২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী নির্মূলে আধুনিক প্রযুক্তি ও সাঁড়াশি অভিযান

  • নতুন বছরে সাইবার ল্যাব, পাশে প্রভাবশালী অনেক দেশ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ জঙ্গীবাদ নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার। সরকারের এমন পদক্ষেপ সফল করতে প্রযুক্তিসহ নানাভাবে সহযোগিতা করছে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ। জঙ্গীবাদ নির্মূলে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সামর্থ্য বর্তমানে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। নতুন বছরে জঙ্গীবাদ নির্মূলে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে সাইবার ল্যাবরেটরি। আগামী এক শ’ বছরেও বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ বিস্তারের নামে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালুর ন্যূনতম কোন সম্ভবনা নেই বলে সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে।

জঙ্গীবাদ নির্মূলে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে দেশব্যাপী চলমান সাঁড়াশি অভিযানে ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দুটি জেএমবির বিস্ফোরক তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হয়েছে। গাজীপুরে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে শীর্ষ দুই জেএমবি নেতার মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী যুগপৎ বোমা হামলা হামলার আসামি ছিল। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে অস্ত্র-গোলাবারুদ। অভিযানের পাশাপাশি জঙ্গীবাদের নেপথ্য কারিগর থেকে শুরু করে অর্থায়ন, সকল বিষয়ের ওপর বাড়তি নজরদারি চলছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বল্পপরিসরে বিস্তার ঘটা জঙ্গীবাদের রাশ টেনে ধরতে স্থাপন করা হয়েছে সাইবার ল্যাবরেটরি। বিশ্বের কয়েকটি দেশ জঙ্গীবাদ নির্মূলে বাংলাদেশকে উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সকল স্তরে জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচার চলছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির সূত্র ধরে দেশে ব্লগার হত্যা শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ডাকা টানা প্রায় তিন মাসের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচীর আড়ালে শুরু হয় ব্যাপক নাশকতা। এমন নাশকতা চালিয়েও সরকারকে টলাতে ব্যর্থ হয় বিশদলীয় জোট। শুরু করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের আদলে নাশকতা। দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখতে একের পর এক ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, পুলিশ হত্যা করা হয়। তাতেও কোন কাজ না হলে মসজিদ, মন্দিরসহ ধর্র্মীয় উপাসনালয়ে হামলা শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় বগুড়ায় শিয়া মসজিদে গুলি চালিয়ে খাদেম হত্যা, চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর মসজিদে বোমা হামলা, রাজশাহীর বাগমারায় মসজিদে হামলা, দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় কান্তজিউ মন্দির ও ইসকন মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাঁড়াশি অভিযানের মুখে মিরপুর থেকে ১৬টি হ্যান্ডগ্রেনেড ও ২শ’ হ্যান্ডগ্রেনেড তৈরির সরঞ্জামসহ শীর্ষ তিন জেএমবি জঙ্গী গ্রেফতার হয়। চট্টগ্রামে জেএমবির কারখানা থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ। সর্বশেষ গাজীপুরে আবিষ্কৃত হয় জেএমবির একটি অস্ত্র-গোলাবারুদ তৈরির কারখানা। কারখানায় অভিযানকালে জেএমবি সদস্যরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা চালায়। এ সময় র‌্যাব গুলি চালালে মিনহাজ ও মাহবুবুল আলম নামে দুই জেএমবি সদস্য নিহত হয়। নিহতরা ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় (মুন্সীগঞ্জ বাদে) যুগপৎ বোমা হামলার আসামি ছিল।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গীবাদ নির্মূলে সরকারের প্রতিটি বিভাগ কাজ করছে। বিশেষ করে সকল বাহিনীর তরফ থেকে গঠিত বিশেষ ইউনিট কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের ভবিষ্যত নিয়েও বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা ও অনুসন্ধান চলছে।

তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ১৭ থেকে ১৯ নবেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামের হ্যানয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধবিষয়ক এক বিশেষ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল জঙ্গীবাদ। সভায় অস্ট্রেলিয়া, জাপান, হংকং, আফগানিস্তান, ম্যাকাও, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, পাপুয়া নিউগিনি, ব্রুনাই, দারুসসালামসহ বহু দেশের সরকারী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কোন প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলেও দেশ দুটির সরকারের তরফ থেকে দেয়া লিখিত বক্তব্য সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় পাকিস্তানের কোন প্রতিনিধি ছিলেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারা দুনিয়ায় জঙ্গীবাদবিষয়ক পর্যালোচনাকারী সংস্থাগুলোর সামনে যার যার দেশের জঙ্গীবাদের বর্তমান পরিস্থিতির সার্বিক ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। এরমধ্যে জঙ্গীবাদ বিষয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে রয়েছে আফগানিস্তান। আফগানিস্তান তাদের দেশের তালেবান জঙ্গীদের পুনর্বাসন করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে আফগানিস্তানের এমন উদ্যোগ পাকিস্তানের কারণে অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া জঙ্গীবাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সভায় প্রকাশ পায়।

