১৭ জানুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস বিকৃতি রোধে আইন

বাংলাদেশ আইন কমিশন দেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি বন্ধে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে শীর্ষক সংবাদটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক। বর্তমানে অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এ জাতীয় আইন অনেক আগেই প্রণয়ন করা অবশ্যক ছিল। এর পরও বলতেই হয় যে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরে হলেও মহান বিজয়ের মাসে আইন কমিশন হলোকস্টের আদলে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইহুদিসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর ওপর হিটলারের কুখ্যাত নাৎসি বাহিনী ব্যাপক গণহত্যা চালায়। কেবল ৬০ লাখ ইহুদিকেই হত্যা করা হয় নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে। প্রধানত এই ইতিহাস বিকৃতি রোধেই জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ গঠন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধীদের বিচারের জন্য। এর পাশাপাশি প্রণয়ন করে হলোকস্ট আইন, যেটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংসদ। নাম দেয়া হয় ‘ল এ্যাগেইন্স্ট ডিনায়্যাল অব হলোকস্ট।’ আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে ৬ বছর পর্যন্ত কারাদ- ও ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। অনুরূপ আইন রয়েছে আফ্রিকার রুয়ান্ডার গণহত্যার ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশে বিলম্বে হলেও কেন এ রকম একটি আইন প্রণয়ন এবং সরকার কর্তৃক তা গ্রহণ ও অনুমোদন আবশ্যক হয়ে পড়ল তার কিছু ব্যাখ্যা থাকা দরকার। গত ২১ ডিসেম্বর জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক সভায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অবশ্য খালেদা জিয়ার এই বক্তব্য মোটেও আকস্মিক নয়। অতীতে পাকিস্তানও এ বিষয়ে একাধিকবার বালাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সর্বশেষ, কুখ্যাত মানবতাবিরোধী সাকা চৌধুরী ও জামায়াত নেতা মুজাহিদের ফাঁসিতে মৃত্যুদ- কার্যকরের পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, একাত্তরে বাংলাদেশে কোন গণহত্যা হয়নি। এর পরপরই খালেদা জিয়ার এ জাতীয় বক্তব্য প্রদান মূলত পাকিস্তানের বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। বলাই বাহুল্য, খালেদার এই বক্তব্যের পরপরই দেশব্যাপী প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ-মিছিল-আন্দোলনের খবরও আছে। এর পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরসহ উকিল নোটিস দেয়ার বিষয়টিও উল্লেখের দাবি রাখে। খালেদা জিয়ার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি বিএনপির পক্ষ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে জরিপ করার কথাও বলা হয়েছে। এতে স্বভাবতই প্রতীয়মান হয় যে, বিএনপি একটি বিশেষ উদ্দেশ্য তথা পাকিস্তানী এজে-া বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির কোন অবকাশ নেই। সর্বশেষ মার্কিন গবেষক অধ্যাপক রুডলফ জোসেফ রুমেলের (আরজে রুমেল) গণহত্যা বিষয়ক ‘স্ট্যাটিসটিকস ডেসিমাইড’ বইতেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পরিসংখ্যান রয়েছে। বইটিতে জেলাভিত্তিক গণহত্যার তালিকাও দেয়া আছে। ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধের সময় তথ্য সংগ্রহকারী সোভিয়েত বার্তা সংস্থা ‘তাস’, ইউএনআই, ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়। অবশ্য দেশের অভ্যন্তরীণ রণাঙ্গন এবং ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতে নয় মাসে নিহতের সংখ্যাÑ সব মিলিয়ে ৩০ লাখের অনেক বেশি হবে বলে অনুমিত হয়। সে অবস্থায় যে বা যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করে, সর্বোপরি ইতিহাস বিকৃতি ঘটানোর অপপ্রয়াস পায়, তাদের বিষয়ে হলোকস্টের আদলে আইন প্রণয়ন আজ সময়ের দাবি। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারা শহীদদের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কথা বলবে, যারা একাত্তরের খুনী, ধর্ষক, গণহত্যাকারীদের পক্ষে কথা বলবে তাদের ক্ষমা করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। বরং জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।