১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সৈয়দ হকের জন্মবার্ষিকীর সম্মাননা সঙ্কলন ‘জলেশ্বরীর জাদুকর’

  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রবিবার ছিল সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের আশিতম জন্মবার্ষিকী। তাঁর ৮০তম বসন্ত পূর্তির আনন্দময় মূহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রকাশিত হলো সম্মাননা সংকলন জলেশ্বরীর জাদুকর। কবির বর্ণাঢ্য জীবন ও সৃষ্টির মূল্যায়নমূলক গ্রন্থটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দুই বাংলার ১১০ জন খ্যাতিমান লেখকের লেখা। এসব লেখায় ১৭টি বিভাগের সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টিসমূহের সামগ্রিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রচনাগুলোয় উঠে এসেছে তাঁর কবিতা, ভাষাকৃতি, নাট্য পর্যালোচনা, চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত, প্রবন্ধ-নিবন্ধের বিশ্লেষণ, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত সৃষ্টিকর্মের আলোচনা, অনুবাদ, আলাপনসহ নানা বিষয়। এসবের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে কবির যাপিত জীবনের নানা সময়ের আলোকচিত্র। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন শামসুজ্জামান খান, জাকির তালুকদার ও পিয়াস মজিদ। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। সোমবার বিকেলে বইটির প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। সম্মাননা গ্রন্থের সম্পাদকম-লীর পক্ষে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিন। এছাড়াও সৈয়দ হককে নিবেদিত আলোচনায় অংশ নেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, নাট্যজন আতাউর রহমান, চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন, কথাশিল্পী আনিসুল হকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হককে জানানো হয় বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা। প্রদর্শিত হয় তাঁর জীবনী নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র। কবিকে উপহার দেয়া হয় তাঁকে নিয়ে আঁকা একটি প্রতিকৃতি।

আপন অনুভূতি প্রকাশ করে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন তাদের ভালবাসায় আমি প্লাবিত ও অভিভূত। একটি কবিতার ‘তোমাদের জন্ম হয়, তোমাদের জন্মদিন আসে, আমাদের জন্ম নেই, জন্মদিন আসে না’ চরণ দুটি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, যাদের জন্মদিন নেই, সারাজীবন তাদের কথা বলার চেষ্টা করেছি। সামান্য ও সাধারণ মানুষের কথা বলার চেষ্টা করেছি। আমার জন্মভূমিকে ভিত্তি ধরে তার সঙ্গে অন্য অনেক বিষয়কে যোগ করেছি। আশি বছর পার করেছি, এখনও দাঁড়িয়ে আছি, এটা আমার এক ধরনের অহঙ্কার। সেটা লেখায় এবং নিজের অস্তিত্বে। এখনও অনেক লেখার বীজ মাথায় আসে। কিছু শেষ করলে নতুনভাবে এসে হাজির হয়। আপনাদের সবাইকে নিয়ে সহস্র বছর বেঁচে থাকতে চাই। আমি একা নই, আপনারাও থাকবেন। মানুষ চলে গেলেও তার দীর্ঘছায়া এই মাটিতে থেকে যায়। মানুষ চলে যায়, তার কাজ থেকে যায়। মানুষ চলে যায়, তার স্বপ্ন থেকে যায়। অনাগত ভবিষ্যত ও সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যে আমি বেঁচে থাকতে চাই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি আশাবাদী, আমাকে কেউ হতাশ করতে পারেনি। অনুতাপ স্পর্শ করতে পারেনি। এই দেশ এই মানুষ এই স্বপ্ন এই মাটি থেকে যেন কখনই বিচ্যুত না হই। কখনই যেন আমাদের সন্তানদের এই মাটি থেকে বিচ্যুত না করি। শহীদদের রক্তস্নাত এই বাংলার মাটি-মানুষকে ধরেই যেন বেঁচে থাকতে পারি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্মৃতিচারণ করে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তখন আমাদের জমজমাট আড্ডা হতো মধুর ক্যান্টিনে। সে আড্ডায় কবিতাসহ সাহিত্যসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হতো। সৈয়দ হকের কীর্তির কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে নাট্য আন্দোলন। তাঁর কারণেই বিস্তৃত হয়েছে এদেশের নাট্যচর্চা। বয়স হলেও ক্রমাগত সৃজনের সুবাদে এখনও তাঁকে তরুণ মনে হয়। এটা তার চলাফেরা এবং লেখনী দুটোতেই। আমার মতো সমবয়সীদের কাছে সেটা আরও তরুণ হয়ে ধরা দেয়। যত শুভেচ্ছা একসঙ্গে নিবেদন করা যায়, তার সবটুকু আমি তাঁর কাছে সমর্পণ করলাম। আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ১৯৭৩ সালে আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় সৈয়দ শামসুল হকের। আমি একটা মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছিলাম। ওই নাটকটি দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। প্রশংসা করেছিলেন আমার অভিনয়ের। পরবর্তীতে তাঁর রচিত নুরলদীনের সারা জীবন কাব্যনাট্যে অভিনয়ের সুযোগ হয় আমার। এ নাটকে অভিনয়ের সুবাদে আমি যেন নতুন করে আবিষ্কার করলাম তাঁকে। এদেশে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া যেত না সেই বৈরী সময়ে নাটকটি লিখেছিলেন তিনি। নাটকটির অনেক সংলাপ আমার ভেতরে একটা ঘোর তৈরি করেছিল। বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তে অন্তত এক লাখবার আমি এটা আবৃত্তি ও অভিনয় করেছি। যতবারই নাটকটির সঙ্গে গিয়েছি, ততবারই নিজেকে, নিজের চরিত্রকে ও লেখককে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি। যার ভাব একদিনে বোঝা সম্ভব নয়। নাটকের আকালের এই সময়ে আরও বেশি নাটক লিখতে সৈয়দ হকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নাটকের মানুষ হিসেবে বলছি, রবীন্দ্রনাথের পর বাংলা ভাষায় এত বড় নাট্যকার জন্মেছে কি-না সন্দেহ আছে। কথা শেষে মিলনায়তন ভর্তি দর্শকদের অনুরোধে নুরলদীনের সারা জীবন থেকে কিছু অংশ পাঠ করেন আসাদুজ্জামান নূর। তাঁর ভরাট কণ্ঠের উচ্চারিত সংলাপ অভ্যাগতদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় মুগ্ধতা।

