হয়ে যাবে। এত দরদ দিয়ে কেউ কথা বলতে পারে, আমি এই জীবনে আর দ্বিতীয়জন দেখিনি। তাদের মেয়ে বনি ক্রস আমার স্ত্রীর বন্ধু। আমরা যখন টেক্সাসে পড়তে যাই, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই বনির সঙ্গে পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব। জুডিথ আর ববের পরিবার খাঁটি টেক্সান সুখী পরিবার।

দীর্ঘ সময় পর জুডিথের মুখটা সামনে ভেসে এলো। আমার মা’র বয়সী একজন ভদ্র মহিলা। বয়সে শরীরটা বেশ ভারি হয়ে গেছে, তবে খুব সচল। তিন ছেলে আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন টেক্সাসের ডালাস শহরতলিতে। লেকের পাশেই নিজের হাতে সুন্দর বাড়ি তৈরি করেছেন বব। তার পেশাও অবশ্য বাড়ি তৈরি করে বিক্রি করা। আমরা একবার তাদের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। ছবির মতো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা সেই বাড়ি। দেয়ালে ছেলেমেয়ে এবং নাতি-নাতনিদের ছবি সুন্দর করে ফ্রেমে লাগানো। নিচে ছোট করে বর্ণনা লেখা, ছবিটি কবে কোথায় তোলা হয়েছিল।

আমরা যখন ওদের বাড়িতে পৌঁছলাম, সেখানে যেন একটা ঈদের মতো ব্যাপার ঘটল। নিজের ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন পর বাড়িতে এলে যেভাবে মা যতœ করে সবকিছু নিজের হাতে আদর করে করে দেন, জুডিথ তাই করলেন। তারা নিজেরা ভাত খান না। কিন্তু আমরা ভাত পছন্দ করি বলে বিশেষ ধরনের চাল যোগাড় করে, রাইস কুকারে ভাত রান্না করে রেখেছেন তিনি। বাড়িতে কোন বুয়া নেই; সব কিছু নিজের হাতেই করতে হয়। নিজের হাতে রান্না করা ভাত মাছ খেতে খেতে তিনি গল্প শোনাচ্ছেন, তার কোন ছেলে কী করছেন, কোন মেয়ের বাচ্চা হবে, কোন নাতি কোন স্কুলে কেমন রেজাল্ট করছে ইত্যাদি।

জুডিথের কাছে যতদিন আমাদের বাসার ঠিকানা ছিল, ততদিন প্রতিটা ক্রিসমাসে একটি করে কার্ড আসত। সেই কার্ডে তার পুরো পরিবারের একটি ছবি, যেখানে সকল ছেলেমেয়ে এবং নাতি-নাতনিরা থাকবে। তার সঙ্গে আসবে হাতে লেখা একটা চিঠি। সেখানে তিনি প্রতিটি মানুষ সম্পর্কে দু-এক লাইন করে লিখবেন। মেজ ছেলের সঙ্গে তার স্ত্রীর কেন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে থেকে শুরু করে ছোট নাতি ফুটবলে ভাল করছে- সেটা পর্যন্ত আপডেট থাকত।

এইবার ক্রিসমাসে আমাদের ফোন পাওয়ার পর তিনি যে যারপরনাই খুশি হয়েছেন তা তার ই-মেইল থেকে প্রকাশ পেল। সেই ই-মেইলেও যেন হাতে লেখা চিঠির মতোই সুন্দর, গোছানো, যতœ করে লেখা, আদর দিয়ে মাখা। তিনি তার পুরো পরিবারের আপডেট দিয়েছেন। ববের বয়স হয়েছে। এই বয়সে সে টুকটাক কাজ করে। তবে সপ্তাহে তিন দিন একটি স্কুলে বাচ্চাদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে পড়াতে যায়, আর একটা দিন গির্জায় স্বেচ্ছাসেবা করে। জুডিথ নিজেও দুই দিন গির্জায় মানুষকে সাহায্য করে। বনির ছয়জন বাচ্চা, বড়টার বয়স মাত্র নয় বছর। প্রায় প্রতিবছরই একটি করে বাচ্চা নিয়েছে বনি। টেক্সাসের সিনেমার মতো সুন্দরী মেয়ে বনি। সেই মেয়ে ছয় বাচ্চার মা এখন। জুডিথের বাড়ির কাছেই ওরা থাকে। পুরো পরিবারটাকে কিভাবে যেন একটা সুখের সুতা দিয়ে বেঁধে রেখেছেন জুডিথ। আর একটি মানুষ কতটা সুখী হলে এভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন, তা জুডিথের চিঠি না পড়লে বুঝতে পারতাম না।

