২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বরষ ফুরায়ে আসে ত্রাসে-সন্ত্রাসে

  • জাফর ওয়াজেদ

একুশ শতকের প্রথম দেড় দশক পেরিয়ে এসে প্রশ্ন জাগবেই, তাহলে কতদূর এগুলো বাংলাদেশ? স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পার হয়ে দেশটি আজ কোন্ পথে? পেছন পানে তাকালে স্পষ্ট হবে, সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নানা দৃশ্যপট। ১৬ কোটি মানুষের দেশে বর্ষশেষে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রশ্ন আসবে, কেমন গেল বছরটি, অর্থাৎ ২০১৫ সাল। আর একদিন পর কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্ত রেখার ওপারে, ২০১৫ সালের শেষ সূর্যাস্তের আলো কালের অতলে নিভে যাবার আগে এসব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসবেই। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় দেয়াল থেকে খসে যাবে দিন পঞ্জিকা। চিরতরে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। বাঙালী জাতি সত্যিই পার করল আরও একটি শুভাশুভ বছর। ভাল-মন্দে, ত্রাসে-সন্ত্রাসে, হরতাল-অবরোধে মানুষ হত্যার তা-ব আর অর্থনীতির সচল ও গতিশীল চাকায় অগ্রগতি, উন্নয়নের গতিধারায় মিশ্রিত বছরটি খুব শান্তি ও স্বস্তির ছিলÑ তা বলা যাবে না। শেষ সূর্যাস্তের আলোর সামনে দাঁড়িয়ে, কুয়াশার চাদর জড়িয়ে থাকা নিসর্গের দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলা যাবে, না, মোটেই ভাল কাটেনি। এই যে ভাল না কাটা, তার বিশদ বিবরণ বিবৃত হয়ে আছে সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়, টিভির ফুটেজে। বছরের ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, রাজনীতির নীতিগত আদর্শ হচ্ছে, মানুষ যেখানে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেখানে তাকে আপন অধিকারে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। কার্যত হয়ে আসছে তার উল্টো। কথিত রাজনৈতিক মানুষ কতখানি পশুবৎ আচরণ করতে পারে, তার নতুন নতুন পথ-নিত্য উন্মুক্ত করছে। এমন উদ্দামতা, বর্বরতা দেশে আগে কখনও দেখা যায়নি। বাসে পেট্রোলবোমা মেরে জীবন্ত মানুষকে দগ্ধ করে হত্যা করে ভেবেছে দেশকে অস্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বোমা হামলা করে ধর্মপ্রাণ মানুষ হত্যা, বিদেশী হত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলার মাধ্যমে নাশকতা, নৈরাজ্য, সহিংসতাকে কেন্দ্র করে চারদিকে আহাজারি, আর্তনাদ, কান্না, দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেছে বাঙালী জীবনে, ২০১৫ সালে। হত্যার এই নারকীয় আচরণ এখন আর অভাবনীয়, অকল্পনীয় নয়। দেখে দেখে হয়ত মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তা নয়। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ধ্বনিও প্রতিধ্বনিত হয়েছে সর্বত্র। রাজনীতির স্বাভাবিক পথ ছেড়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের ধারায় নাশকতার পথ বেছে নেয়া হয়েছে। যা দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপেরই নামান্তর। প্রতিহিংসার, নাশকতার আগুনে সংখ্যালঘু ও প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই হয়েছে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটগুলোয় দগ্ধ মানুষের আহাজারিতে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। নাশকতা বন্ধের দাবিতে দিনমজুর থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিল। গত জানুয়ারি থেকে এই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রথম তিন মাসের পর মাঝে মধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে ভয়াবহ দুঃসংবাদের দৃশ্যপট। বছরের শুরুতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকরে প্রতিবন্ধকতা তৈরির জন্য অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ডাকা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোটের ডাকা সেই অবরোধ অদ্যাবধি প্রত্যাহার করা হয়নি। সেই সঙ্গে হরতাল ডেকে পরিস্থিতিকে নাজুক করার শত সহস্র্র প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এমনকি ঈদ-ই-মিলাদুন্নবীর সময়ও হরতাল ডাকা হয়। এতে শুধু জনদুর্ভোগেই বাড়েনি, নাশকতার শিকার হয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। হরতাল-অবরোধের অগ্নিবোমায় অকালে প্রাণ হরিয়েছে দেড় শতাধিক নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ অনেকে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন; যা জামায়াত সৃষ্ট, সেই জেএমবিও দেশব্যাপী সন্ত্রাস, নাশকতা, নৃশংসতা, নৈরাজ্য, ধ্বংসযজ্ঞের নারকীয় পথ অবলম্বন করে। এদের অনিয়ন্ত্রিত থাবায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা। এরা শিক্ষাবিরোধী বলেই কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে নির্বিঘেœ পরীক্ষা দিতে না পারে, সেক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। পরীক্ষার ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা গেছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে আসছে এখনও। এদের গণনিষ্ঠুরতা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম। ভয়ের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে এরা এখনো তৎপর। দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল প্রত্যক্ষ। তৈরি করা হয়েছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। সহিংসতা, অরাজকতা আর নাশকতার দাপট দেখেছে এদেশের মানুষ। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ এই তিনটি বছর ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, সহিংসতা, নৃশংসতা, নির্মমতা ও রক্তাক্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে দেশবাসীকে। বিদায়ের পথে থাকা চলতি বছরটিতে জাতীয় জীবনে অর্জন থাকলেও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল অস্থির ও নানান সহিংস ঘটনায় টালমাটাল। শ্বাসরুদ্ধকর অবরোধ-হরতাল খাদের কিনারে নিয়ে গেছে বিএনপি-জামায়াত জোটকে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনি জনরোষের কারণে। তাই নাশকতার জন্য ডাকা হরতাল-অবরোধের কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি সার্বিক অর্থনীতি ও উৎপাদনে। নিত্যপণ্যের সরবরাহে বিঘœ ঘটলেও পণ্যেও দাম বাড়েনি সেভাবে। হাজার কোটি টাকার সম্পদহানি ঘটিয়েছে যদিও তারা। সহনীয় ও গণতান্ত্রিক আচরণ ছেড়ে জঙ্গীবাদী তৎপরতায় নেমে যাওয়া জোটটি স্বাভাবিক রাজনীতির পথ পরিহার করেছে। অবশ্য বছর শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যোগ দিয়ে তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই বলে জনগণ তাদের জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ভুলে যাচ্ছে, তা নয়। ক্ষমতাসীন মহাজোট কৌশলের মাধ্যমে প্রায় প্রতিকূলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবেশকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার পথ খুলে দিয়েছে তাদের জন্য। যাদের মানুষ হত্যা তথা গণহত্যা ও জঙ্গীবাদী তৎপরতার জন্যই আইনের মুখোমুখি হয়ে সাজা ভোগ করার কথা, তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে যে অনুকম্পা দেখানো হচ্ছে তাতে তাদের চারিত্রিক সংশোধন হবে কিনা সন্দেহ রয়ে যায়। আজ দেশের দুই শতাধিক পৌরসভার নির্বাচন। যে নির্বাচনে জঙ্গীবাদ সমর্থক বিএনপি-জামায়াত অংশ নিয়ে নিজেদের অতীত অপরাধকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বহুরূপীর মতো ওরা এখনও সন্ত্রাসী, জঙ্গী বেশে দেশবাসীকে প্রবঞ্চনা শুধু নয়, হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এরা এখন আর একা নয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গীদের সঙ্গে এদের গভীর সম্পর্ক ক্রমশ প্রকটিত হচ্ছে। ১৯৭১ সালের মতো গণহত্যা, লুটপাটকে প্রতিপাদ্য করে ২০১৫ সালে যা করেছে, তা জঙ্গীবাদী তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের কর্মী সমর্থকরা ক্রমশ সন্ত্রাসী জঙ্গীতে পরিণত হয়েছে। এদের নীতিবিহীন রাজনীতি মূলত রাজনীতির চরিত্রহানি ঘটিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ ছেড়ে স্বাভাবিক পথে ফিরে আসার দিগন্ত তারা ফিরে পাচ্ছে না আর।

