২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রেরণার মাস এই ডিসেম্বর

  • মো. জগলুল কবির

তিনটি গুণ মানুষকে নেতা হয়ে উঠতে সহায়তা করে। মহান করে তোলে। তাহলো বুদ্ধি, ত্যাগ ও সাহস। যে ত্যাগ করতে শিখে সে আদর্শবান হয়। সঙ্গে বিনয়ী হলে তখন মানুষ মহামানব হয়।

আর যে ভোগ বিলাসে মত্ত হয় তার আদর্শে ঘাটতি আসা সহজ। কারণ একবার ভোগ-বিলাসে মেতে উঠলে তা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে ওঠে। ভোগ-বিলাস মানুষের ভেতরে ধীরে ধীরে আধিপত্য বিস্তারের নেশা জাগিয়ে তোলে। অহঙ্কারী হয়ে ওঠে। ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুরু করে। যা আস্তে আস্তে মানুষকে তার স্বাভাবিক মানবিক গুণাবলী থেকে দূরে সরিয়ে দিতে থাকে। মানবিক গুণাবলী কমে যাওয়া মানে ঐ শূন্য স্থানে জন্তু-জানোয়ারের গুণাবলী আস্তে আস্তে প্রবেশ করা। এক সময় জংলি আচরণ শুরু হয়। জংলি আচরণ মানুষ একা একা করে না, একটি শ্রেণীকে নিয়ে করে যার কারণে এর বিস্তার খুব তাড়াতাড়ি ঘটে। তখনই সমাজের মধ্যে ভয়-ভীতি ছড়িয়ে নির্যাতন নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে সেই আধিপত্য ধরে রাখার ক্ষণস্থায়ী চেষ্টা শুরু করে দেয়। তার বিপরীতে ত্যাগী-বুদ্ধিমান-সাহসী মানুষেরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নিজেদের অধিকারের কথা বলতে থাকে, এখানেও একটি সাধারণ বিবেক সম্পন্ন শ্রেণী তৈরি হয়। এই শ্রেণী ত্যাগী হয়, চরিত্র ও আদর্শে বলিয়ান থাকে। জুলুম অত্যাচারের শিকার সাধারণত কম শক্তির গোষ্ঠীই হয়ে থাকে। তাই এই গোষ্ঠী সব সময়ই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু তখন যদি জুলুম অত্যাচার বেশি হয়, মাত্রা বেড়ে যায় ওই ক্ষেত্রে নিপীড়িত ব্যক্তিরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিপক্ষ থেকে এই প্রতিরোধে যখন বাধা আসে সেটাই হয় যুদ্ধ। আর এমনি ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, আর অবশ্যই মহান মানুষদের মহান কাজ মহান ত্যাগ অর্থাৎ নিজের অধিকার রক্ষার জন্য জীবন দিতে শুরু করেছিল। এ ত্যাগ ছিল দেশ ও দশের জন্য ত্যাগ, স্বাধীনতার জন্য ত্যাগ। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য ত্যাগ। তা যে কত বড় ত্যাগ ছিল তা আমাদের এ প্রজন্ম ও সকলকে অনুধাবন করতে হবে। হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে। যারা নিজের দেশের অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদেরকে এ বিজয়ের মাসে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের শহীদদের প্রতি এই শ্রদ্ধা, ভালবাসা অকৃত্তিম, আজন্ম। জীবন দিয়ে যারা ত্যাগ করেছেন তারা অসাধারণ, মহান, বীর, অকৃত্তিম সত্যের আদর্শে বলিয়ান। এত বড় ত্যাগ যে জাতির আছে সে জাতি অনেক গর্বের আর সম্মানের। এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের অহঙ্কার। যারা জীবিত আছেন তাদের অন্তর থেকে অকৃত্তিম ভক্তি-শ্রদ্ধা-সালাম। যারা জীবন দিয়েছেন তারা শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্ত। তাদের জন্যও দোয়া ও সালাম। এমন মহান ত্যাগের সঙ্গে পরোক্ষভাবেও যারা জড়িত হতে পেরেছেন ওনারা ভাগ্যবান।