ছাত্রাবস্থায় আমাদের খুব করুণ অবস্থা ছিল। একটা ছোট বাসায় কোন রকমে দিন পার করা যাকে বলে। বাসায় শুধু পড়ার একটা টেবিল আর চেয়ার। বিছানা ছিল না বলে মাটিতে ঘুমাতাম আমরা। কেউ বাসায় এলে তাদেরও কার্পেটে বসতে হতো। একবার জুডিথ আমাদের দেখতে এলেন। ওদের বসতে দেয়ার মতো কিছু নেই আমাদের। তাতে তারা কিছুই মনে করলেন না। আমাদের বুকে টেনে নিয়ে এমনভাবে আদর করে গেলেন যেন, আমরা তাদের আরও দুটি সন্তান। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরেই জুডিথ ফিরে এলেন, তার স্বামী বব আর তিন ছেলেকে নিয়ে। সঙ্গে নিয়ে এলেন একটি সুন্দর সোফা। পাখির পালক দিয়ে তৈরি সোফা। এটা জুডিথের মা ব্যবহার করতেন। তিনি মারা গিয়েছেন বলে কেউ ব্যবহার করেন না। এটা আমাদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছেন ২০০ মাইল দূর থেকে নিজেদের ট্রাক ড্রাইভ করে। তিনি এমনভাবে আমাদের আগলে রাখলেন যেন আমরা বিষয়টাকে উল্টোভাবে না নেই। কাউকে কোন উপহার যে এতটা আপন করে দেয়া যায়, তা জুডিথকে না দেখলে বুঝতাম না। বনির তিন ভাই নিজেরাই আমাদের দোতলা বাসায় সেই সোফা তুলে দিয়ে গেল। ওদের কিভাবে ধন্যবাদ দেয়া যায়, সেই ভাষা আমরা খুঁজে পেলাম না। শুধু ওদের ভালবাসায় মাথা নিচু করে রাখলাম। কিভাবে কাউকে সম্মানজনক ভালবাসায় সিক্ত করা যায়, তা আমি জুডিথের কাছ থেকে শিখি। প্রাপ্তিহীন ভালবাসা।

গত এক যুগ ধরে কখনই একটি বারের জন্য ঘুণাক্ষরেও তাদের মুখে কোন কিছু নিয়ে অভিযোগ শুনিনি। জীবনকে এক অদ্ভুত সুখের চাদরে ঘিরে রেখেছেন তারা। জুডিথ-বব ক্রস পরিবার জানেন, জীবনের অর্থ কী। তাদের উপার্জন সামান্য; কিন্তু সুখের কমতি নেই এতটুকু। সেই জীবন খুবই লোভনীয় জীবন। এই পৃথিবীর জটিল বিষয়গুলো তাদের স্পর্শ করেনি, এই পৃথিবীর লোভ-লালসা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় না, এই পৃথিবীতে অন্যকে নিচে নামিয়ে নিজেকে উপরে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় তাদের নামতে হয় না, অজস্র সম্পদের পেছনে তাদের নেশা নেই, জীবনের অনেকটা অংশ মানুষের জন্য স্বেচ্ছাসেবা করে কাটিয়ে দেন, আর মানুষকে আগলে রাখেন নিরন্তর এক ভালবাসা দিয়ে। বর্তমান এই পৃথিবীতে কতজন মানুষ এমন সুখী জীবন পেতে পারে!

আমার ধারণা, টেক্সাসের বেশিরভাগ মানুষই এমন জীবন যাপনে অভ্যস্ত। এই পৃথিবীর অন্য কিছু তাদের ছুঁয়ে যায় না। বেশিরভাগ মানুষ জীবনে টেক্সাসের বাইরে যাননি। তাদের কাছে বাংলাদেশ অনেক দূর।

দুই.

