১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দক্ষিণাঞ্চলে লক্কড়ঝক্কড় ফেরি ও নাব্য সঙ্কট

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ দক্ষিণাঞ্চলের ২২টি পয়েন্টে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ৩০টি ফেরির প্রায় সবগুলোই আয়ু হারিয়েছে এক দশক আগে। এসব ফেরি পয়েন্টের ৪৫টি ঘাটে যেসব পন্টুন ও গ্যাংওয়ে রয়েছে সেগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি নদীর ভাঙ্গন ও নাব্য সঙ্কটে দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর, দুটি স্থলবন্দর ও তিনটি বিভাগের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ রক্ষাকারী চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল-খুলনা এবং মংলা মহাসড়কের ইলিশা-মজু চৌধুরীরহাট ও ভেদুরিয়া-লাহারহাট সেক্টরে যানবাহন পারাপার ব্যবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যথাযথ নজরদারির অভাবে এসব ফেরি সেক্টরে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন তো দূরের কথা, বিদ্যমান সুবিধাদিও সুষ্ঠুভাবে বণ্টন হচ্ছে না। এ অঞ্চলে সড়ক অধিদফতরের ফেরি সার্ভিস এখনও পরিপূর্ণভাবে ইজারাদারের খামখেয়ালির ওপর নির্ভরশীল। সঙ্গে রয়েছে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে তহবিল সঙ্কটসহ মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরি ও এর ইঞ্জিন। ট্রাকে মাত্রাতিরিক্ত পণ্য বোঝাইয়ে ফেরিঘাটগুলোর গ্যাংওয়ে ঘন ঘন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে প্রায়ই এ অঞ্চলে কোন না কোন ফেরি সার্ভিস বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। নদীনালাবেষ্টিত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফেরিনির্ভর দেড় হাজার কিলোমিটার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এখনও কোটি মানুষের জীবনের অর্ধেক সময় ফেরিঘাটেই কাটছে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, গত দুই দশকে এ অঞ্চলে সড়ক অধিদফতরের জেলা, আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে জোড়াতালি দিয়ে চলা ২২টি ফেরি পয়েন্টে যানবাহন পারাপার ব্যবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। সঙ্গে ইজারাদারের খামখেয়ালির কাছেও জিম্মি গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাসহ এ অঞ্চলের কোটি মানুষের নিত্য যাতায়াত ব্যবস্থা। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলের দেড় হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরি ও এর ইঞ্জিনসহ জোড়াতালি দেয়া পন্টুন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে ক্রমে বৃদ্ধি করলেও সে পরিস্থিতি উত্তরণে জোরালো উদ্যোগ নেই। তবে সম্প্রতি সড়ক অধিদফতরের পুরনো ফেরি পুনর্বাসনে প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তার আওতায় বরিশাল ও পটুয়াখালী ফেরি বিভাগের অচল ৩০টি ফেরির মধ্যে মাত্র ১৫টি পূর্ণাঙ্গ মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে চলমান ফেরি উন্নয়নসহ পরিপূর্ণ পুনর্বাসনে তেমন কোন উদ্যোগ নেই। এমনকি প্রায় এক যুগ পর সম্প্রতি পুরনো ফেরির জন্য কিছু নতুন ইঞ্জিন প্রপালশন ইউনিট ক্রয় করেছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা চাহিদার চেয়ে অপ্রতুল। এখনও ২০০৭ সালের সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলের ফেরিগুলোর পুনর্বাসন শেষ হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরনো ফেরির সঙ্গে জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে সচল ইঞ্জিন এখন আর যানবাহন পারাপার করতে পারছে না। যদিও গত দুই দশকে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেতু নির্মাণে সঙ্কট কিছুটা কমেছে, কিন্তু এখনও বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা ও বরগুনা মহাসড়কের লেবুখালী, আমতলী, পায়রা এবং বরিশাল-ঝালকাঠি-পিরোজপুর-বাগেরহাট-খুলনাসহ মংলা মহাসড়কের বেকুঠিয়া ও চরখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফেরি চলাচল করছে জোড়াতালি দিয়ে। সঙ্গে ইজারাদারের খামখেয়ালিপনা প্রতিনিয়ত হাজার হাজার যাত্রীকে জিম্মি করলেও এখানে দেশের প্রচলিত আইনও অনেক সময় অকার্যকর বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী পরিবহনচালক ও যাত্রীরা। এমনকি সড়ক অধিদফতরের পটুয়াখালী ফেরি বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদটিও দীর্ঘদিন থেকে শূন্য পড়ে রয়েছে। ফলে পটুয়াখালী ও বরগুনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ফেরি ও পন্টুনগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে।

সড়ক অধিদফতরের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ফেরিগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের অনেক ফেরি অর্ন্তভুক্তির কথা জানিয়ে ভবিষ্যতে যাতে সব পয়েন্টে ফেরি চলাচল নির্বিঘœ রাখা যায় সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

অপরদিকে চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল-খুলনা এবং মংলা মহাসড়কের বেকুঠিয়া ফেরি পয়েন্টে মাত্র দুটি ফেরি জোড়াতালি দিয়ে প্রস্তুত রাখা হলেও ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট ইজারাদার প্রতি ঘণ্টায় একটি ট্রিপে যানবাহন পারাপার করছে। সড়ক অধিদফতরের এ ফেরি পয়েন্টে সরকারী নীতিমালার তোয়াক্কা করছে না ইজারাদার। ওই একই মহাসড়কের ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী ইলিশা-মজু চৌধুরীরহাট ফেরি সেক্টরে যানবাহন পারাপার বন্ধ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে। ভোলার ইলিশা প্রান্তে ভাটি মেঘনায় কয়েক দফার ভাঙ্গনে বিআইডব্লিউটিসির নিয়ন্ত্রণাধীন ফেরি সার্ভিস দুই মাস বন্ধ ছিল। সম্প্রতি বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় তিনগুণ দূরত্বে মজু চৌধুরীরহাট থেকে সরাসরি ভেদুরিয়া পর্যন্ত ফেরি চলাচল করলেও এতে সময় লাগছে প্রায় আট ঘণ্টা। ফলে যানবাহন চালকরা এ মহাসড়ক ব্যবহার প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। তবে ইলিশাতে বিধ্বস্ত ঘাট মেরামত করে শীঘ্রই ভোলা-লক্ষ্মীপুর সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালু হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএর একটি দায়িত্বশীল মহল। এরপরও প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরত্বের দেশের দীর্ঘতম এ ফেরি সেক্টরে মাত্র দুটি কে-টাইপ ফেরির সাহায্যে যানবাহন পারাপারে বিড়ম্বনার কতটুকু অবসান হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। এমনকি মাস তিনেক আগে ভাটি মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গনে এ সেক্টরে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দিতে হলেও এরই মধ্যে নাব্য সঙ্কটে ওই রুটে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচলই হুমকির মুুখে পড়েছে। অন্যদিকে ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী ভেদুরিয়া-লাহারহাট রুটেও বিআইডব্লিউটিসির তিনটি ইউটিলিটি ফেরি মোতায়েন থাকলেও চলছে দুটি। এ নৌপথেও নাব্য সঙ্কটে ফেরি চলছে পানি মেপে।