ত্যাগ করা তখনই সম্ভব যখন কোন কিছুকে মানুষ ভালবাসে। নিখাদ ভালবাসা। অন্তরের মমত্ববোধ। সেজন্যই মা-বাবার ভালবাসা পৃথিবীর সবচেয়ে অকৃত্তিম। এমন ভালবাসা কোন বিনিময় চায় না। মা-বাবা সন্তানের জন্য সব কিছুকে ত্যাগ করতে পারে। তাই বাবা-মা সন্তান যেন ভাল থাকে তার জন্য যত কষ্ট প্রয়োজন তা করে। বাবা-মা চায় আমার সন্তান যেন সুসন্তান হয়, নীতি-নৈতিকতায় আদর্শবান হয়, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয় , সর্বোপরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে সুখে-শান্তিতে থাকে। সকল বুদ্ধি ও বিবেকবান বাবা-মা এমনটিই আশা করেন। তারপরও যদি কোন কারণে সন্তান বিপথগামী হয় তখন বিবেকবান বাবা-মা কখনো সন্তানের অনৈতিক কাজের সহযোগিতা বা সমর্থন করে না।

মানুষ ছাড়াও পৃথিবীর সব প্রাণীর ভেতরেই ত্যাগের চরিত্র বিদ্যমান, তা অবশ্য খুব ছোট পরিসরে। কিছুদিন আগে একটি বিড়াল আমাদের বারান্দায় চারটা বাচ্চা দেয়। এই বিড়াল আমাদের পরিবারভুক্তই বলা যায়। খাওয়া-দাওয়া সে এখানেই করে, আমাদের আপনজন কিন্তু বাচ্চা দেয়ার পর তার চরিত্র দেখলাম পাল্টিয়েছে। এখন সে খুব বেশি এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায় না। আমরা কেউ বারান্দায় গেলে সে তেড়ে আসে। খাবারের জন্য একটু বের হয় তারপর তাড়াতাড়ি গন্তব্যে চলে আসে। বাচ্চাদের জন্য এসবই বিড়ালের ত্যাগ। প্রাণীগুলো সাধারণত নিজ ও নিজেদের বাচ্চাদের জন্য ত্যাগ করতে পারে। তার বেশি খুব না।

মানুষ নিজের জন্য তো পারেই সঙ্গে সঙ্গে অপরের জন্যও ত্যাগ স্বীকার করে, দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্যও ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। ভালবাসা মানুষকে ত্যাগের মহিমায় সুন্দর করে দেয়। মানুষের বুদ্ধি অন্য প্রাণীর চেয়ে আলাদা, সেজন্য মানুষ চিন্তা করতে পারে। সৎ ও মহৎ চিন্তা মানুষকে বিবেকবান করে আর অসৎ চিন্তা ও নিষ্ঠুরতা মানুষকে পশু-জানোয়ারের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এজন্য আমরা মানুষ ওদের (বিড়াল) মধ্যে পার্থক্য হলো বিবেক, বুদ্ধি, চিন্তা, অনুভূতি। এগুলোর অর্জনই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। অথচ পৃথিবীতে মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানবিক গুণাবলী বিবর্জিত কাজ বেশি করতে অভ্যস্থ থাকে। অন্যকে দাবিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করার পরিকল্পনায় বেশি মগ্ন ও ব্যস্ত। মানুষকে মানুষ বিভিন্নভাবে বিরক্ত করে, কষ্ট দেয় তা কখনও ছোট কখনও বড় । জুলুম করে।

আমি একবার এলিফ্যান্ট রোড থেকে একজোড়া নতুন জুতা কিনে মাগরিবের নামাজে মসজিদে গিয়েছি, নামাজের পরে দেখি জুতা নেই, মনটা অনেক খারাপ হয়েছিল। ভীষণ খারাপ।