বাংলাদেশের মানুষের মনেও এমন সুখ ছিল বলে শুনেছি; দেখিনি কখনও। একটা সময়ে বাংলাদেশে গোলা ভরা ধান ছিল, আর পুকুর ভরা মাছ- সেই মাছে-ভাতে বাঙালী। মাছ-ভাত সবার কপালে জুটত কি না আমি নিশ্চিত নই। কেননা এমন সময়ের কথাও আমরা জানি, যখন মানুষের তিন বেলা খাবার ছিল না। তবে এই এলাকার মানুষ যে সুখী ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সম্পদ থাকলেই মানুষ সুখী হয়, সেটা যে সঠিক নয় তা এই এলাকার মানুষের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যাবে। খাবার ছিল না, কিন্তু সুখ ছিল।

বাংলার মাটিতে যে সুখ ছিল কিছু বিষয় দেখলে তা খুব সহজেই বোঝা যায়। এই দেশের মাটির পরতে পরতে গান, বিচিত্র রকমের গান। একজন মাঝি নৌকা নিয়ে দূরের রাস্তায় যাবে, তার গলাতে গান শোনা যায়। একজন মাঝির কি অনেক সম্পদ ছিল? নিশ্চয়ই ছিল। আর্থিক কষ্টের মধ্যেও তার মনে এক ধরনের সুখ ছিল যার কারণে তিনি গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে নদী পার হয়ে যেতেন। বাংলায় অসংখ্য মরমী কবি আছেন, গায়ক আছেন যারা নিজের এলাকায় গান গেয়েছেন, মানুষকে বিনোদন দিয়েছেন। বাংলাদেশের অসংখ্য এলাকা পাওয়া যাবে যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ, চাষাবাদ খারাপ, ফসল খারাপ, কিন্তু খুব সুন্দর মায়া জড়ানো গীত তৈরি হয়েছে। এগুলো কষ্টের গীত নয়; এগুলো দুর্ভিক্ষের কথা নয়। এগুলো মনের ভাব, আবেগ, হৃদয়ের খোরাক। পেটের খোরাকের কমতি থাকলেও, মনের খোরাকের কমতি ছিল না। একটা সময় ছিল যখন বাংলার মানুষের চাহিদা ছিল খুবই কম; অল্পতেই মানুষ সুখী অনুভব করত।

আমার এখনও মনে আছে, ছোট বেলায় যখন শীতের ছুটিতে মামা বাড়ি যেতাম, তখন মামাত ভাইয়েরা আমাদের পালা গান শোনাতে আশপাশের গ্রামে নিয়ে যেত। আমরা মাইলের পর মাইল ক্ষেতের আইল দিয়ে, ছোট রাস্তা দিয়ে, বড় সড়ক দিয়ে হেঁটে, রিক্সায়, ভ্যানে চড়ে গ্রামের পর গ্রামে পালা গান, যাত্রা দেখতে গিয়েছি। আমাদের চলার পথে অসংখ্য ভাঙ্গা ঘরবাড়ি পড়েছে। শীতের রাতে অনেকের বাড়িতে পর্যাপ্ত কাপড় ছিল না। মামাবাড়ির আশপাশের অনেক বাড়িতে মানুষ কাঁথা গায় দিয়ে উঠোনে বসে থাকতেন, কারণ তাদের চাদর ছিল না। সন্ধ্যায় কোথাও খড় দিয়ে আগুন ধরালে সেখানে গোল হয়ে সবাই আগুন পোহাতে আসতেন। অযতেœ পায়ের গোড়ালি ফেটে গেছে। সেই আগুনে ঠা-া পা দুটোকে উত্তাপে বাঁচিয়ে রাখতেন। তাদের কেউ হয়ত রাতে খেয়েছে, কেউ ভর পেট খায়নি। যাদের খাওয়া জোটেনি, নানুকে দেখতাম কারও কারও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন। তাদের অনেকের পেটে ক্ষুধা ছিল, কিন্তু তারা মিলেমিশে থাকতেন। একে অপরকে দেখে রাখতেন। খাবার দিতেন। দিনের শেষে সবাই মিলে কোথাও বসে কারও গলায় গান শুনতেন।

