২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সামরিক বাহিনীর মতো পোশাকে কর্মকাণ্ড চালানোর পরিকল্পনা!

  • জেএমবির নয়া কৌশল

হাসান নাসির ॥ সামরিক পোশাকে সজ্জিত হতে চায় জামা’আতুল মুজাহিদীন (জেএমবি)! তবে কি জঙ্গী এই সংগঠনটির সক্ষমতা ওই পর্যায়ে উপনীত হয়ে গেছে? গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অতটা শক্তি ওরা এখনও সঞ্চয় করতে পারেনি। কিন্তু প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে তাদের আস্তানা থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের পাশাপাশি নানান ধরনের সামরিক সরঞ্জাম মেলার পর। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার একটি আস্তানা থেকে উদ্ধার হলো বারো সেট সামরিক পোশাক। এতে করে সামরিক বাহিনীর পোশাকের মতো পোশাক পরে কর্মকা- চালাবার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যে এই দলটির রয়েছে সেই আলামতই পরিষ্কার হয়েছে।

জঙ্গী আস্তানা থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সেখানে সামরিক পোশাকের বিষয়টি প্রশ্নের উদ্রেক করে। এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের দুর্গম লটমনি পাহাড়ের একটি আস্তানায় পরিচালিত র‌্যাবের অভিযানেও উদ্ধার হয়েছিল বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম। এর মধ্যে ছিল ১৪ জোড়া জঙ্গল বুট, দুই জোড়া আর্মি বুট, চার জোড়া পিটি সু এবং ৩৮ জোড়া প্রশিক্ষণের পোশাক। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে চালানো অভিযানে এমন আরও সামগ্রী পাওয়া গেছে।

জেএমবি আস্তানায় সামরিক পোশাক কেন এবং কী ভাবে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন গোয়েন্দারা। বিশেষায়িত এই পোশাক বাজারে সচরাচর কিনতে পাওয়া যায় না। তবে কি যে কেউ ইচ্ছে করলেই কোন দর্জির দোকান থেকে বানিয়ে নিতে পারে? উদ্ভূত অবস্থায় এর ওপর নজরদারি থাকা উচিত বলে মনে করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, হাটহাজারীর আস্তানা থেকে গ্রেফতার জঙ্গীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানবার চেষ্টা করছি সামরিক পোশাক ও মেজর পদমর্যাদার র‌্যাংক ব্যাজের উৎস সম্পর্কে। সরকারী কোন বাহিনীর পোশাক এতটা সহজলভ্য হওয়া উচিত নয় বলে অভিমত এই পুলিশ কর্মকর্তার। কারণ এতে করে জঙ্গী কর্মকা- ছাড়াও এই পোশাক ব্যবহারে নানাভাবে প্রতারণামূলক কর্মকা-ও চলছে। জঙ্গীরা নিজেদের কোন বাহিনীর আদলে গড়ে তুলছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, ওরা হয়ত বা নিজেদের কোন আদর্শের বাহিনী হিসেবে ভাবছে, তবে তাদের শক্তি মোটেও ওই পর্যায়ে নয়।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর জঙ্গী আস্তানায় সামরিক বাহিনীর বিশেষায়িত পোশাকসদৃশ ইউনিফর্মের পাশাপাশি র‌্যাঙ্ক ব্যাজও মিলছে। আস্তানা থেকে উদ্ধার হয়েছে মেজর পদমর্যাদার এক জোড়া র‌্যাঙ্ক ব্যাজ। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন- তবে কি তারা ইতোমধ্যে র‌্যাঙ্কও ঠিক করে নিয়েছে?

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আফগান-পাকিস্তানের মতো জঙ্গী তৎপরতা চালাবার শক্তি তাদের নেই বলে বদ্ধমূল ধারণা বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু তারপরও বিশেষায়িত পোশাক ও সরঞ্জাম উদ্ধার হতে থাকায় জঙ্গীগোষ্ঠীর সামর্থ্যরে বিষয়টি কম-বেশি আলোচিত হচ্ছে।

জঙ্গীরা সামরিক পোশাক সংগ্রহ করছে কী ভাবে তা নিয়েও রয়েছে আলোচনা ও বিশ্লেষণ। হাটহাজারীর জঙ্গী আস্তানা থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় আটক জঙ্গীদেরও এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে তাদের সামরিক কমান্ডার ফারদিনকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের পর। এ কথা জানালেন পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা।

জঙ্গীদের শক্তি-সামর্থ্য প্রকৃতপক্ষে কতটুকু তা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ থাকলেও তাদের আস্তানায় পুলিশ, সেনাবাহিনী বা সরকারী যে কোন বাহিনীর পোশাক মিলতে থাকায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে যে, তারা নিজেদের সেই রূপেই দেখতে চায়। আর সে কারণেই পোশাকধারী বাহিনী হওয়ার এই আগ্রহ।

সরকারী বাহিনীর পোশাক কিভাবে আসছে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একটি সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ইউনিফর্মগুলো বিশেষ বিশেষ বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত হলেও বাইরের লোকদের পক্ষে তা যোগাড় করা খুব বেশি কষ্টসাধ্য নয়। বিশেষ করে প্রধানত এগুলো আসে সরকারী বাহিনীর কাপড় সরবরাহকারী ঠিকাদারদের কাছ থেকে। কোন বাহিনীর চাহিদা অনুযায়ী প্রিন্ট করা কাপড় সরবরাহ করার পর বেঁচে যাওয়া কাপড়গুলো ছেড়ে দেয়া হয় খোলা বাজারে। এ কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয় পোশাক। এছাড়া বাহিনীর সদস্যদের অনেকেরই তিন/চার সেট করে ড্রেস থাকে। এর মধ্যে কিছু ড্রেস পরিত্যক্ত হয়। তাছাড়া পুরনো কাপড়ের দোকানে সীমিত আকারে হলেও সরকারী বাহিনীর ইউনিফর্ম পাওয়া যায়। তবে জঙ্গী আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া পোশাকগুলোর বেশিরভাগই পুরনোই হয়ে থাকে।

গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনিও স্বীকার করেন যে, অস্ত্রশস্ত্রের সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাহিনীর সদস্যরা খুবই কঠোরতা অবলম্বন করলেও পোশাক, বুটসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামের ক্ষেত্রে অতটা সতর্কতা অবলম্বন করা হয়ে উঠে না। তিনি জোরালোভাবে বলেন যে, বাহিনী থেকে কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বের হওয়া সম্ভব নয়। কারণ এক্ষেত্রে সকলেই অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সদাসতর্ক। তবে অনেকেই পরিত্যক্ত ইউনিফর্ম বিষয়ে অত্যন্ত সরল দৃষ্টিকোণ থেকেই উদাসীন। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামরিক, আধা সামরিক, পুলিশসহ সকল বাহিনীর সদস্যদের তাদের বাড়তি ও পরিত্যক্ত পোশাকের ব্যাপারেও সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ যত্রতত্র সরকারী বাহিনীর পোশাক পাওয়া গেলে এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও সুনাম ক্ষুণœ হয়।