২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজাকার হওয়া সহজ হয়ে যাচ্ছে কঠিন হয়ে উঠছে মুক্তিযোদ্ধা থাকা

  • মুনতাসীর মামুন

(২৭ ডিসেম্বরের পর)

কিন্তু, এসব বিষয়ে বলেন। আজ পর্যন্ত খালেদা জিয়া জাতীয় উন্নয়ন বিষয়ে কোন পরিকল্পনার কথা বলেছেন কিনা সন্দেহ। এ বিষয়ে আদৌ তিনি জানেন কিনা জানি না। তার সমস্ত রাজনীতি কেন্দ্রীভূত এই তিনটি বিষয়ে। এদের আমরা জাতীয় নেতা বলি! সম্মান করি! ধিক আমাদের! মিডিয়ার ধান্ধাবাজরা তাকে সমব্যথী দৃষ্টিতে দেখে জাতীয় নেতায় পরিণত করেছে।

রাজনীতি যে তারা কতো সঙ্কীর্ণ করে ফেলেছেন তা আমরা ভাবি না। খালেদার এই বক্তব্যের পর মিডিয়ার অনেক তরুণ সাংবাদিক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের প্রশ্ন আমাকে অবাক করেছে। তাদের জিজ্ঞাস্য, খালেদা যা বলছেন তা ঠিক কিনা? এই সংখ্যা নিয়ে গবেষণা হয়েছে কি-না। আমি জানালাম, ৪৫ বছর ধরে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত, একজন একটি প্রশ্ন করায় আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে কেন? গবেষণার প্রশ্ন আসবে কেন? তারা প্রজন্মকে জানানোর কথা বলেছেন। ৪৫ বছর ধরে প্রজন্মকে একই সত্য প্রতিবছর জানাতে হবে কেন? জানার দায়িত্বতো তাদেরও। যাই বলি, একটি বিষয় বুঝেছি, তা হলো, মিথ্যা বললেও খালেদা যেহেতু বলছেন, সেহেতু তরুণদের একাংশ মনে করে তা সত্যি। বা মিডিয়ার যে সিমপ্যাথি বোধ তার প্রতি সেটি প্রভাব ফেলে। অনুধাবনের বিষয় এই যে, খালেদা ও জিয়ার সাফল্য জাতিকে সম্পূর্ণভাবে তারা দ্বিখ-িত করতে পেরেছেন। এ দেশে ১৯৭৫-এর পর বিএনপি-জামায়াত জোট বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হচ্ছে। মিডিয়া তাদের দখলে। আমি আওয়ামী লীগ সমর্থক অনেককে জানি, যারা শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এবং যারা আর্থিক ক্ষেত্রে তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন বলে শুনেছি [সম্পাদক, মালিক] তারা তাদের পত্রিকা-টিভিতে বেছে বেছে যারা বিএনপির সমর্থক, ছাত্রদল বা শিবিরের সঙ্গে যুক্ত তাদেরই নিয়োগ দেন। প্রধানমন্ত্রী সিভিলিয়ানদের কথা বিশ্বাস করবেন না, আস্থাও রাখেন না হয়ত। অন্য পক্ষকে নিয়ে খোঁজ নেওয়ান। সুতরাং, মাঝে মাঝে যে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন মিডিয়া নিয়ে তার যৌক্তিকতা নেই। কারণ, তাঁর আশীর্বাদ নিয়েই তারা তার বিরুদ্ধে লেখেন। না, সমালোচনা বা আলোচনা নয়, খালেদার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন, আওয়ামী লীগের নেতিবাচক দিক নিয়ে বড় শিরোনাম করেন। বাংলাদেশ; মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর একমাত্র সব সম্ভবের দেশ। আর এ কারণেই, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নিজের দেশের বিরুদ্ধে বলেন এবং রাজনীতি করতে পারেন অবাধে। এবং মিডিয়া তাকে সাপোর্ট দেয়।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, এ সব অবান্তর কথা উপেক্ষা করা উচিত। অনেকে তাই মনে করেন। আমিও করতাম। কিন্তু, পরে মনে হলো, উপেক্ষা করা নয়, উপেক্ষা করার কারণেই জামায়াত-বিএনপি অনেক জমি দখল করে নিয়েছে। এসব অবৈধ দখলকারীকে উৎখাত করতে হলে, প্রতিটি মিথ্যার জবাব দেয়া শুধু নয়, আরো অনেক কিছুই বলতে হবে। সে জন্যই এই নিবন্ধ। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই আমরা ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের কথা বলি। দেশে বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের টেক্সটে সেটিই স্বীকৃত। এই সংখ্যা নিয়ে স্বয়ং জিয়াউর রহমানও কখনও সংশয় প্রকাশ করেননি। মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের সময় জামায়াত লবিস্টরা যখন টাকা লাগালো ইউরোপ আমেরিকার সাংবাদিক ও এ্যাটর্নিদের মধ্যে তখন হঠাৎ ড. কামাল হোসেনের কন্যা জামাতা বার্গম্যানের মনে হলো বিষয়টি ঠিক নয়। এর আগে বার্গম্যান মানবতাবিরোধী অপরাধী নিয়ে তথ্যচিত্র করেছেন। বার্গম্যানের বক্তব্যের পর খালেদা জিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেন। আদর্শ বা বিশ্বাস কিংবা সত্য থেকেও আমাদের সমাজে যে টাকা কতো শক্তিশালী বা টাকাকে যে দেবতা জ্ঞান করা হয় তা স্পষ্ট হলো।