আমার কেন যেন মনে হয়, সেই সময়ের মানুষের ভেতর এক ধরনের দর্শন ছিল। একে অপরকে সাহায্য করা, নিজে খেতে পেলে অপরকে খেতে দেয়া, পুকুরের মাছ ধরলে আশপাশের সবাইকে সেটা বিতরণ করা। এই পুকুরের মাছ যে আমার একার নয়, আশপাশের মানুষের এতে অধিকার আছে- বিশেষ কোন দর্শন না থাকলে এই চিন্তা কারও ভেতর আসার কথা নয়। একটি সম্পদ যে শুধুমাত্র নিজের একার নয়, তা একটি সমাজের- এই দর্শন তখনকার মানুষকে কেউ শিখিয়ে দেয়নি। বাংলার মানুষ এভাবে নিজেকে ভাবতে পারত। তখনকার মানুষ যে কতটা দার্শনিক ছিল, তা ভেবে ভেবে আমি কূল কিনারা পাই না।

আমি আমার নানাবাড়ি এবং দাদার বাড়ি- দুটো গ্রামের বাড়িতেই অতিথিশালা পেয়েছি। বাইরের দিকে একটি ঘর, সেখানে মানুষ এসে থাকতে পারতেন। রাস্তা দিয়ে অচেনা মানুষ চলে গেছেন, তাকে জিজ্ঞেস করা হতো তিনি কোন বাড়ির এবং কোথায় যাচ্ছেন? দূরের গ্রামের একজন পথিক এই বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় এখানে খেয়ে যেতে পারতেন, রাত যাপন করতে পারতেন। বাড়িতে মেহমান এলে, অন্দরমহলের মেয়েরা প্রয়োজনে না খেয়ে মেহমানকে খাইয়ে দিত। এগুলো গল্পের মতো শোনাবে। কিন্তু এই বাংলায় গত শতাব্দীতেও এমন ছিল।

আমাদের সম্পদ ছিল না, তবে জীবনের প্রতি আমাদের এক ধরনের দর্শন ছিল। আর সেই দর্শনের প্রভাবেই আমরা সামাজিক জীবনে অনেক বেশি সুখী ছিলাম। বাংলার মানুষ সুখী ছিল।

তিন.

সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সুখবোধ পরিবর্তিত হয়েছে। আমাদের দর্শন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আমরা এখন আর সামাজিকতাটাকে প্রাধান্য দেই না; আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। সম্পদ সব আমার, সমাজের নয়- এই দর্শনে চলে গেছি। ফলে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে- তবে সুখ বেড়েছে কি না সেটাও ব্যক্তিগত পর্যায়েই অনুধাবন করা যাবে।

আমি যেহেতু বাংলার সেই সুখটুকু দেখিনি, তাই আমি কল্পনায় জুডিথ আর ববের মতো মানুষকে দেখতে পাই। আমার কল্পনায় থাকে অসংখ্য জুডিথ এই দেশে মা হয়ে নিজের জীবনকে অন্যের জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। আমি কল্পনায় ভাবি, এই দেশের অসংখ্য বব একটা সময়ে সমাজের জন্য কাজ করত, স্বেচ্ছাসেবা করত। বাংলাদেশের মাটিতে অসংখ্য মানুষ ছিলেন যারা রাস্তায় রাস্তায় গাছ লাগাতেন, বড় গাছটির নিচে পাকা করে বসার জায়গা করে দিতেন, আর সেখানে যেন পথিক পরিষ্কার পানি পান করতে পারে সেজন্য টিউবওয়েল বসিয়ে দিতেন। এই ছোট কাজগুলোর বিনিময়ে কোন প্রাপ্তি ছিল না। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভোট চাইবার ফন্দি ছিল না। এগুলো নিজেদের সহজাত ভাল লাগা থেকেই করতেন। এই বাংলায় অসংখ্য জুডিথ ছিল, হাজারও বব ছিল।