কয়েক বছর আগে শুনেছি হজে যারা নিয়ে যায় এমন ২/১টি গ্রুপ, তাদের সঙ্গে যাওয়া হাজীদের কাছ থেকে কোরবানির টাকা নিয়েছে কিন্তু কোরবানি না দিয়েই বলে দিয়েছে কোরবানি হয়ে গেছে। আমি শুনে ভাষা হারাই, তাজ্জব বনে যাই, বিস্মিত হই! টাকা প্রয়োজন কিন্তু এভাবে? এটাকে কি বলব? হজের মতো পবিত্র জায়গায় ধোঁকা দেয়া, মসজিদের ভেতর থেকে কোন কিছু নিয়ে যাওয়া মানে হলো আমাদের বিবেক, বিশ্বাস, ভয়, ভক্তি সব কৃত্রিম। অন্তরে পবিত্রতার কোন অনুধাবন নেই। অনুধাবন না থাকলে পবিত্র জায়গাতেও অপবিত্র কাজ করতে দ্বিধা হয় না। বিবেকহীন কাজ করতে বাধা থাকে না। বিবেক বিবর্জিত মানুষের কতটুকু মনুষ্যত্ববোধ থাকে? মনুষ্যত্ব ছাড়া মানুষকে কি বলা যায়?

পত্র-পত্রিকায় কিছুদিন লেখালেখি হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার সহযোগী বিদেশী বন্ধুদেরকে সম্মাননা দেয়ার জন্য যে ক্রেস্ট দেয়া হয়েছিল তাতে যে গোল্ড দেয়ার কথা তা ছিল না। আর এ ঘটনা যদি সত্যি হয় তবে আমাদের আর কোন ভাষা নেই যা কাগজের পাতায় লিখে হৃদয়ে দাগ ফেলতে পারে। তবে এ ঘটনা যদি সত্যি হয়, বলব ৩০ লাখ শহীদের আত্মার কান্না হয়েছে। শহীদের আত্মা জীবিত থাকে। ৩০ লাখ পবিত্র আত্মার বদ দোয়া অবশ্যই তারা পেয়েছে। এ পবিত্র আত্মার সঙ্গে প্রতারণা করা ঠিক হয়নি। এ রকম খবর যখন পত্র-পত্রিকায় বের হয় তার বড় নেগেটিভ এফেক্ট সমাজে পড়ে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। যা জাতিগতভাবে আমাদেরকে পিছিয়ে দেয়।

কয়েকদিন আগে আমার একটি লেখা পত্রিকায় এসেছে। সেজন্য আমি ১০টি পেপার কিনে আনাই। তার মধ্যে একটি পত্রিকা পেলাম যেখানে এক পেজ থেকে কিছু অংশ কাটা ও আমার লেখাটা যে পাতায় সে পাতাটাও নেই। আমি বোকা বনে গেলাম। এত ছোট একটা ব্যাপার মাত্র ১০ টাকা কিন্তু এই হকারও এখানে সৎ হতে পারল না। বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হলো না। আসলে ৩০ লাখ শহীদের জীবনের, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের, কোটি কোটি মানুষের কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া এদেশ এ স্বাধীনতাকে যদি আমরা অন্তরে ধারণ না করি তবে শহীদদের আত্মা আমাদের বদ দোয়া দেবে। শহীদদের আত্মা কষ্ট পাবে।

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কারণে আমরা গর্বিত জাতি। আমাদের গর্ব রক্ষা করতে হলে আমাদের ত্যাগ, আদর্শ, আর বিবেকের দ্বারা তাড়িত হতে হবে। শহীদদের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা অন্তরে স্থাপন করতে হবে। তাই আমার অনুধাবন হলো আমাদের সব কিছু বুঝেশুনে বিবেক দিয়ে উপলব্ধি করে এগিয়ে যেতে হবে।

এ মা, মাটি, জন্মভূমি, মাতৃভূমি ৩০ লাখ শহীদের রক্তের ও জীবনের বিনিময়ে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া দেশকে গড়ার জন্য আমাদের সবার বিবেককে জাগিয়ে তুলে বিবেকের দ্বারা তাড়িত হয়ে সোনার বাংলা গড়ার অঙ্গীকার হোক আমাদের এ বিজয় মাসের শপথ।

নড়ড়শলধমষঁষ২০১৫@ুধযড়ড়.পড়স

মডেল : প্রতিভা শাওন ও সনি রহমান