ঐ সময় অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ট্রাইব্যুনাল আদালত অবমাননার মামলাটি গ্রহণ করে বার্গম্যানকে দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান রায়ে লেখেন, “মত প্রকাশের স্বাধীনতা সরল বিশ্বাসে এবং জনস্বার্থে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ডেভিড বার্গম্যানের তন্ন তন্ন করে খুঁজে এ সংখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করার পেছনে সরল বিশ্বাস ছিল না এবং এটা তিনি জনস্বার্থ রক্ষার জন্য করেননি। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং এটা বাংলাদেশের জনগণের আবেগের সাথে জড়িত।” এই সংখ্যা (ত্রিশ লাখ) ট্রাইব্যুনালের দেয়া আগের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে কেউ এই গবেষণা করতে পারেন; কিন্তু তাদেরকে ট্রাইব্যুনালের মর্যাদায় আঘাত হতে পারে এমন ধরনের কোন মন্তব্য করার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশ সরকারের আগে মস্কোর প্রাভদায় বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার ৩০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। পরে বাংলাদেশ সরকারও এই সংখ্যাটিকে স্বীকৃতি দেয়। এটি নিয়ে গবেষণা হয়েছে কিনা তরুণ সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছেন। বইপত্রের সঙ্গে সংযোগ থাকলে তারা জানতে পারতেন যে, গবেষণা অনেক হয়েছে। তরুণ গবেষক আরিফ রহমান ত্রিশ লাখ শহীদ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা নিয়ে সুন্দর একটি বই লিখেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আমেরিকার সংবাদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন, জুলাই মাসেই তারা যে বলেছে, সেটি অব্যাহত থাকলে ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। আরিফ উল্লেখ করেছেনÑ

১. নিউইয়র্ক টাইমস গণহত্যা শুরুর ১০ দিনের মাথায় লিখছেÑ

[৫ জুলাই ১৯৭১] হতাহতের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে এবং তা বাড়ছে।

২. নিউজউইক ২০ দিন পর অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি লিখছে ৭ লাখ নিহত।

৩. ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ২৩ জুলাই লিখেছে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।

