২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২০১৫ সালের শীর্ষ ১০

  • মু. আব্দুল্লাহ আলআমিন

১. অভিবাসী সঙ্কট

অভিবাসী সঙ্কট ছিল প্রথম মাসজুড়ে আলোচিত প্রধান ইস্যু। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও অনিরাপদ জীবন থেতে বাঁচতে লাখ লাখ মানুষ এবার অভিবাসী হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম) ২১ ডিসেম্বর জানায়, এ বছর হিসেবে ১০ লাখ ৬ হাজার অভিবাসী ইউরোপ পৌঁছেছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৪ হাজার গেছে স্থলপথে বাকি সবাই গেছে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে। সবচেয়ে বেশি সাড়ে তিন লাখ অভিবাসী গ্রহণ করে জার্মানি। এরপর ব্রিটেন গ্রহণ করে এক লাখ সাগরে ও স্থলে বিপদ সঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক অভিবাসন প্রত্যাশীর প্রাণহানি এবং থাইল্যান্ড ও এর আশপাশের দেশগুলোতে অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কারের পর শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশার প্রতি মনোযোগ দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তুরস্কের ইজিয়ান সাগরের উপকূলে শরণার্থী শিশু আয়লান কুর্দির নিথর মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি।

২. ইরানের পরমাণু সমঝোতা

জুলাই ১৪ ইরান ও ছয় বিশ্বশক্তির মধ্যে সম্পাদিত হয় ঐতিহাসিক পরমাণু সমঝোতা (জয়েন্ট কম্প্রিহেন্সিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন)। পরমাণু কর্মসূচীর নামে তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো যে অভিযোগ করে আসছিল ইরান বরাবরই তা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও জাতিসংঘ দেশটির বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল। নিষেধাজ্ঞার যাঁতাকলে ইরানের অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ইরানের দাবি বিদ্যুত উৎপাদন ও চিকিৎসার মতো শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করাই তাদের পরমাণু কর্মসূচীর লক্ষ্য। চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে পরমাণু কর্মসূচী ব্যাপক মাত্রায় কাটছাঁট করতে হবে। সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম ও সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা দুই তৃতীয়াংশ কমিয়ে ফেলতে হবে। অন্তত এটা প্রমাণ করতে হবে পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা দেশটির আর নেই।

৩. নেপালের ভূমিকম্প

২৫ এপ্রিল ৭.৮ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে প্রকম্পিত হয় নেপাল। নিমেষে ধূলিস্যাত হয়ে যায় রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রধান পর্যটন আকর্ষণ ধারাহারা টাওয়ার। নিহতের সংখ্যা ৯ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছায়। আহত ২৩ হাজার। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫শ’ কোটি ডলারে। ভূকম্পন টের পাওয়া যায় পার্শ্ববর্তী ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকেও। এসব দেশ থেকেও প্রাণহানির খবর আসে। এরপর পরপর কয়েকদিন আফটার শক ঘটে। ভূমিকম্পের ফলে হিমালয় পর্বত স্থানচ্যুত হয় বিজ্ঞানীরা জানান। সবচেয়ে বড় ৭.৮ মাত্রার আফটার শকটি হয় ১২ মে। এতে দুই শতাধিক মানুষ মারা যায়।

৪. আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল জঙ্গী গ্রুপ ইসলামিক স্টেট বা আইএস। ১৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে আইএসের প্রতি সহানভূতিশীল সন্দেহে ক্রিস্টোফার লি কর্নেল নামে একজনকে আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে বোমা হামলা পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়। ৭ মার্চ আইএসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নাইজিরিয়ার বোকো হারাম। ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জর্দান, ৮ এপ্রিল থেকে কানাডা, ২৪ জুলাই থেকে তুরস্ক ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়া, ৯ অক্টোবর থেকে ফ্রান্স এবং ২ ডিসেম্বর থেকে ব্রিটেন আইএস বিরোধী যুদ্ধে যোগ দেয়। মার্চে ইরাকের প্রাচীন শহর নিমরদ ও হাত্রা দখল করে গুঁড়িয়ে দেয় আইসিস। মে মাসের ২০ তারা দখলে নেয় সিরিয়ার প্রাচীন নগরী পালমিরা। ১৪ মে ব্রিটিশ অভিনেতা মাইকেল এনরিক মোবাইল ফোনে ডেইলি মেলকে জানান যে, তিনি আইএসের বিরুদ্ধে কুর্দিদের পক্ষে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের মুখে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ১৪ শতাংশ ভূমি হাতছাড়া হয়েছে আইএসের।

৫.ঘটনা দুর্ঘটনায় সৌদি আরব

বিভিন্ন ঘটনায় সৌদি আরব এ বছর আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়ে আসে। বছরের শুরুর দিকে ২৩ জানুয়ারি বাদশাহ আবদুল্লাহর ইন্তেকাল করেন, সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সাউদ তার স্থলাভিষিক্ত হন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চলছে বলেও এক সময় খবর পাওয়া যায়। ২৫ মার্চ দেশটির নেতৃত্বে আরব বহুজাতিক বাহিনীর ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। ১১ সেপ্টেম্বর হজের আগে পবিত্র মক্কা নগরীতে ক্রেন ধসে মৃত্যু হয় ১০৭ জনের। ২৪ সেপ্টেম্বর মিনায় পদদলিত হয়ে সহস্্রাধিক হাজির মৃত্যু। এ নিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় ইরান। তেলের দাম পড়ে গিয়ে জিডিপি ৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত সঙ্কুচিত হয়। বছরের শেষ দিকে ৩৪টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয় রিয়াদ।