চলতি বছরের প্রথম দিনে তথা নববর্ষের প্রথম দিনে হরতাল ডেকে বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের নাশকতার নতুন অধ্যায় শুরু করে পূর্ববর্তী দুই বছরের ধারাবাহিকতায়। দুই বিদেশী হত্যা, ধর্মযাজক হত্যা প্রচেষ্টা, একের পর এক ব্লগার ও প্রকাশক খুন, পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা, তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা, শিয়া, আহমদীয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে বোমা ফাটিয়ে হত্যা সংঘটনের ঘটনাগুলো ঘটেছে বছরের শেষভাগে। আর বছরের শুরুতে তিন জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রী গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে সরকার হটানোর আন্দোলনের নামে নাশকতা চালানোর জন্য অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা দিয়ে টানা তিন মাস অবস্থান করে। যা ঘটিয়েছেন তা গণহত্যার শামিল। গণরোষে বিএনপি জামায়াত নেতা-কর্মীরা আত্মগোপন বেছে নিলেও জঙ্গী ও সন্ত্রাসী তৎপরতা কমেনি। বছরের বিভিন্ন সময়ে সে নাশকতামূলক কর্মকা- চালিয়ে প্রচার করেছে যে, তা আইএস ঘটিয়েছে। মূলত নিজেদের অপর্কম ঢাকার ক্ষেত্রে তারা এই প্রক্রিয়া বেছে নিয়েছে বলা যায়। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেড় শতাধিক মানুষ হত্যা করেও কোন সুবিধে করতে পারেনি। জঙ্গী নেত্রীর তকমা নিয়ে বিএনপি নেত্রী ঘরে ফিরে বিশ্রামে কাটান আরও দীর্ঘসময়। কিন্তু দেশে ত্রাস-সন্ত্রাস কমেনি। চোরাগোপ্তা হামলা চালাানো হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা ভোট গ্রহণ শেষের পর্যায়ে নির্বাচন থেকে সরে এসে তা নিয়ে আন্দোলন গড়তে পারেনি; যতটা পেরেছে বোমাবাজির দিগন্ত বাড়াতে। অসফলতা আর ব্যর্থতা নিয়ে তারা বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে বিপুল অর্থব্যয়ে সরকার অপসারণ, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার লক্ষ্যে। বিদেশীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবং বাংলাদেশকে জঙ্গীবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিত করার লক্ষ্যে বেছে নেয়া হয়েছে বিদেশী হত্যা, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও তাদের উপসনালয়ে হামলার ঘটনা। ক্ষমতাসীন সরকারকে হটানো গেলে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করা যাবেÑ তাদের এই কৌশল বুমেরাং হচ্ছে বার বার। তিন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নাশকতা ২০১৫ সালেও ঘটেছে। আগামীতেও ঘটার সম্ভাবনা তিরোহিত করা যাচ্ছে না। আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্ন হবে বলে অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রায় শেষ। তাদের শাস্তি হবে শীঘ্রই। সুতরাং, ২০১৬ সালও নাশকতামুক্ত হবে দেশ, তা বলা যাচ্ছে না। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও তারা এখনও মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করছে। স্বয়ং বিএনপি নেত্রীও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরার নামান্তর।

