২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবার ভোট থেকে সরব না ॥ খালেদা জিয়া

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পৌর নির্বাচনকেও প্রহসনে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন, সরকারী দলের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে এবং সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আবারও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেছি। সোমবার বিকেলে গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, অসৎ উদ্দেশ্যেই পৌর নির্বাচনে প্রশাসন ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে তারা নির্বাচনী ফলাফল ছিনতাই করে দেশে-বিদেশে নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখাতে চায়।

দেশের গণতন্ত্র লুণ্ঠিত হয়েছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অংশ হিসেবে বিএনপি ভোটযুদ্ধে থাকছে। দেশবাসীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, শাসক দল নির্বাচনের ওপর অশুভ প্রভাব বিস্তারের যে পরিকল্পনা করেছে তা শান্তিপূর্ণ পন্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ান। আসন্ন পৌর মেয়র নির্বাচনে আমাদের মনোনীত প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। আপনাদের অধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন। এদিকে সোমবার রাতে দলীয় আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়া বলেন, আমি বিদেশে অবস্থানকালে দেশে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও বিক্ষিপ্তভাবে ঘটে চলেছে। বিদেশীরা আক্রান্ত হচ্ছে। ভিন্নমতের মানুষের ওপর সশস্ত্র চোরাগোপ্তা হামলা চলছে। ধর্মীয় সমাবেশ, মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় আক্রান্ত হচ্ছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরেও ঘটছে বোমা হামলার মতো সন্ত্রাসী ঘটনা। এসবের পেছনে কারা জড়িত তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরস্পরবিরোধী নানামুখী বক্তব্য আসছে। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদের শাসনকালে দেশে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছিল। কিন্তু তারা সেই জঙ্গীদের দমন না করে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপিয়ে নির্যাতন চালাবার পথ বেছে নিয়েছিল। আমরা পরবর্তীকালে সেই জঙ্গীবাদকে সাফল্যের সঙ্গে দমন করতে পেরেছিলাম। দেশে বিলুপ্তপ্রায় জঙ্গীবাদীরা এখন আবার নতুন শক্তিতে সংগঠিত হয়েছে কিনা এবং তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে সবখানে সংশয় ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের বিপদকে সম্মিলিতভাবে এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে। চারদিকের অশুভ আলামত ও বিপজ্জনক সব হামলার ঘটনার ব্যাপারে আমি সকলকে সতর্ক ও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশে যাতে কোনভাবেই নৈরাজ্যকর নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে আমি সকলকে নজর রাখতে বলব।

খালেদা জিয়া বলেন, ৩০ ডিসেম্বর দেশে ২৩৪টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ হবে। নির্বাচনী প্রচার শেষপর্যায়ে রয়েছে। এ নির্বাচনটি খুবই তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করা হয়েছে। রেওয়াজ থাকা সত্ত্বেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোন আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। অথচ এবারের মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দলীয় ভিত্তিতে। জাতীয় নির্বাচনের দলীয় প্রতীক স্থানীয় এ নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের দেয়া হয়েছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা পৌর নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় মাত্র ১০ দিন পিছিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু খোঁড়া যুক্তি তুলে নির্বাচন কমিশন তা মানেনি।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ব্যাপারেও নির্বাচন কমিশন অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর মধেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আসন্ন পৌর নির্বাচনকেও প্রহসনে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। বিরোধী দলের অফিস ও প্রার্থীর ওপর হামলা, সমর্থকদের হত্যা, প্রচারণায় বাধা দেয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, গ্রেফতার ও হুমকি চরম আকার ধারণ করেছে। বিরোধী দল সমর্থক ভোটার ও সম্ভাব্য এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। সন্ত্রাসী ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যকে এ অপকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারী দলের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে এবং সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ভোটকেন্দ্র দখলের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। শাসক দলের মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনী আচরণবিধি বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন করে চলছেন। এর কিছু কিছু খবর সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলেও মামুলি কারণ দর্শানো নোটিস এবং তারপর লোক দেখানো দুঃখ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন দায় সারছে। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীনদের আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মাধ্যমে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিজেদের অসহায়ত্ব ও অক্ষমতাই প্রকাশ করেছে।