৬.জলবায়ু সম্মেলন

৩০ নবেম্বর প্যারিসে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন শুরু হয়, ১৪৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ এতে যোগ দেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা ইস্যুতে এবারের সম্মেলনটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছয় বছর আলাপ আলোচনার পর ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা এবারের সম্মেলনে নিজেদের মতপার্থক্য কাটিয়ে কার্বন নির্গমন কমাতে একমত হবেন বলে যে আশা করা হয়েছিল তা অবশ্য পুরোপুরি বিফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত দৃশ্যত আইনী বাধ্যতামূলক একটি চুক্তি হয়েছে। যদিও এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই গেছে। ৩০ নবেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্মেলনটি প্রায় ৬ হাজারের মতো গণমাধ্যমকর্মী এবারের সম্মেলন কভার করবেন, যদিও এর দ্বিগুণসংখ্যক সাংবাদিক থাকার ব্যবস্থা থাকবে সম্মেলন ভেন্যুতে। নিরাপত্তার জন্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা কাটছাঁট করা হয়েছে। নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ অবশ্য এতে থাকছে না।

৭.কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সম্পর্কোন্নয়ন ছিল বিদায়ী ২০১৫ সালের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এপ্রিলের ১১ তারিখ পাঁচ দশকের বৈরিতা পেছনে রেখে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র প্রথম শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় পানামা সিটিতে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো পরস্পর মুখোমুখি হন। এরপর ২০ জুলাই ৫৪ বছরের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে দুদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এর আগে ১৯৫৯ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো ও রিচার্ড নিক্সনের মধ্যে বৈঠক ছিল দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে শেষ বৈঠক। ১৯৬১ সালে কিউবা সমাজতান্ত্রিক ব্লকে যোগ দেয়ার পর দু’দেশের কূটনৈতিক ছিন্ন হয়। ২০০২ সালের মে মাসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশটি সফর করেন। মূলত কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকে দু’দেশের মধ্যে বরফ গলতে শুরু করেছিল। ২০০৯ সাল থেকে ওবামা প্রশাসন কিউবার ওপর দীর্ঘকালের আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করার উদ্যোগ নেয়।

৮. প্যারিস হামলা

মহানবী (স.) কে ব্যঙ্গ করে কার্টুনের প্রকাশের প্রতিবাদে প্যারিসের শার্লি এবদো পত্রিকা অফিসে হামলা। ১৩ নবেম্বর প্যারিসের বাতাক্লান থিয়েটারসহ ছয়টি জায়গায় একযোগে ঘটে বন্দুক হামলা। এতে নিহত হয় ১৩০ জন, আহত ৩ শতাধিক। হামলার দায় স্বীকার করে আইএস। এই ঘটনার পর ইউরোপে ফের মাথাচাড়া দেয় অভিবাসী ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফ্রান্স। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে চলে ব্যাপক তল্লাশি ও ধরপাকড়। বলা হয় যে এই হামলার পরিকল্পনা বেলজিয়ামে হয়েছিল। তবে হামলার কথিত মূল পরিকল্পক আবদেল সালাম আবাউদ সিরিয়ায় শেষ পর্যন্ত গা ঢাকা দেন বলে ফরাসী কর্তৃপক্ষ জানায়। ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিকদের পালে হাওয়া লাগায় প্যারিস হামলা। অন্যদিকে এই ঘটনা অভিবাসী সমস্যা সমাধা ন আরও জটিল করে তোলে।

৯. ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিসেম্বরের ৭ তারিখ মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। বাছ বিচারহীন এমন মন্তব্য করে নিজ দলের মধ্যেই সমালোচিত হয়েছেন ট্রাম্প। তবে তিনি নিজের কথাও প্রত্যাহার করে নেননি। জনমত সমীক্ষাতেও রিপাবলিকান মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে তার অবস্থান নিম্নমুখী হতে দেখা যায়নি। অনেকে মনে করেন ট্রাম্পের এই বক্তব্য দলের ভাবমূর্তি যথেষ্ট ক্ষুণœ করেছে। গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি বা জিওপি নামে পরিচিত রক্ষণশীল ভাবধারার এই পার্টি আমেরিকার মুক্ত গণমাধ্যমের সুযোগ একচ্ছত্রভাবে কাজে লাগাচ্ছে। মিডিয়ার বাইরে দলের বাস্তব চিত্রটি অনেকটা অজানা থেকে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটিক দল নির্বাচনী পিছিয়ে থাকলেও ট্রাম্পের জ্বালাময়ী বক্তব্য তাদের আবার প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। ট্রাম্প শুধু মুসলিমদের প্রবেশাধিকার রহিত করতে চাননি ইতোপূর্বে এক ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সব মুসলিমকে নিবন্ধিত এবং পৃথক ডাটাবেজের আওতায় রাখতে হবে।

১০. ভারতের গরু

অশিক্ষা, দারিদ্র্য ও নানাবিধ সামাজিক সমস্যাকে পেছনে ফেলে বিদায়ী বছরটিতে গরু হয়ে উঠেছিল ভারতের অন্যতম প্রধান আলোচিত চরিত্র। মার্চের ৩০ তারিখ দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ঘোষণা দেন গো হত্যা বন্ধে সরকার সম্ভব সবকিছু করবে। কোরবানির ঈদের দিন কয়েক পর সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ গরুর মাংস খাওয়ার গুজবে ভারতের উত্তর প্রদেশে ইখলাখ একজন মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও এ রকম আরও কিছু হত্যাকা-ের দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসে। বিষয়টি নিয়ে শিল্প ও সাহিত্য জগতের লোকজনও সরব হন। অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদ জানিয়ে অনেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া সম্মাননা প্রত্যাহার করে নেন। দেশটির সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমানে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর ২ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে মন্তব্য করেন যে, ভারতে গরু একজন মুসলিমের চেয়ে বেশি নিরাপদ।