জঙ্গীবাদ ও নাশকতার নেতৃত্বদানকারী দল বিএনপি-জামায়াত তাদের সমস্ত কর্মকা-ের জন্য পাকিস্তানী গেয়েন্দা সংস্থার সহায়তা পেয়ে আসছেন। বিএনপিকে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার জন্য আইএসআই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েছিল বলে সেদেশের সংসদে বলা হয়েছে। জঙ্গীপনা অব্যাহত রাখার জন্য তারা অর্থ ও অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ সহায়তা দিয়ে আসছে। আর তা পরিষ্কার হয়েছে চলতি বছরে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার তৎপরতায়। এদের কর্মকা- প্রকাশ হয়ে পড়ায় এরা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সাকা, মুজাহিদের ফাঁসির পূর্বাপর পাকিস্তান যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আসছে, অনুরূপ বক্তব্যে বিএনপি নেত্রী সরাসরি না দিলেও তার সব ভাষ্যই এই যুদ্ধাপরাধী রক্ষার পক্ষে। আর সে কারণেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নিয়ে বক্রোক্তি করেছেন। তার সঙ্গে তার সারিন্দারাও গলা মেলাচ্ছেন।

দেশে জেএমবি, আনসারউল্লাহ বাংলাটিম, হিযবুত তাহরীর নামক জঙ্গী সংগঠনগুলো সক্রিয়। এদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বিএনপি-জামায়াত জোট নয়। বরং এই জোটের পক্ষে, জোটের দাবি পূরণে এরা নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে। এদের অর্থভা-ার বিশাল বলেই সাধারণ স্তরের মানুষও জঙ্গীবাদে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। এরা সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ২০১৫ সালে নাশকতার যে বিষবাষ্প উদ্গীরণ হয়েছে, ২০১৬ সালে তার বিস্তার লাভ করার সম্ভাবনাকে একেবারেই ফেলে দেয়া যায় না। বরং পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পথ ধরার সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ এরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চায় না।