বিগত সময়ে বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ বেড়েছে। সমষ্টিগত সম্পদের পরিমাণও অনেক বেড়েছে। আমাদের খাদ্য সঙ্কট আর নেই। পোশাকের সমস্যা নেই বললেই চলে। অন্ন বস্ত্রের পরেই আসে বাসস্থান। সেটারও বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলা চলে। মানুষের অসংখ্য এ্যাপার্টমেন্ট হয়েছে; সুন্দর সুন্দর এ্যাপার্টমেন্ট। ১৬ কোটি মানুষের ভাল বাসস্থান হয়ত হয়নি, তবে অনেকের হয়েছে। তুলনামূলকভাবে আগে এত মানুষের এত ভাল বাসস্থান ছিল না। (আমরা হয়ত আরও ভাল করতে পারতাম। এরপর যদি বলি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য তাহলে বলতে হবে, শিক্ষাতেও আরও ভাল করার সুযোগ ছিল। মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। সেই হিসেবে বলা যায়, স্বাস্থ্য খাতও এগিয়েছে। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ কোম্পানি তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মোট কথা, আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছি। সেই এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, সুখ-শান্তি কমে এসেছে। আমরা এক অদৃশ্য সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনটাকেই যেন অস্থির শিকারিতে পরিণত করেছি। অস্থির জীবনে সুখ থাকে না।

কিন্তু এত কিছুর পরেও আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশে এক ধরনের সুখ রয়েছে। বাংলাদেশ একটি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। এখানে যেহেতু অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে, তার এক ধরনের বেদনা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন সেই প্রসব বেদনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই কষ্টকর বেদনার পর, এই দেশে সুন্দর একটি জীবনযাপন তৈরি হবে, এটাই এই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।

চার.

২০১৫ সালে এটাই আমার শেষ লেখা। পরের লেখাটি যখন লিখতে বসব, তখন শুরু হয়ে যাবে নতুন বছর। ২০১৫ সালে আমার একটি উপলব্ধিকে লিপিবদ্ধ করার জন্য এই ভূমিকা টানলাম।

বাংলাদেশ একদিক দিয়ে যেমন অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগুচ্ছে, অন্যদিকে এক ভয়ঙ্কর উগ্র চিন্তাচেতনার বিকাশও হতে শুরু করেছে এই মাটিতে। ২০১৫ সালেই আমরা এমন সব ঘটনা দেখেছি, যেগুলোর রাস্তা খুবই ভয়ঙ্কর। আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো উগ্রবাদ।

অনেককেই বলতে শুনি, আমেরিকাতে বন্দুক দিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছে, তাই বাংলাদেশে কিছু মারা গেলে এত ভয়ের কী আছে? আমি জানি না, তারা কতটা লেখাপড়া করেছেন কিংবা কতটা গভীর থেকে আমেরিকাকে চিনেছেন। আমেরিকার বন্দুকের গুলিতে মানুষ মারা যাওয়া আর বাংলাদেশের জঙ্গীদের হাতে নিহত হওয়ার বিষয়টি এক নয়। বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের হাত রয়েছে। কেউ কেউ চাইছে, এই দেশটাকে অস্থির করে তুলতে, কিংবা রাখতে। আর একবার সেই রাস্তায় হাঁটা শুরু করলে পরিণতি কী হয়, তা আমরা দেখেছি আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে, সিরিয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কিছু দেশে।

বাংলাদেশে কেন জঙ্গীবাদের উত্থান হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হতে পারে। আমি সেই অমীমাংসিত বিতর্কে যাচ্ছি না। আমার সেন্স বলছে, এই দেশে মানুষ যে এখন যেটুকু সুখে আছে, সেই সমৃদ্ধির দিকে হাঁটছে, যেটকু স্বপ্ন নিয়ে একজন মা-বাবা তার সন্তানদের বড় করছেন- আমাদের সব স্বপ্ন ধুলায় মিলিয়ে যাবে, যদি না এই দেশ সেই জঙ্গীবাদকে রুখতে পারে। একবার যদি এটাকে মোকাবেলা করা না যায়, তাহলে এই কবির দেশের মানুষের, এই সুরের দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা রাখার জায়গা থাকবে না।

আমি কাউকে ভয় দেখাচ্ছি না; কিন্তু এটাই এখনকার বাস্তবতা। বছর শেষে শুধু এটুকুই প্রত্যাশা, সোনার এই দেশের মানুষের যেন মঙ্গল হয়।

২৬ ডিসেম্বর ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স