শামসুজ্জামান খান বলেন, বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সৃষ্টিশীল ও বৈচিত্র্যময় লেখক হচ্ছেন সৈয়দ শামসুল হক। মেধা আর মননের উজ্জ্বলতায় আশি বছরেও তাঁকে মনে হয় যেন ২০ কিংবা ২২ বছরের তরুণ।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ শামসুল হক আর কিছু না লিখেও শুধু ‘আমার পরিচয়’ কবিতার কারণে অমর হয়ে থাকতেন। ওই কবিতার মাধ্যমে তিনি হাজার বছরের বাংলার কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করেছেন।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বাংলা সাহিত্যকে তিনি অনেক দিয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বলতে পারব না। তবে এই জলেশ্বরীর জাদুকর গ্রন্থের পেছনে তাঁর বইয়ের যে তালিকা দেয়া হয়েছে, তা দিয়েই একটি গ্রন্থ হয়ে যায়। সাহিত্যের এমন কোন দিক নেই যা তিনি স্পর্শ করেননি। কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, স্মৃতিকথা সবকিছু লিখেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর মৌলিকতা ভাস্বর। আমি দেশ, মাটি, মা ও বাংলাভাষার দাস হয়ে থাকতে চাই। তবে তিনি বাংলাভাষার দাস নয়, বরপুত্র হিসেবে তাকে স্মরণ রাখবে বাঙালী, যুগ যুগ ধরে। আশি বছর স্পর্শ করা তাৎপর্যপূর্ণ। এই আশি বছর বৃথা যায়নি এটা তাঁকে বার বার করে বলে আশ্বস্ত করতে চাই। সৃষ্টিশীলতা, তীক্ষèতা ও সচেতনা বজায় থাকুক- এই প্রত্যাশা করছি।

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, তিনি ১১৮ বছর বাঁচতে চান, কিন্তু এত বছর বাঁচলে তাঁকে চা-কফি বানিয়ে দেবে কে, ডাক্তার দেখাবে কে? তিনি ১১৬ বছর বাঁচলে তো আমাকেও বাঁচতে হবে। তাঁর মাথায় যা আছে, তা ৫০০ বছরেও শেষ হবে না। সুতরাং তাড়াতাড়ি যা করা সম্ভব তা করে গুড়বাই বলে চলে যেতে হবে।