১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই ঘন্টায়    
ADS

আর্থিক খাতে অর্জন অনেক

  • ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পাঁচ বছরের মূল্যায়ন

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ লক্ষ্যপূরণ হয়নি, কিন্তু তারপরও সাফল্য এসেছে অনেক। গত পাঁচ বছরে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমনই চিত্র তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। সংস্থাটির সর্বশেষ এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালীন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির দৃঢ় অবস্থান কেবল দেশের ইতিহাসেই নয় বরং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক দিক দিয়েও অত্যন্ত ভাল। ২০১১ থেকে ১৩ সালের মধ্যে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে আর্বিভূত হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশে সরকার ধারাবাহিকভাবে বাজেটে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। ২০১৫Ñ১৬ অর্থবছরে এ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্বগ্রহণকালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল পাঁচ দশমিক এক শতাংশ, যা ২০১৪Ñ১৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়। পরিকল্পনার মেয়াদে যদিও গড়ে সাত দশমিক তিন শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু গত পাঁচ বছরে ছয় দশমিক তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় এ হার আশাব্যঞ্জক।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির ও মূল্যায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাধারণত লক্ষ্যমাত্রা একটু বেশি করে ধরা হয়। ফলে কখনই সেই লক্ষ্য পূরণ হয় না। কিন্তু লক্ষ্য পূরণের জন্য যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেগুলোর ফলাফল খুবই ইতিবাচক হয়েছে। এর প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সাফল্য এসেছে, যা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিনিয়োগের হার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৪ দশমিক সাত শতাংশ থেকে ৩২ দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে বিপরীতে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদে গড়ে ২৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে। জাতীয়ভাবে সঞ্চয় ছিল গড়ে ২৯ দশমিক ৫২ শতাংশ।

দারিদ্র্য নিরসনের অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০১৫ সালের মধ্যে মাথাগুণতি দারিদ্র্য হার ২২ দশমিক পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। থানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০০০ থেকে ২০১০ সাল সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য গড়ে এক দশমিক ৭৩ শতাংশ হারে হ্রাস পেয়েছে। এ প্রবণতায় ২০১৫ সালে অনুমিত মাথাগুণতি দারিদ্র্য হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। নিঃসন্দেহে এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। অতি দারিদ্র্যবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের কারণেই দারিদ্র্য হার প্রত্যাশিত মাত্রায় কমে আসছে।

মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মাথাপিছু আয় ২০১৫ সালের মধ্যে এক হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ছয় বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু জিডিপি এবং মাথাপিছু জাতীয় আয় ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪Ñ১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপি হয়েছে এক হাজার ২৩৫ মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার।

কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রতিবছর দুই দশমিক শূন্য আট মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অর্থবছর ১১ থেকে ২০১৫ অর্থবছর সময়ের মধ্যে দুই দশমিক ৪৪ মিলিয়নেরও বেশি শ্রমিক বিদেশে যেতে পেরেছে। প্রতি এক শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফলে দুই লাখ ৫০ হাজার দেশীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয়, এ হিসেবের ওপর ভিত্তি করে বলা যায় পরিকল্পনার পাঁচ বছরে দেশে ও বিদেশে মিলে কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এ সংখ্যা লক্ষ্যমাত্রার খুবই কাছাকাছি।

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যের তুলনায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করায় এটি প্রথম দুই বছর ট্র্যাকের বাইরে ছিল। পরবর্তীতে আর্থিক নীতির সংশোধন মূল্যস্ফীতিকে ট্র্যাকে নিয়ে আসে যদিও তা (৬ দশমিক ৪১ শতাংশ) ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য ৬ শতাংশের চেয়ে বেশি। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনে আর্থিক ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে মূল্যায়ন প্রতিবদনে।

খাতভিত্তিক অবদানের ক্ষেত্রে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিল্পখাতের সম্প্রসারণ ও বহুমুখীকরণের মাধ্যমে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে জিডিপিতে কৃষি, শিল্প ও সেবার খাতভিত্তিক অবদান হবে যথাক্রমে ১৫, ৩৮ এবং ৪৭ শতাংশ। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বর্তমানে (২০১৫ সাল প্রাক্কলন) ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং বনজ সম্পদসহ জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, শিল্পখাতের অবদান ৩০ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং সেবাখাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ৬২ শতাংশে। দেখা গেছে শিল্পখাতের অবদান বিনিয়োগ স্বল্পতার কারণে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি।

শিক্ষাখাতের ক্ষেত্রে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় লক্ষ্য ছিল জিডিপির ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া। কিন্তু এর বিপরীতে অর্থবছর ২০১১ হতে ২০১৫ পর্যন্ত গড়ে এক দশমিক ৮৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রদান করা হয়। যা লক্ষ্যমাত্রা চাইতে অনেক কম। তারপরও প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বজনীন, বাধ্যতামূলক, গুনগত মান সম্পন্ন করা এবং এর সম্প্রসারণে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক মান উন্নয়ন হয়েছে। শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। ঝরে পড়ার হার হ্রাস পেয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে ভর্তির ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষার চাকরি জাতীয়করণ করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে নানা বিষয়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যখাতের নির্দেশকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। পরিকল্পনার মেয়াদে স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের ১২ শতাংশ বরাদ্দের বিপরীতে গত পাঁচ বছরে গড়ে বাজেটের পাঁচ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বরাদ্দ প্রদান করা হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অনেক কম। কিন্তু তারপরও শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তাছাড়া জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার অনেক বেড়েছে।

যোগাযোগ খাতে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। পদ্মা সেতু ও এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মাণ বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলছে। এছাড়া যোগাযোগ খাতে ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রভূত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, যা এখন বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট খাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে সরকার।