১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশে বিনিয়োগ বেড়েছে ৮শ’ গুণ স্বাধীনতার ৪৪ বছরে

  • বিনিয়োগের পরিধি আরও বাড়াতে গঠিত হচ্ছে ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’

রহিম শেখ ॥ ১৯৭২ সালে মাত্র ৫৭৭ কোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল। এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সোয়া ৫ লাখ কোটি টাকা। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে বাংলাদেশে এই বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৮শ’ গুণ। বিদেশী বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য সম্ভাবনাময় ১৮ দেশের তালিকার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। তারপরও হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন কোন দেশে চলে গেছে বিদেশী বিনিয়োগ। এর মধ্যে অবকাঠামোগত সঙ্কটের অযুহাতে বেশ ক’বছর দেশীয় বিনিয়োগও এক জায়গায় আটকে আছে। বিনিয়োগের এই পরিধি বাড়াতে দেশের বিনিয়োগ বোর্ড ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে একীভূত করে বাংলাদেশ ‘বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে ওয়ানস্টপ সার্ভিস এক ছাদের নিচে সব সেবা দেয়া গেলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের অধীনে থাকা জমি ব্যবহারে আগামী ২ বছরের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মূলত আশির দশকে রফতানিযোগ্য তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে শিল্পায়নের নবযাত্রা শুরু হয়। ওই সময়ে দেশের চাহিদা, মানবসম্পদ, কাঁচামালের পর্যাপ্ততা, প্রযুক্তিগত দক্ষতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় শিল্প-কারখানা বাড়তে থাকে। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন উদ্যোক্তা। কর্মসংস্থানও বাড়তে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশের মোট বিনিয়োগ ছিল মাত্র ৫৭৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা প্রায় ৮শ’ গুণ বেড়ে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৩৯ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ২০০৮-২০১২ এই সময়ে সামগ্রিক বিনিয়োগ বিশেষ করে শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চিত্র ছিল লক্ষ্যণীয়। ব্যবসায়িক ব্যয় কম থাকার কারণেই মূলত এই সময়ে বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ব্যবসা করার ব্যয় অনেক কম। তাই শ্রমের মজুরি ছাড়াও গ্যাস ও বিদ্যুতের সেবামূল্যও তুলনামূলক কম। কিন্তু নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠায় গ্যাস-বিদ্যুত সংযোগ সহজলভ্য নয়; বরং নতুন সংযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের তালিকায় শেষের দিকে রয়েছে বাংলাদেশ। তাই ব্যবসা করার ব্যয় কম হলেও সুযোগ কাজে লাগছে না। এতে আশানুরূপ হারে বাড়ছে না প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই)। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত কয়েক বছর ধরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে কিছুটা মন্দাভাব বা স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

গত কয়েক বছর বিনিয়োগ স্থবিরতার পেছনে আর্থ-সামাজিক অস্থিতিশীলতাকে প্রধাণত দায়ী বলে মনে করেছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ না বাড়ার জন্য কয়েকটি বিষয়কে দায়ী করেন। এগুলো হলো গ্যাস, বিদ্যুত, জমি ও অবকাঠামোর অভাব এবং দুর্নীতির সমস্যা। এ বিষয়ে এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী জনকণ্ঠকে বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ কম আসার পেছনে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। যদিও এখন দেশে সেই পরিস্থিতি নেই, তারপরও শঙ্কা রয়েছে। সালাম মুর্শেদী বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে এবং বিনিয়োগে ওয়ানস্টপ সার্ভিস এক ছাদের নিচে সব সেবা দেয়া গেলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, জমি পাওয়া গেলে একদিকে যেমন বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে, অন্যদিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসবে দেশে।