সভার তরফ থেকে বাংলাদেশে আল কায়েদা বা আইএসের মতো কোন আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠীর তৎপরতা আছে কি-না সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এমনকি এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়াদিও তুলে ধরতে বলা হয়। সভায় বাংলাদেশের তরফ থেকে দীর্ঘ ১৫ বছরের অনুসন্ধানী বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদবিষয়ক বিভিন্ন বিষয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে কোন আন্তর্জাতিক জঙ্গীগোষ্ঠীর তৎপরতা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের ছত্রছায়ায় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনগুলোর মধ্যে জেএমবি, হুজি ও হিযবুত তাহ্রীরের তৎপরতা রয়েছে। তাও সীমিত আকারে। এই তিনটি জঙ্গী সংগঠনের নেপথ্য কারিগর স্বাধীনতাবিরোধীরা। তারা নিজেদের স্বার্থে ছোট ছোট এসব জঙ্গীগোষ্ঠীকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। এরমধ্যে জেএমবি অপেক্ষাকৃত কিছুটা বেশি সক্রিয়।

জেএমবি নিজেরাই চাঁদা দিয়ে তাদের তহবিল গঠন করে থাকে। তহবিলে অর্থের পরিমাণ বাড়াতে মাঝেমধ্যে তারা ছিনতাই, ব্যাংক ডাকাতিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা- চালানোর চেষ্টা করে। তবে জেএমবির সকল অপচেষ্টা সফল হয় না। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশ। তবে বাংলাদেশের মানুষ জঙ্গীবাদে বিশ্বাস করে না। যদিও ধর্মের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা-ভক্তি আছে। দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ ইসলামী আইন বাস্তবায়নের পক্ষে। তবে তা জঙ্গীবাদ বা রক্তাক্ত সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে বাস্তবায়িত হওয়ার পক্ষে নয়। দেশের জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোকে বিদেশে থাকা কোন ব্যক্তি বা জঙ্গী অর্থায়ন করে থাকে। তবে মোটাদাগে কোন দেশ বা আন্তর্জাতিক কোন জঙ্গীগোষ্ঠী বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা করার তেমন নজির নেই। যেসব আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে বাংলাদেশে জঙ্গী অর্থায়ন করার অভিযোগ রয়েছে, সেসব এনজিওর বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। অনেক এনজিও বন্ধ হয়ে গেছে। সভায় জানানো হয়, আগামী এক শ’ বছরেও বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ বিস্তার ঘটার কোন সম্ভাবনা আছে বলে সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে মনে হয়নি।

সম্প্রতি পাকিস্তানের ঢাকা দূতাবাসের মহিলা গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদের বাংলাদেশে জঙ্গী তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়ে অর্থায়ন করার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জঙ্গী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে থাকা বাংলাদেশী জঙ্গীরা দেশ দুটির বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে অর্থায়ন করার বিষয়ে তথ্য রয়েছে। সভা শেষে জাপানের তরফ থেকে বাংলাদেশে জঙ্গী তৎপরতা রোধে সকল ধরনের সহযোগিতা করার বিষয়টি অবহিত করা হয়।

পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ নির্মূলে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। এছাড়া জাপান ও ভারত সরকার বাংলাদেশকে অকল্পনীয় সহযোগিতা করে যাচ্ছে। জঙ্গীবাদ নির্মূলে বাংলাদেশ সরকারের প্রযুক্তিগত সামর্থ্য এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রয়েছে। এত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও নেই। সেসব প্রযুক্তির কল্যাণে একের পর এক অভিযান চলছে। গ্রেফতার হচ্ছে জঙ্গীরা। আবিষ্কৃত হচ্ছে জঙ্গী আস্তানা। গত পাঁচ বছর ধরে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি আসছে বাংলাদেশে, যার অধিকাংশই সরবরাহ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারতসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে ঢাকায় একটি সাইবার ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। ল্যাবরেটরিটি অনেক দিন ধরেই জঙ্গীবাদবিষয়ক কাজ করে যাচ্ছে। তবে নতুন বছরে ল্যাবরেটরিটির আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হচ্ছে। এজন্য অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। যদিও সেসব যন্ত্রপাতি সম্পর্কে কোন তথ্যই জনসমক্ষে প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে এবং মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশ থেকে জঙ্গীবাদ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব। আগামী এক শ’ বছরেও বাংলাদেশে ধর্মের নামে জঙ্গীবাদ বিস্তার করে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভবপর করে তুলতে পারবে না জঙ্গী ও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো।

সোমবার কেবিনেট বৈঠকেও সরকারের সব মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের জঙ্গীবাদের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।