ইতিহাসের বাধ্যবাধকতা বলে একটা বস্তু আছে। উৎপাদন পদ্ধতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গড়ে উঠেছে মানবজাতির বিভিন্ন যুগের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক কাঠামো। মানবজাতির সামাজিক ইতিহাসে অপরিবর্তনীয় মৌলিকতা নামে কোন বস্তু কখনও ছিল না। আজকের বিশ্ব প্রকৃত প্রস্তাবে এক অবিভাজ্য বিশ্ব। শান্তিকালে তো বটেই, এমনকি যুদ্ধাকালেও এই অবিভাজ্য বিশ্বের কতগুলো অদৃশ্য আর্থ-সামাজিক আইন কানুন ও প্রথার অক্টোপাস হতে কোন দেশ, জাতি বা ধর্ম সম্প্রদায়ের মুক্ত থাকার কোন উপায় নেই। তাই দেখা গেছে, বাংলাদেশের কিছু ধর্মব্যবসায়ী পাকিস্তান যুগে যেমন, তেমনি পঁচাত্তর পরবর্তীকাল থেকে আদি ও অকৃত্রিম মৌলিকতায় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশকে পশ্চাতে নিয়ে যেতে হানাহানি, খুনোখুনি, সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। দেশবাসীকে নানাভাবে প্রতারিত ও বিভ্রান্ত করার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে।

ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার মধ্যেই অতীত স্মরণ করার সার্থকতা। পক্ষান্তরে অতীতে ফিরে গিয়ে বর্তমান সমস্যাবলী সমাধানে চেষ্টা করার নাম পশ্চাদমুখিতা। আর পশ্চাদমুখিতা মাত্রই অগণতান্ত্রিক। এই অগণতান্ত্রিক পন্থা এবং প্রবঞ্চনা ছাড়া অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না। বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশের কাছে নানা বিষয়ে রোল মডেলে পরিণত। আর এসব মেনে নিতে পারছে না জঙ্গীবাদের সমর্থক বিএনপি-জামায়াত জোট। তাই তারা দেশকে পেছনের দিকে টেনে নিতে চায়। যেখানে দুর্নীতি আর লুটপাট করে জনগণকে দারিদ্র্যসীমার নিচে রাখা যায়। আবারও ‘হাওয়া ভবন’ তৈরি করার স্বপ্ন যারা দেখছেন, তারা দেশের উন্নতি চাইতে পারে না। তাদের চলতি বছরের কর্মকা- প্রমাণ করছে, বিএনপি-জামায়াত জোট গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না এবং তারা গণতান্ত্রিকও নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষশেষ’ প্রবন্ধের অন্তর্নিহিত বাক্য উচ্চারণ করা যায় বছরের শেষ পাদে এসে। “যতো বিঘœ দূর করো, যত ভয় সরিয়ে দাও, যা কিছু ক্ষয় হবার দিকে যাচ্ছে, সব লয় করে দাও- হে পরিপূর্ণ আনন্দ, পরিপূর্ণ নতুনের জন্য আমাকে প্রস্তুত করো।” কিংবা তার বর্ষশেষ কবিতার চরণ স্মরণ এই বেলায় করা যায়- “আজি এই বৎসরের বিদায়ের শেষ আয়োজন-/ মৃত্যু, তুমি ঘুচাও গুণ্ঠন/ কত কী গিয়েছে ঝরে- জানি জানি, কত ¯েœহ প্রীতি/ নিবায়ে গিয়েছে দ্বীপ, রাখে নাই স্মৃতি।”

আর একদিন পর খ্রিষ্টীয় নববর্ষ ২০১৬ সালের সূর্যোদয় হবে। নববর্ষের এই সূচনালগ্নে বলা যায়, জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আত্মপ্রবঞ্চনা, অগণতান্ত্রিক ও পশ্চাদমুখী প্রবণতার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে শপথগ্রহণ করার কথা। বলা যায়, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও যুদ্ধাপরাধীমুক্ত উন্নয়নশীল স্বদেশ গড়ার কথা। সেই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সকল তৎপরতার হোক নাশ। ত্রাস-সন্ত্রাসের দিন যেন আর না আসে ফিরে। শক্ত হাতে তাই বাঙালীকে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ।

yafarwayed@yahoo.com

নির্বাচিত সংবাদ