খালেদা জিয়া বলেন, চাপ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অনেক জায়গায় বিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি এবং প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ৭ জন মেয়র ও ১৩২ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান অদ্ভুত সরকারের তথাকথিত বিরোধী দলের এক নেতা, যিনি আবার প্রধানমন্ত্রীরও দূত; তিনি বলেছেন যে, ভোটের দিন সকাল নয়টার মধ্যেই ভোট শেষ হয়ে যাবে। এক মন্ত্রীও বলেছেন যে, ভোট হওয়ার আগেই নাকি বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে। এসব কথা থেকেই সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পৌর নির্বাচনকে কী ধরনের প্রহসনে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেছি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ দাবি নাকচ করে বলা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো পরিস্থিতি নাকি সৃষ্টি হয়নি। আমরা জানি না, আর কত ভয়াবহ অবস্থা হলে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করবেন। আমরা জানি না, নির্বাচনী দায়িত্বে জাতীয় সশস্ত্রবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের এত অনীহার কারণ কী? সকলেই এ বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, আমাদের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে আমরা আবারও পৌর নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানাচ্ছি। নিজ উদ্যোগেই এ কাজটি করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তারা যদি একটি স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তাহলেই আসন্ন পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হতে পারে। আর তা হলেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পেতে পারে।

খালেদা জিয়া বলেন, পৌর নির্বাচনে এবারই প্রথম মেয়রপদে দলীয় প্রতীকে কিন্তু নির্বাচনটি পরিপূর্ণভাবে দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে না। কারণ কাউন্সিলর প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারছেন না। একটা জগাখিচুড়ি ব্যবস্থায় নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, এর পেছনে সরকারের ঘোর দূরভিসন্ধি রয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। কারণ জাতীয় দাবি ছিল নির্বাচনটি হতে হবে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়। সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন রাজনৈতিক সঙ্কট। সেই সঙ্কটের মধ্যেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জিত এবং ভোটারবিহীন সেই তথাকথিত নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদায়ী সংসদ বহাল রেখেই। কলঙ্কিত সেই নির্বাচনের পর গঠিত সংসদের তথাকথিত বিরোধী দলটিও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরকারেরও অংশ হয়ে আছে। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা কোনক্রমেই গণতন্ত্র নয়। এই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে ক্ষমতাসীন সরকারের নৈতিক বৈধতার সঙ্কট রয়ে গেছে। এই সঙ্কট কাটাতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় ব্যবস্থার অধীনে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। খালেদা জিয়া বলেন, দলীয়ভিত্তিতে পৌর মেয়র নির্বাচন করার ব্যবস্থা সরকার করেছে সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের দূরাশা নিয়ে। তারা এ নির্বাচনে সকল রকম অনিয়মের মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দিয়ে দেশবাসী এবং পৃথিবীকে দেখাতে চায় যে, তাদেরও জনপ্রিয়তা আছে। সেই অসৎ উদ্দেশ্যেই আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রশাসন ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে তারা নির্বাচনী ফলাফল ছিনতাই করতে চায়।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, আপনারা দেখেছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা ন্যক্কারজনকভাবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরকার সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনকে তারা আবারও হুন্ডা-ডা-া-গু-ার নির্বাচনে পরিণত করেছে। এবার পৌর নির্বাচনেও তার পুনরাবৃত্তির পাঁয়তারা চলছে। দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা সবাই মিলে দলে দলে ব্যাপক সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে হাজির হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের ভোটের মর্যাদা রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। যারা আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, যারা আপনাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপকৌশলে সরিয়ে দিয়েছে, তাদের ভোট চাইবার কোন অধিকার নেই। জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তি যে কোন স্বৈরশাসকের অসৎ উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরাও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী যুদ্ধে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

খালেদা জিয়া বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করে আসছে বিএনপি। ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। এসব নির্বাচনকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়ে শাসক দল বলেছে যে, তারা নির্বাচনে কারচুপি করে না। সেই সময় সরকার দেখাতে চেয়েছিল যে, তাদের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী দল যেন ৫ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল দেখে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়। কিন্তু তাদের সেই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়েছে। ৫টি সিটি কর্পোরেশনে জনগণের নির্বাচিত ৫ জন মেয়রকেই সরকার বরখাস্ত করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে অনেক নির্বাচিত বিরোধীদলীয় পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে তাদের গণতন্ত্রবিরোধী চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আপনারা শাসক দলের সন্ত্রাস, দখলদারী ও ন্যক্কারজনক কারচুপির চিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এবং পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে তুলে ধরেছেন। এবার সাংবাদিকরা যাতে নির্বাচন চলাকালে তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তার জন্য নানা ধরনের অপচেষ্টা চলছে। ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। সাংবাদিকদের অনুমতিপত্র দেয়ার ব্যাপারেও সরকারী দলের নেতাদের গোপনে মতামত নেয়া হচ্ছে। এই সরকার বিকল্প মিডিয়ার ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক মিডিয়া ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপরও খবরদারি করছে। এ নির্বাচনে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমরা একটি বিজ্ঞাপনচিত্র প্রচার করতে চেয়েছিলাম। সরকারের পরোক্ষ চাপের কারণে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সে বিজ্ঞাপনটি প্রচারেও রাজি হয়নি। এসব ঘটনায় সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ আরও ন্যক্কারজনকভাবে ফুটে উঠেছে। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা বিশ্বাস করি, এবারের পৌর নির্বাচনে আপনারা আগের মতোই সাহসের সঙ্গে সত্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকবেন।

