১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ খালেদার নতুন ষড়যন্ত্র

  • অজয় দাশগুপ্ত

খালেদা জিয়ার মতো কয়েকবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি দলের নেতার মুখে এমন প্রলাপ শোনা কাম্য নয় জেনেও শুনতে হলো। সম্প্রতি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাবনা পাঠানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। গিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ ও আলোচনা সভায়। বিজয় দিবসের আলোচনা হবে হয়ত। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার নিজেদের নেতাকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করা দলের নেত্রী সেদিন আরও চমকে দিলেন মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদের সংখ্যা নিয়ে তাঁর শঙ্কা বা সন্দেহের কথা বলে। তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকাকালীন সময়ে তিনি কি এমন কিছু বলেছিলেন? তাঁর যখন দোর্দ- প্রতাপ দেশ জাতি তাঁদের কথায় উঠছে বসছে, বেচারা ইতিহাস, কলম বেয়নেট কালির আঁচড়ে বা ঘষা মাজায় পথ হারাচ্ছে, তখনও কিন্তু তিনি এনিয়ে কিছু বলেছিলেন বলে মনে পড়ে না। এখন কেন হঠাৎ করে তিরিশ লাখ নিয়ে এই সংশয় বা সন্দেহ? তিনি কি হঠাৎ করে এগুলো বলছেন, না এর পেছনে কোন দুরভিসন্ধি আছে?

বেগম জিয়ার এখন ঘোর দুঃসময়। তিনি নিজে যেমন একা তাঁর দলের অবস্থাও ত্রাহি ত্রাহি। যেদিন তিনি একথাগুলো বললেন সে ভাষণেই আগাম পরাজয়ের কথা বলে রেখেছেন। তাঁর মতে, দলীয় প্রতীকে নৌকা ও ধানের শীষে পৌর নির্বাচন করার কারণ নাকি জনগণকে দেখিয়ে দেয়া নৌকার কাছে ধানের শীষ পাত্তা পায়নি। আগাম এমন কথা বলার ভেতর যদি সত্য থাকেও না আছে দূরদর্শিতা না কোন প্রজ্ঞা। সেটা যদি জানবেনই তো বিএনপি প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে গেলেন কেন? ম্যাডাম জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছেন তার প্রায়শ্চিত্ত বা মুচলেকা হিসেবে এ নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ জ্বালাও পোড়াও যানবাহন বা জীবননাশ করেও মানুষকে প্রলুব্ধ করা যায়নি। বরং দেশের ভেতর একা ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় মোটামুটি বন্দী টাইপের সময় কাটাতে হয়েছিল। সে সময় বড় বড় নেতার কাউকে আমরা রাজপথে সাহস করে নামতে দেখিনি। মুখে ফটর ফটর করলেও তারা আসলে পিছটান দিয়েছিলেন। দু’ একজন নেতা বিদেশে বসে ভাইবারে বা মোবাইলে অন্যদের উস্কে দিয়ে নিজেরা ভাল থাকলেও বেচারা মান্না মিয়ার এখন হাড্ডি পচে পানি। গুজব আছে, খোকা মিয়া নাকি এখন আর খোকা নাই। বুদ্ধিমান হবার পর স্বউদ্যোগে মান্নাকে হাজতে পোরার পুরস্কার উপভোগ করছেন। এই হচ্ছে খালেদা জিয়ার দলের নেতাদের বর্তমান হাল। এক ব্যারিস্টার তো পুস্তক লিখে তরুণ জিয়ার ভেতরের খবর হাওয়া ভবনের চাকা পাংচার করে দিতে ব্যস্ত। সে হাওয়ার যে দুর্গন্ধ সেটাও কি বিএনপির জন্য সুখের? আরেক ব্যারিস্টার আরও নির্লজ্জ। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এদেশের রাজনীতিতে তাদের ভাষায় শহীদ জিয়ার আদর্শ বাস্তবায়নে খালেদা ম্যাডামের কোন দরকার নেই। বড় আচানক বাত। এই ব্যারিস্টারই প্রথম ব্যক্তি যিনি মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের আদর্শ বাস্তবায়নে একাই এক শ’। এমন কথা শুনে শেখ হাসিনার কি বোধোদয় জানিনা, তবে আমার ধারণা খালেদা জিয়া এদের সঙ্গে থাকতে থাকতেই পাবনার প্রতি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন।

শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার এই সন্দেহ আসলে কার অপমান? যারা জীবন দিয়েছেন তাঁদের? না যিনি তাঁদের পবিত্র রক্তের অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে অযোগ্যতার পরও এদেশে কয়েক দফায় প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন, তাঁর? যে মাটি যে পতাকা যে সঙ্গীতের ওপর ভর করে এখনও চলছেন এখনও করে খাচ্ছেন, যে ইতিহাস না থাকলে খালেদা জিয়ারা এদেশের সাধারণ গৃহবধূ তার সঙ্গে এই গাদ্দারীর আসল রহস্য কি? ধরে নিলাম তিরিশ লাখ মরেনি, তাতে বিএনপির কি লাভ? পাকিস্তানীরা এ নিয়ে তর্ক করে, করবেও কারণ তারা ছিল ঘাতক। ঘাতক কখনও খুনের দায় স্বীকার করে না। সে কারণে তাদের কাছে এ নিয়ে বিতর্ক আশা করা যায়। পাকিস্তানী রাজনীতির অন্তর্গত ধারক বিএনপি কি তবে এখন তার আসল ফর্মে আসতে চাইছে আবারও? নাকি সম্প্রতি ফাঁসিতে যাওয়া কথিত শহীদের লিস্টে ঢোকাবেন খালেদা ম্যাডাম? সংখ্যা বাড়ানোর ইচ্ছে থাকলে ঘরের মানুষকেও ঢুকিয়ে নিতে পারেন। তবে এই ছেলেমানুষী খেলা বা কথার পরিণাম শুভ হবে না।

