২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ন্যাটো রাশিয়া সম্পর্কের অবনতি

হাসান জাবির

ন্যাটো সম্প্রসারণের পূর্বাপর যে কোন পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি প্রতিহত করতে মস্কো দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্প্রতি বলকান অঞ্চলের দেশ মন্ট্রিনিগ্রোর ন্যাটো জোটে সম্ভাব্য যোগদানের প্রতিক্রিয়ায় মস্কো উপরোক্ত মন্তব্য করে। যদিও মন্ট্রিনিগ্রো ন্যাটোতে যোগ দিলে মস্কোর পদক্ষেপ কি হবে তা স্পষ্ট নয়। তবে বলকান অঞ্চলে ন্যাটোর আরও উপস্থিতি দ্বিপক্ষীয় বর্ধনশীল উত্তেজনাকে সংঘাতে পর্যবসিত করবে। ন্যাটোর ক্রমসম্প্রসারণ প্রচেষ্টা নিজের নিরাপত্তা হুমকির কারণ বলে উদ্বিগ্ন রাশিয়া। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাশিয়া বহির্বিশ্বে সামরিক উপস্থিতি জোরদারের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সুসংহত করার বিকল্প পথ অনুসরণ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিকল্প পথ হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র উৎপাদন, প্রতিস্থাপন এবং উৎক্ষেপণ। যে প্রক্রিয়ায় আক্রমণাত্মক রণকৌশল প্রণয়ন করে প্রতিপক্ষের হুমকিতে আক্রান্ত মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আগ্রহী মস্কো। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী হিংসাত্মক তৎপরতা ন্যাটো রাশিয়াকে যুদ্ধের মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

’৯০ পরবর্তী বিশ্বে ‘শান্তির জন্য অংশীদারিত্ব’ প্রকল্পের আওতায় ১২টি দেশকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে ন্যাটো। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নকালে উভয়পক্ষ তুমুল কূটনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেও ন্যাটো সম্প্রসারণ প্রতিরোধে কার্যত ব্যর্থ হয় রাশিয়া। বিপরীতে ন্যাটো এই সাফল্যের সূত্র ধরে ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করার অনুপ্রেরণা পায়। রুশ বিশেষ অধিকারায়িত এলাকায় ন্যাটো উপস্থিতিকে মস্কো তার আঞ্চলিক স্বার্থ বিপন্ন করার অভিসন্ধি বিবেচনা করে। প্রতিক্রিয়ায় রুশ কমনওয়েলথ এর কাঠামো শক্তিশালী করে আঞ্চলিক সংহতি সুদৃঢ় করে রাশিয়া। রুশ নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পুনর্বার বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য ফেরাতে সক্ষম হয়। রাশিয়া তখন নতুন উদ্যমে পূর্ব ইউরোপে আধিপত্য ফিরে পেতে মনোযোগী হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ন্যাটো সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করার পরিকল্পনা নিলে রাশিয়া অসন্তুষ্ট হয়। প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করতে বহুমুখী চাপ প্রয়োগ করা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অটল থাকে ন্যাটো। ফলশ্রুতিতে রাশিয়া দ্রুত কিছু সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতায় কৌশলগত প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশনাল আর্মস ফোরশেস ট্রিট্রি একতরফাভাবে স্থগিত, পূর্ব ইউরোপ সংলগ্ন রুশ ভূখণ্ডে একটি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চ তৈরি করে। রাশিয়ার এই দুই পদক্ষেপ ন্যাটোর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে অকার্যকর করবে বিধায় প্রকল্প স্থগিত করে। মুলত ঐ ঘটনাসমূহই ’৯১ সালে স্থাপিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আইনী কাঠামোর স্থিতাবস্থা ভেঙ্গে ফেলে। ফলে ন্যাটো রাশিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুনশ্চ ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রচ্ছন্নভাবে প্রতিধ্বনিত হয় ইউক্রেন সঙ্কটে। বস্তুত ইউক্রেন ইস্যুকে পুঁজি করে রুশ কৌশলগত এলাকায় ন্যাটোর ক্রমাগত সামরিক উস্কানি কিয়েভের অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী করছে। ইউক্রেন ও সিরিয়া ইস্যুতে যথাক্রমে কৃষ্ণসাগর ও ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকায় ন্যাটো রাশিয়া উত্তপ্ত বাকযুদ্ধ, প্রত্যক্ষ সামরিক প্রস্তুতি যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েই তুলছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী রুশ-মার্কিন ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়। ফলে পশ্চিম ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাব বলয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রতিহত করতে সৃষ্টি হয় সামরিক জোট ন্যাটো, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তায় মার্কিন কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ৮৯ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত ঘটনাবলীর প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি বিশ্বব্যাপী ঠাণ্ডা লড়াইয়ের অবসান করে। এর আগে প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ার্স জোট অবলুপ্ত হলেও ন্যাটোকে টিকিয়ে রাখার অব্যাহত প্রচেষ্টা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সঞ্চারিত হয়। এ পর্যায়ে ভারসাম্যহীন বিশ্বে রাশিয়া ন্যাটো সম্পর্কের নতুন কাঠামো আবশ্যক হয়। রাশিয়ার ভাঙ্গনজনিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন রূপান্তর রুশ সামরিক দুর্বলতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উত্তেজনা কমে আসে। যদিও সেসময় ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মাত্রা রাশিয়ার বৈশ্বিক মিত্রদের হতাশ করে। পরিস্থিতির সুযোগে ন্যাটো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বহুমুখী অংশীদারিত্বে জড়ালে রুশ স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। বিপদ আসন্ন অনুভব করে ২০০২ সালের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ফলাফল অনুসরণ করে রাশিয়া ন্যাটোর সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র, যৌথ কার্যক্রম শিথিল করে। কিন্তু শক্তিশালী ন্যাটো রাশিয়ার চাহিদার বিপরীত ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে পরিস্থিতি উত্তরণে রুশ পাল্টা পদক্ষেপে হিসেবে সামরিক অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটায়। ন্যাটোর জোটগত শক্তি মোকাবেলায় বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা প্রত্যাশী দেশগুলোর সংমিশ্রণে গড়ে তুলে নতুন জোট এসসিও। বস্তুত রাশিয়ার শক্তিশালী পুনরুত্থানের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। রুশ সামরিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ ন্যাটো রাশিয়া সম্পর্কের অবনতি নিশ্চিত করে। সর্বশেষ তুরস্কের আচরণে ন্যাটো রাশিয়া সম্পর্ক ভয়াবহ সংঘাতের পথ উম্মুক্ত করে দেয়। ন্যাটো জোটের বিপরীতে সিরিয়ায় রুশ ভূমিকা ফলপ্রসূ হচ্ছে। সিরীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেখানকার বর্ধনশীল বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাশিয়া কঠোর। কিন্তু ন্যাটো দেশগুলোর ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা উস্কানির মুখে রাশিয়া এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা চরম ক্ষুব্ধ। ঘনীভূত সিরীয় পরিস্থিতিকে সামরিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিতে ন্যাটোর বিতর্কিত ভূমিকা কার্যত চূড়ান্ত বিপদ সঙ্কেত। যেখানে বিশ্ব সভ্যতাই ধ্বংস হওয়ারা শঙ্কায় আছে।

নির্বাচিত সংবাদ