২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে ॥ ফরমালিনের ব্যবহার আবারও বেড়ে চলেছে নীরবে

  • নিয়মিত মনিটরিং করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ;###;সঠিক পরিমাপক যন্ত্র আমদানির উদ্যোগ ;###;বিধিমালা না থাকায় আইন কার্যকর হচ্ছে না

এম শাহজাহান ॥ খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন প্রয়োগ রোধে দ্রব্যটি বিক্রয় ও অনৈতিক ব্যবহার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ লক্ষ্যে মাছ, ফলমূল, শাক-সবজি এবং দুধে ফরমালিন আছে কি-না তা যাচাইয়ে সঠিক যন্ত্র ও মেশিন আমদানির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া শিল্প খাতের বাইরে এ দ্রব্যটি এখনও খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার হচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মনিটরিং জোরদার করা হবে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ভেজালবিরোধী প্রতিষ্ঠানের অভিযান কার্যক্রম দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় রয়েছে। এতে লোকচক্ষুর অন্তরালে নীরবে ফরমালিনের ব্যবহার আবার বেড়েছে। এই বাস্তবতায় ফরমালিন নিয়ন্ত্রণে আবারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তাই নতুন বছরের শুরুতেই আগামী ৩ জানুয়ারি রবিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন প্রয়োগ রোধে উদ্ভাবনী পদক্ষেপ বিষয়ে এক সভা আহ্বান করা হয়েছে। প্রধামন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপদিত্বে ওই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এদিকে, মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত এ দ্রব্যটি নিয়ন্ত্রণে দেশে আইন রয়েছে, কিন্তু বিধিমালা অনুমোদন না হওয়ায় সেটি কার্যকর হতে পারছে না। মাছ, ফলমূল, শাক-সবজি এবং দুধে ফরমালিন আছে কি-না তা যাচাইয়ে দেশে নেই কোন সঠিক যন্ত্র ও মেশিন। এছাড়া শিল্পে ব্যবহারের জন্য শতাধিক প্রতিষ্ঠান সরকারী অনুমোদন নিয়ে দেদার আমদানি করছে ফরমালিন। অভিযোগ রয়েছে, ফরমালিন আসছে অবৈধ পথেও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে লোকচক্ষুর অন্তরালে নীরবে ফরমালিনের বিস্তার ঘটছে। জানা গেছে, ফরমালিন মাপার কোন যন্ত্র ও মেশিন দেশে নেই। এখন বাজারে যেসব মাছ, সবজি ও ফলমূল বিক্রি হচ্ছে তা ফরমালিনমুক্ত কি-না তা পরীক্ষা করা হয় না। দুই বছর আগে যখন বিষাক্ত এ দ্রব্যটি নিয়ে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে যায় তখন ‘ফরমালডিহাইড মিটার-৩০০’ দিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করা হতো। কিন্তু অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হলো, এটি ফল বা খাদ্যদ্রব্যে মেশানো ফরমালিন পরীক্ষার জন্য তৈরি করা হয়নি।

ওই সময় হাইকোর্টের দেয়া এক নির্দেশে সরকারী তিনটি সংস্থা আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ যন্ত্র দিয়ে খাদ্যদ্রব্যে ও ফলে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যায় না। এটি শুধু বাতাসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল (রাসায়নিক) আছে কি-না তা পরীক্ষা করা যায়। এরই প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত বছরের নবেম্বরে এক মাসের মধ্যে সঠিক যন্ত্র ও মেশিন সংগ্রহের জন্য খাদ্য, স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরেও সঠিক যন্ত্র আমদানি করে দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতায় মাছ ও ফলমূলসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে কি-না তা কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না। তবে শিল্পে ব্যবহারের দোহাই দিয়ে কারখানা মালিকরা দেদার ফরমালিন আমদানি করছেন।

আর তাতে সহজেই অনুমতি মিলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজনীন বেগম (আইআইটি) জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ফরমালিনের ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি না পেলে তাদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। তাই বিবেচনাসাপেক্ষে শিল্পে ব্যবহারের জন্য ফরমালিন আমদানির অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ফরমালিন মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হলেও শিল্পের জন্য অপরিহার্য। আর তাই আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়। এই ফরমালিন শিল্পের বাইরে ব্যবহার হচ্ছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি দেখার জন্য সরকারের অন্যান্য সংস্থা রয়েছে। তারা যদি এটি না দেখে তাহলে সে দায়দায়িত্ব তাদের। ফরমালিনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার আইন করেছে। আইনের বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে বিধিমালাটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আশা করছি, দ্রুত বিধিমালাটি অনুমোদন পাবে।