এটা বিএনপির জন্য আরও একবার অশনি সঙ্কেতের মতো কাজ করবে। তারা তাদের অভিজ্ঞতা ঝালিয়ে নিলেই দেখতে পাবে, জামায়াত ও পাকিস্তানী লবিংয়ের পরিণামে আজ তাদের ব্যাকফুটে খেলতে হচ্ছে। নির্বাচনে আগাম পরাজয় মেনে ও টোপ বা প্রলোভন বা সময়কে গিলতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের এই দেশে হাজার ঝুট ঝামেলা থাকলেও মৌলিক চেতনার জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়নি। শাহবাগের সময় যে আন্দোলন বা স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, তার বিপরীতে পরিকল্পিতভাবে ধর্ম ও মৌলবাদের ব্যবহার টেকেনি। এমনকি ফাঁসিও রদ হয়নি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মৃত্যুর জন্য উল্লাসে বিশ্বাসী না। কিন্তু যেসব মৃত্যু আপনা থেকে অপমৃত্যু বা অন্যায়কে আলিঙ্গন করে তাদের রুখবে কে? খালেদা জিয়া আপনি তার সঙ্গে শহীদের আত্মাকে গুলিয়ে ফেলতে চাইছেন, কেন জানি মনে হচ্ছে পাকি ইন্ধন আক্রোশ আর মিত্র হারানোর বেদনায় এখন এসব বলে খোলা গরম করতে চাইছেন।

কেন আপনি আপনার শাসন আমলে শহীদের সংখ্যা নির্ধারণ করেননি? কেন লিস্ট তৈরি করেননি? কেন অজস্রবার তিরিশ লাখ শহীদের আত্মার শান্তি কামনায় মোনাজাত করেছিলেন? কেন ভাষণে বক্তৃতায় সভা-সমাবেশে এদের কথা বলে মুখে ফেনা তুলতেন? আপনি কি মিথ্যুক, না সেটা ছিল সাজানো? এ প্রশ্ন তো আজ জাতি করতেই পারে। কারণ আপনি অস্তিত্বের গোড়ায় হাত দিতে চাইছেন।

যে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী একটি শক্তিশালী দলের প্রধান, সেদেশের মৌল বিষয়ে শহীদের সংখ্যা আর আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁকে কি দেশপ্রেমিক বলা যায়? আপনাকে কে তথ্য দিয়েছে এ সংখ্যা কম বা বেশি? কারা আপনাকে দিয়ে এগুলো বলিয়ে আবার নতুন বিপদের সামনে ঠেলে দিচ্ছে? এখন কি বিএনপির এগুলো বলার সময়? নিউজে দেখলাম আধপাগলা এক বিভ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মালিক গণভবনের গেট থেকে ফেরত আসা আরেক মুক্তিযোদ্ধা নামধারী নব্য জামায়াতী ছাড়া কেউই ছিল না পাশে। তাকিয়ে দেখুন, কেউ নাই। শহীদের সংখ্যা ঠিক করার আগে নিজের দলের নেতাদের সংখ্যা ঠিক করুন ম্যাডাম।

এমন মিথ্যাচার ও দেশদ্রোহী কথাবার্তা সময় মাফ করবে না। মুক্তিযুদ্ধের অপমান আর শহীদের প্রতি অবজ্ঞা করে এদেশে কেউ টেকেনি। এ সত্য জানা না থাকলে নিজের জীবনকে একবার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখুন। জানালা খুলে শুনুন, এখনও ওরা আসবে চুপিচুপি শুনে চোখের জলে কেমন ভিজে যায় এই দেশ। এই ভেজা দেশের মানুষগুলো রক্ত ও মাটির অপমান সহ্য করতে শেখেনি। এটা না জানলে রাজনীতি এগিয়ে নেবেন কিভাবে?

শোক দিবসে জন্মদিন ছিল পলিটিক্যাল সুইসাইড। কেক কাটার বহর ছিল আত্মঘাতী হামলার মতো। আপনার একাত্তরের অবস্থান পাকপ্রীতি এখনও রহস্যময়। যে আপনি নিজে কিনা এত বিতর্কিত, সে মানুষটি আমাদের জাতীয় বীরদের অপমান করেন কিভাবে? সে সন্ধ্যায় উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা নামধারীদের জানাই ঘৃণা। বুকে এক চুল এক কণা বাংলাদেশ থাকলেও আপনারা চুপ থাকতে পারতেন না। আমরা মাতৃনিন্দা আর রক্তের গৌরবকে এভাবে অপমান করার বিপরীতে জবাবদিহিতা চাই। বিএনপি কি এর কোন উত্তর দিতে পারবে? ম্যাডাম, আপনার গোনা গুনতি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। সার্টিফিকেট নিয়েও। আমরা সব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। শুধু অনুরোধ করি আবার গুনে দেখুন, না পারলে যারা জানে তাদের সাহায্য নিতে পারেন। এতে দোষের কিছু নেই।