১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গ্রামীণ রাস্তায় অদ্ভুত উট-ছোট সেতু ও কালভার্ট

নাজনীন আখতার ॥ গ্রামীণ রাস্তায় ছোট ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে ত্রুটি থাকায় ও সেগুলোর উচ্চতা প্রয়োজন অনুযায়ী না হওযায় দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বাস্তবে অদ্ভুত উটের মতো দাঁড়িয়ে আছে এগুলো। কোন কোন এ্যাপ্রোচ সড়কে অপর্যাপ্ত মাটি ফেলার কারণে বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গেছে। সমস্যা সমাধানে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যদের আশাব্যঞ্জক তৎপরতাও নেই। প্রকল্পের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এসব সমস্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্প এলাকার লোকদের অভিযোগ ও চাহিদার বিষয়টি জানানোর মতো পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। রয়েছে সমন্বয়হীনতাও।

গ্রামীণ রাস্তায় ছোট ছোট (১২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত) সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ-৩য় পর্যায় (সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের (২০১২-২০১৬) আওতায় ঢাকা, মানিকগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, কক্সবাজার, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও হবিগঞ্জ পরিদর্শনের পর প্রকল্পের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের লক্ষ্যে ১২ দফা সুপারিশ দিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদের সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

পরিদর্শন-পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, কিছু সেতু ও কালভার্টের এ্যাপ্রোচ সড়কে অপর্যাপ্ত মাটি ফেলা হয়েছে। অনেক এ্যাপ্রোচ সড়কে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গেছে। কিছু সেতু ও কালভার্টের দৈর্ঘ্য প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। এ্যাপ্রোচ সড়কের দুই পাশে উইং ওয়াল সংলগ্ন স্থানে মাটি বৃষ্টির পানিতে ধসে যাওয়ায় মানুষ ও যান চলাচলে বিঘœ ঘটছে এবং যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। আবার দু’একটি সেতু ও কালভার্টের উচ্চতা প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি করা হয়েছে। ফলে সেতু বা কালভার্টের এ্যাপ্রোচের মাটি ধরে রাখা যাচ্ছে না। রিক্সা-ভ্যান ও পণ্যবাহিত গাড়ি সেতু বা কালভার্টের ওপর দিয়ে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। সেতু ও কালভার্টের উভয় পাশের রাস্তা ইট বাঁধানো না থাকায় বর্ষাকালে মাটি সরে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। নির্মিত প্রায় সকল সেতু ও কালভার্টে প্রচুর সংখ্যায় হানিকম দেখা গেছে এবং অধিকাংশের ক্ষেত্রে ওয়ার্কম্যানশিপ ভাল হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যদের আশাব্যঞ্জক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। প্রকল্প এলাকার উপকারভোগীদের কাছ থেকে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তাদের অভিযোগ এবং চাহিদার বিষয়গুলো জানানোর মতো সর্বক্ষণিক কোন পরিদর্শন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। পিআইও, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ডিআরওদের প্রকল্প পরিবীক্ষণের কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবহেলা পাওয়া গেছে। এতে আরও বলা হয়, বিভিন্ন সংস্থা বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বিভাগের কাজের মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন। তাছাড়া প্রতিটি উপজেলায় সেতু ও কালভার্টের চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অপ্রতুল।

সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ সেতু ও কালভার্টের দৈর্ঘ্য ও উচ্চতা প্রকল্প স্থলের উপযোগিতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে প্রকল্প স্থান নির্বাচন করতে হবে। সেতু ও কালভার্টের দুই পার্শ্বে সংযোগ রাস্তা ছাড়া কোন সেতু বা কালভার্ট নির্মাণ করা যাবে না। প্রতিটি সেতু ও কালভার্টের বিপরীতে ৩টি সেতু ও কালভার্টের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পিআইও প্রকল্প অফিসে পাঠাতে হবে। আর্থিক বছর শুরুর আগেই উপজেলাগুলো থেকে হাইড্রোলিক ডাটা ও ছবিসহ সেতু ও কালভার্টের তালিকা সংগ্রহ করতে হবে। নক্সা ও প্রাক্কলন তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা প্রকল্প স্থান পরিদর্শন করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নক্সা ও প্রাক্কলন তৈরি করবেন।

সুপারিশে আরও বলা হয়, সেতু ও কালভার্টের উভয়পার্শ্বের রাস্তার ঢাল শূন্য ডিগ্রীর কাছাকাছি করতে হবে, যাতে রিক্সা ও ভ্যান চালাতে অতিরিক্ত কষ্ট না হয়। সেতু নির্মাণের সময় স্টিল শার্টার এবং ভাইব্রেটর ব্যবহার করতে হবে, যাতে হানিকম কম থাকে এবং ব্রিজের ওয়ার্কম্যানশিপ ভাল হয়। সেতু ও কালভার্টের এ্যাপ্রোচের মাটি ধরে রাখার জন্য উইং ওয়ালের দৈর্ঘ্য ও ঢাল সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করে এ্যাপ্রোচের মাটি ধরে রাখতে হবে। এ্যাপ্রোচে স্বাভাবিক উচ্চতার ওপরে মাটি ফেলতে হবে, যাতে মাটি স্থিত হওয়ার পর কাম্য উচ্চতা থাকে। উপজেলার খাল-নদী-নালার ওপর সেতু ও কালভার্ট নির্মাণকারী সব সংস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট পরিবেশবান্ধব নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সেতু নির্মাণের এক বছর পর মাটি স্থিত হওয়ার পরই সেতু ও কালভার্টের দুই পাশে ১৫-২০ ফুট করে ৩০-৪০ ফুট রাস্তা ইট দিয়ে বাঁধাই করা যেতে পারে।