জানা গেছে, বেসরকারীকরণ কমিশন গত ৫ বছরে পাট, বস্ত্র এবং চিনি ও খাদ্যশিল্প কর্পোরেশনের অধীনে লোকসানি ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৫১৬ একর জমি অব্যবহৃত বলে চিহ্নিত করে। এই সময়ে এক একর জমিও বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিতে পারেনি কমিশন। অথচ একই সময়ে শুধু জমির অভাবে ফেরত গেছে স্যামসাং, সনি, এ্যাডিডাসসহ আরও কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। এদিকে বেসরকারী বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনিয়োগ বোর্ড কাজ করলেও আশানরূপ বাড়েনি বেসরকারী বিনিয়োগ। অন্যদিকে বন্ধ কিংবা অলাভজনক সরকারী কল-কারখানা বেসরকারী খাতে ছেড়ে উৎপাদনে নিয়ে আসার জন্য কাজ করলেও প্রাইভেটাইজেশন কমিশন তাদের সফলতা দেখাতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় গত বছরের ১ এপ্রিল বেসরকারীকরণ কমিশন এবং বিনিয়োগ বোর্ডকে একীভূত করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় আইন ও সাংগঠনিক কাঠামোর যাচাই-বাছাই শেষে চলতি মাসের ২১ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৫’র খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, এই আইন কার্যকর হলে বিনিয়োগ বোর্ড ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশন দুটিই বিলুপ্ত হয়ে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিগ)’ প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, এই নতুন সংস্থা দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সরকারী খাতের শিল্প-কারখানার অব্যবহৃত জমি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে সহায়তা করবে। নতুন কর্তৃপক্ষের কাঠামো সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে অর্থমন্ত্রীর সমন্বয়ে সংস্থাটির ১৭ সদস্যের এক পরিচালনা পরিষদ থাকবে এবং বাণিজ্য, শিল্প, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিবর্গ এর সদস্য থাকবেন। বিডার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবেন সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং একই সঙ্গে পরিচালনা পরিষদের একজন সদস্য। এর নির্বাহী কমিটিতে নির্বাহী চেয়ারম্যান ছাড়াও সরকার কর্তৃক নিয়োজিত সর্বোচ্চ ৬ জন সদস্য থাকবে।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সংস্থাটি দেশে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারী খাতে শিল্প স্থাপন ও বিদেশী বাণিজ্য লিয়াজোঁ শাখা কার্যালয়ের নিবন্ধন পরিচালনা করবে। তবে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বেসরকারী ইপিজেড, বিএসসিআইসি ও হাইটেক পার্কের আওতাধীন বিনিয়োগ প্রস্তাব বিডার এখতিয়ারের বাইরে থাকবে। সচিব বলেন, সরকারী খাতের জমি ও শিল্প আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার। এসব সম্পদ বিক্রির সময় যথাযথ মূল্য না পাওয়া ও অন্যান্য কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি বলেন, বিডা আমদানি বন্দোবস্ত ও এনওসি ইস্যু নিষ্পত্তি এবং গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত কোন এলাকা শিল্পাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জমি অধিগ্রহণে সহায়তা করবে। সংস্থাটি জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে অব্যবহৃত জমি ও কাঠামোর তালিকা করে এর ব্যবহারের নীতিমালা তৈরি, প্লট বরাদ্দ ও হস্তান্তরের গাইডলাইন প্রণয়ন এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস ইনস্যুরিং কমিটি গঠন করবে।

জানা গেছে, বিনিয়োগ বাড়াতে বিদেশীদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে বর্তমানে অন্তত ১৭টি খাতে কর অবকাশ-সুবিধা পাচ্ছেন বিদেশীরা। বিদেশীদের মুনাফা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও বিধিবিধান শিথিল করা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে বিশ্বের ৬৬টিরও বেশি দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে অন্তত ২০টির মতো দেশ রয়েছে যাদের বিনিয়োগ আরও বাড়াতে চায় দেশগুলো। গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করতে বিদেশী উদ্যোক্তারা এখন বাংলাদেশমুখী। চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, জার্মানি, ডেনমার্ক এবং কানাডার উদ্যোক্তারা এখন ছুটে আসছেন বাংলাদেশে। বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হলে ‘গ্রিন গার্মেন্টস’ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বিদেশী উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, টেক্সটাইল, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামো, ব্যাংকিং, টেলিকমিউনিকেশনসহ আরও অনেক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরুতে বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি ছিল নেতিবাচক। জানুয়ারিতে একটি মাত্র প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি-জুন পর্যন্ত মোটামুটি ভাল অবস্থা ছিল। মার্চ-জুন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বিদেশী বিনিয়োগের প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে যৌথ ও শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগের নিবন্ধনের প্রস্তাব আসে মাত্র ১৯২ কোটি ২৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকার ৮টি শিল্পের। বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য গত মাসে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট এশিয়া।