এদিকে, উচ্চ আদালতে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির গত বছর দেয়া পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০ নামক যন্ত্রটি ফল, মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণের জন্য তৈরি করা হয়নি। তবে এটি বাতাসে ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে কি-না তা পরীক্ষা করতে পারে। হাইকোর্টে এ প্রতিবেদন দাখিল এবং সঠিক যন্ত্র সংগ্রহের নির্দেশনার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ফল ও খাদ্যদ্রব্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল বা ফরমালিনের উপস্থিতি পরিমাপের বিষয়ে কোন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসন বাজারে অভিযান পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু ফরমালডিহাইড মিটারের বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেয়ার পর গত এক বছর অভিযান পরিচালনা পুরোপুরিই বন্ধ রয়েছে। কারণ সরকারের তিনটি সংস্থার পরীক্ষায় ওই যন্ত্রটি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন সম্প্রতি জনকণ্ঠকে বলেন, ফরমালিন পরিমাপের যন্ত্র না থাকায় এবার বাজারে অভিযান পরিচালনা করা যাচ্ছে না। তবে গত বছরের সাঁড়াশি অভিযানের ফলে এ বিষয়ে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।

ফরমালিমুক্ত বাজার নামেই ॥ ইতোপূর্বে ফরমালিনমুক্ত বাজার তৈরিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ২৩টি বৃহৎ কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করেছিল ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। ওই সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে মেশিনও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাজার কমিটির তদারকি না থাকা এবং মেশিনগুলো সঠিক না হওয়ায় এফবিসিসিআইয়ের সে উদ্যোগ আর বেশিদূর এগোয়নি। সংগঠনটির ফরমালিনবিরোধী কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে হাইকোর্টের নির্দেশনা পাওয়া গেলে এ বিষয়ে নতুন কর্মসূচী নিতে পারে সংগঠনটি। তবে ফরমালিনমুক্ত বাজার নিয়ে গত বছর তীব্র বিতর্কের মুখে পড়ার পর আপাতত আর এ জাতীয় কোন কর্মসূচী নিচ্ছে না এফবিসিসিআই। এ বিষয়ে সংগঠনটির যুগ্ম-সচিব ও বাজার মনিটরিং বিভাগে দায়িত্বরত কর্মকর্তা হারুন-উর-রশীদ জনকণ্ঠকে বলেন, ইতোপূর্বে যেসব মেশিন দেয়া হয়েছিল সেগুলো নিয়ে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা রয়েছে। ওই বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আর কোন বাজারে কোন ধরনের মেশিন দেয়া হবে না।

বিধিমালা অনুমোদন হয়নি ॥ বিধিমালা অনুমোদন না হওয়ার কারণে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর হতে পারছে না। বর্তমানে এই আইনটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু আমদানিকারকরা। সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও চলছে ফরমালিন বাণিজ্য। দেশে ১১ ধরনের জেনেরিক বা রাসায়নিকে ফরমালিনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বিভিন্ন অপকৌশলে এসব রাসায়নিক আনছেন আমদানিকারকরা। এতে করে ফলমূল, শাক-সবজি ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না। ইতোমধ্যে আবারও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ফরমালিন আমদানির অনুমতি চেয়ে নতুন করে আবেদন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। বিভিন্ন কায়দা-কৌশলে বিভিন্ন নামে যেমন- ফরমালডিহাইড, ফরমালডিহাইড সলিউশন, মিথানল সলিউশন, মিথালাইল এ্যালডিহাইড, মিথালাইল এ্যালডিহাইড সলিউশন, প্যারাফরমালডিহাইড, প্যারাফরমালডিহাইড সলিউশন, প্যারাফরম, ফরমাজিন, ফরমল ও মরবিসিড আনা হচ্ছে দেশে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে চারটি আইন ॥ ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এবং ভেজালবিরোধী আইন-২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী খাদ্যনীতি প্রণয়ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শীঘ্রই খাদ্যনীতি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে জাতীয় বাজেটে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। যুগোপযোগী খাদ্যনীতি প্রণয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।