খালেদা জিয়া বলেন, প্রায় প্রতিদিনই সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য বিরোধী দল ও ভিন্নমতকে ধ্বংস করে কার্যত বাকশালের মতো একদলীয় শাসন পাকাপোক্ত করা। বর্তমান সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতির ফলে আমাদের বহু নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। অনেকে গুম হয়েছেন। তাদের স্বজনরা, মায়েরা ও বোনেরা গুম হয়ে যাওয়া সন্তান ও ভাইদের ছবি বুকে ধারণ করে আহাজারি করছেন। আমরা বিশ্বাস করি, বীরের এই রক্তস্রোত, মায়ের এই অশ্রুধারা কখনও বৃথা যাবে না। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্ধগতির ফলে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ মুখথুবড়ে পড়েছে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের নামে চলেছে লুঠপাঠের মহোৎসব। ব্যাংকিং খাত অচল হয়ে পড়ছে সীমাহীন দুর্নীতিতে। শেয়ারবাজারে অবাধ লুণ্ঠনে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য পরিবার। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা ও স্বাধীনতার প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে। বিজয়ের এই মাসে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই দেশের জনগণের কাক্সিক্ষত মুক্তি অর্জন সম্ভব। এ বিশ্বাস থেকে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বারবার লড়াই-সংগ্রামের পথে অর্জন করেছি গণতন্ত্র। আজ আবার আমাদের গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার এক কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত হতে হয়েছে। সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেই আমরা আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছি। প্রিয় দেশবাসীকে আসন্ন ইংরেজী নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে আমি প্রথমেই স্বাধীনতা যুদ্ধের অমর শহীদদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জানাচ্ছি অভিবাদন। অনেক দিন পর দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু কথা বলার জন্য আজকের এ আয়োজন। চিকিৎসার জন্য দুই মাস আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বর্তমানে আপনাদের ও দেশবাসীর দোয়ায় আল্লাহ্র রহমতে অনেকটাই সুস্থ আছি। লন্ডনে আমার পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছি। এটি আমার জন্য ছিল একদিকে পরম আনন্দের, অন্যদিকে গভীর বেদনার। আমার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চিরতরে চলে গেছে। আমি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, তারা কোকোর শেষযাত্রায় বিপুলভাবে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে দেশবাসী জানিয়ে দিয়েছে যে, শত অপপ্রচার সত্ত্বেও তারা আমাদের ভুল বোঝেনি। এই নীরব ভালবাসা সক্রিয় সমর্থনে পরিণত হলে কোন নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদীর পক্ষেই ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল যে, আমি আদৌ দেশে ফিরব না। আমি বরাবরই বলেছি যে, দেশের বাইরে আমার কোন ঠিকানা নেই। বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। যতদিন বাইরে ছিলাম প্রতি মুহূর্তেই ভাবনায় ছিল দেশ। মনে পড়ত নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত দেশবাসীর কথা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি, কখন দেশে ফিরব।

সংবাদ সম্মেলনে দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, আ স ম হান্নান শাহ, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুল হালিম, বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মজিবুর রহমান পেশোয়ারী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান সোহেল, বিশেষ সহকারী এ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্রমুখ।

বিএনপি পৌর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে -ফখরুল ॥ বিএনপি পৌর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সারাদেশে পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার সমর্থকরা বিএনপি প্রার্থীর ওপর হামলা করছে। ৬ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে জয় ছিনিয়ে নিতে এসব করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। উন্নয়নের নামে লুটপাট করছে। দেশের জনগণ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রয়েছে। কৃষকরা আজ অসহায়। ধানের দাম বাড়ছে না। একমাত্র জিয়াউর রহমানই কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করেছেন। কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।