২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে আপ্লুত বাবা ডুকরে বললেন, মাগো...

হারানো মেয়েকে ফিরে পেয়ে আপ্লুত বাবা ডুকরে বললেন, মাগো...
  • ৩৪ বছর পর দেখা...

সমুদ্র হক ॥ জন্মের পর এই প্রথম অপার স্নেহের মেয়ে শেষ পর্যন্ত দেখা পেল বাবাকে। ততদিনে বাবার রুগ্ন দেহ অশীতিপর বৃদ্ধের তালিকায় উঠেছে। কর্মের একটি হাত আর সচল নেই। জন্মের প্রায় তিন যুগ পর মেয়ের দেখা পেয়ে মনের শক্তিতে ‘মাগো’ বলে ডেকে ডুকরে কেঁদে জানান দিল মমতাময় বাবার স্নেহ কতটা। জীবনের একটি ভুলের খেসারত বহু বছর পর দিতে হলো এভাবেই। ভাববেন না এটি কোন সিনেমার দৃশ্য। মানুষের জীবনের এক গল্প। সেক্সপিয়রের কথায়- পৃথিবী একটি রঙ্গমঞ্চ আমরা সকলেই অভিনয় শিল্পী। কঠিন বাস্তবতার জীবনের এ গল্পের বাবা আবুল হোসেন (৭৮), মেয়ে নাসরিন আক্তার (৩৪)।

নাসরিন আক্তার বর্তমানে ঢাকার খিলগাঁ সিপাইবাগে থাকেন। স্বামী মিরাজ ভূঁইয়া একটি ব্যাংকে কর্মরত। তাদের দুই ছেলেমেয়ে। নাসরিনের বয়স যখন মাত্র ছ’মাস তখন তার বাবা আবুল হোসেন ১৯৮২ সালে ঢাকা থেকে বগুড়ার সুখানপুকুরের শিহিপুর গ্রামে বাড়িতে আসেন। মা নাজমা বেগম মেয়ে নাসরিনকে নিয়ে ঢাকাতেই থাকেন। আবুল হোসেন রাজমিস্ত্রী। সে ঢাকায় নয়াপল্টনে পুলিশের এক দারোগার বাড়ি নির্মাণের কাজ করার সময় সেই বাড়ির কাজের বুয়া নাজমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মূলত দারোগাই বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বিয়ের বছর চারেক পর ১৯৮২ সালে জন্ম নেয় নাসরিন। মেয়ের ছ’মাস বয়সে আবুল হোসেন স্ত্রী কন্যাকে রেখে বগুড়ায় যান।

বছর দুয়েক পর ঢাকায় ফিরে গিয়ে দেখেন তার স্ত্রী ও মেয়ে যে বাড়িতে থাকার কথা সেখানে নেই। যে দারোগার বাড়িতে নির্মাণ কাজ করেছিলেন সেখানে গিয়ে খোঁজ পাওয়া তো দূরে থাক দেরিতে ফেরার জন্য যারপর নেই অকথ্য ভাষায় গালমন্দ শুনতে হয়। এরপর স্ত্রী ও মেয়েকে অনেক খুঁজেছেন। কুসংস্কারের থাবায় পড়ে ফকিরের কাছে গিয়েছেন। এক পর্যায়ে কোন দিন হয়তো মেয়েকে ফিরে পাবেন এমন আশায় দিন গুণে প্রায় বিবাগী হয়ে এক সময় বগুড়ার গ্রামে ফিরে যান।

ওদিকে রাগে ক্ষোভে অপমানে এবং অভিমানে স্ত্রী নাজমা বেগম বাবার বাড়ি পাবনার আটঘরিয়ায় কিছুকাল থেকে ফের কাজের সন্ধানে মেয়েকে নিয়ে যান ঢাকায়। এ বাড়ি ও বাড়ি ঠিকা কাজ করার পর এক পর্যায়ে কাজ জোটে গার্মেন্টসে। রোজগারের এ অর্থেই মেয়ে নাসরিনকে লেখাপড়া শেখান। এক সময়ে মেয়ে নাসরিনের বিয়ে হয় এক ব্যাংকে কর্মরত মোঃ মিরাজ ভূঁইয়ার সঙ্গে। তাদের ঘরে এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে অনিক খিলগাঁ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মেয়ে ইয়ানা এবার প্লে ক্লাসে। বড় ছেলে খিলগাঁও অঙ্কুর কেজি স্কুলে পড়ায় নাসরিনের পরিচয় হয় স্কুলের শিক্ষক জেবুন্নাহার কলির সঙ্গে। কলির কাছে প্রাইভেট পড়ে অনিক। এ কথা সে কথার মধ্যে নাসরিনের জীবানলেখ্য প্রকাশ পায় কলির কাছে। কলি তার স্বামী দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিক মীর লিয়াকতের কাছে ঘটনা বললে, বাবার বাড়ি বগুড়ায় জেনে তিনি উদ্যোগী হন।

খোঁজ খবরের পালায় নাসরিনের বাবা আবুল হোসেনের সন্ধান মেলে। বগুড়ার শিহিপুর গ্রামে আবুল হোসেনের কাছে এসে পৌঁছলে তিনি পাগলপ্রায় হয়ে যান। ভাবতেই পারেন না তার মেয়েকে ফিরে পাবেন। বিষয়টি মীর লিয়াকতের কাছে পৌঁছলে তিন যুগ পর বাবা মেয়ের মিলন ঘটাতে নাসরিনকে সঙ্গে নিয়ে ২৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাতের কোচে রওনা হন বগুড়ায় উদ্দেশে। পরের দিন সকালে লিয়াকত আলী তার স্ত্রী জেবুন্নেছা কলি ও নাসরিন শিহিপুর গ্রামে আবুল হোসেনের বাড়ির উঠানে গিয়ে পৌঁছলে এমন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা দেখে গ্রামের উপস্থিত সকলের চোখে জল গড়িয়ে পড়ে। জন্মের পর এই প্রথম বাবাকে দেখতে পেয়ে এতদিনের বেদনা, কষ্ট, যন্ত্রণা মুহূর্তেই ভুলে গিয়ে মধুরতম ‘বাবা’ ডাকে যখন জড়িয়ে ধরেন সেই বিরল দৃশ্য স্বর্গীয় অনুভূতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। বৃদ্ধ বাবার পক্ষাঘাতে অচল হাত তুলতে না পারলেও আরেক হাতে ‘মাগো’ ডাকে মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে অপার স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেন। বাবা ও মেয়ের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ চাপা পড়ে যায় ফিরে পাওয়ার আনন্দের শোরগোলে। আবুল হোসেন মেয়েকে ফিরে পেয়ে বলেন ‘আজকাল মোবাইল ফোনে (স্মার্ট) তো ছবি তুলে রাখা যায়। তোর মায়ের ছবিটা একটু দেখা না মা।’ দীর্ঘদিনের অভিমানে ফুলে থাকা মেয়ে বলে ওঠে ‘আগে তোমাকে ঢাকা নিয়ে যাই সেখানেই দেখবে তাকে।’ জীবন নাটকের এ ঘটনার একটি অংশের মিলন হওয়ার পর কিছু অংশ বাকি রয়েই গেল। আবুল হোসেন শীঘ্রই ঢাকা রওনা হবেন প্রথম স্ত্রীকে দেখতে। সঙ্গে দ্বিতীয় স্ত্রী আলেয়া বেগমও যাবেন। যিনি আবুল হোসেনের সঙ্গে রয়েছেন। মেয়ে নাসরিন আনন্দের মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, এবার মা বাবার মিলন ঘটিয়ে দেবেন।