বিদেশী যারা গবেষণা করেছেন তাদের মতে নিহতের সংখ্যা ১০ লাখ থেকে ৩০ লাখ। ৩০ লাখ সংখ্যাটি অধিকাংশ মেনে নিয়েছেন। আবার অনেকে সরাসরি ৩০ লাখও বলেছেন। আমেরিকার ‘কম্পটনস এনসাইক্লোপিডিয়া’, লিও কুপারের ‘জেনোসাইড’, আমেরিকার ‘এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকানা’ এ নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘ দুটি হিসাব করেছে। তাদের মতে, প্রতিদিন যদি ৬০০০ ধরা হয় তাহলে সংখ্যাটি হবে ৯৬,৫০০। যদি ১২০০০ ধরা হয়, তাহলে হবে ৩১৯২০০০০ জন। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ভূমিকায় তা উল্লিখিত হয়েছে ১৯৮১ সালে। সেখানে স্বীকার করা হয়েছে পৃথিবীতে যত গণহত্যা হয়েছে তাতে এত অল্প সময়ে আর কখনও এত মানুষ নিহত হয়নি।

গণহত্যার সংখ্যা কমালে অনেকের ধারণা অপরাধের মাত্রা কমে যায়। পাকিস্তানের হামুদুর রহমান কমিশন তাই উল্লেখ করে মৃত মানুষের সংখ্যা ২৬,০০০। সেই কমিশনে এই সাক্ষ্য দেয়ার পর রাও ফরমান আলী আমাকে বলেন, সংখ্যাটি হবে ৪০/৫০ হাজার। ১৫ লাখ মারা গেলেও কি অপরাধের মাত্রা কমে? পাকিস্তানের প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক সম্পাদক নকভী বলছিলেন, টিক্কা খান যখন ঢাকা থেকে ফিরে আসেন তখন করাচি বিমানবন্দরে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শোনা যাচ্ছে পাকিস্তানী সৈন্যরা নাকি বাঙালি মহিলাদের ধর্ষণ করছে। সেই সংখ্যা কত হবে? টিক্কা খান মৃদু হেসে বলেছিলেন বেশি না, হাজার তিনেকের মতো হবে। নকভী ক্রুদ্ধ স্বরে আমাকে বলেছিলেন, পাকিস্তানী সৈন্যরা যদি একজন বাঙালি নারীকেও হত্যা করে থাকে তাহলে সেটিই জঘন্য অপরাধ। কারণ, তারা নিজ দেশের মহিলাকে ধর্ষণ করেছে যাকে তাদের রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব। সংখ্যার গুরুত্ব অবশ্যই আছে, কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্ববহ হচ্ছে পাকিস্তানী সৈন্যরা নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যা করেছে যাদের রক্ষার জন্য তারা কোরান ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিল।

আমরা বলি ১৯৭০ সালের টর্নেডোতে ১০ লাখ মারা গেছেন। সেটিই স্বীকৃত। কেউ কি গুনে গুনে দেখেছিলেন ১০ লাখ হয় কিনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র শক্তি বলেছিল নাৎসিরা ৭৩ লাখ ইহুদীকে হত্যা করেছিল। নাৎসি পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এটি অতিরঞ্জিত। কিন্তু, বিচারকরা বলেছেন, বিজয়ীরা যা বলেছে তাই সরকারী ভাষ্য এবং স্বীকৃত।

৩০ লাখ শহীদের কথা বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সরকার বলেছে সেটিই স্বীকৃত, সেটিই মানতে হবে। কেউ যদি তা না মানেন তাহলে আদালত, ইতিহাস, বিশ্বাস সবই অস্বীকার করেন। বার্গম্যানের প্রশ্ন যদি আদালত অবমাননা হয় তাহলে ট্রাইব্যুনালের উচিত হবে এবং কোর্টের মর্যাদা রক্ষা হবে যদি খালেদা জিয়াকে আদালত অবমাননার জন্য আদালতে ডাকা হয়।

এই ঘোষণায় বেগম জিয়া আবারও মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে অস্বীকার করলেন, পাকিস্তানের যুক্তি মেনে নিলেন, আদালত অবমাননা করলেন এবং ত্রিশ লাখ শহীদ পরিবারের সদস্যদের বুকের ভেতরে সীমারের খঞ্জর ঢুকিয়ে দিলেন।

চলবে...