২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকসার জমিন সাদবাদ

মিজানুর রহমান মীরু

একটি দুর্ভাগা দেশের মানুষ বরাবরই দেখে আসছে রাজনীতিবিদদের ‘অসুস্থ’ ক্ষমতার লড়াই, দেশ সেবকদের ‘আত্মসেবা’ করার ধান্ধা! দাঙ্গা-হাঙ্গামা যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, মুখের গ্রাস কিংবা বাঁচার অধিকারটুকু যেখানে কেড়ে নেয়া হয়! ক্ষমতালিপ্সুদের সব অত্যাচার, সব অপরাধ মেনে নিয়ে যেখানে শাসনভার পরিচালনার জন্য বার বার নির্বাচিত করা হয় দেশবিরোধীদের! শীর্ষপদে থেকে যারা দেশবিরোধীদের মনোনয়ন দেয়, মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়, তাদের কেউ একটি কথাও বলে না! মেনে নিয়ে চলাটাই যেন স্বাভাবিক এই সব সম্ভবের দেশে। সাড়ে চার দশক পর একটি মীমাংসিত ঐতিহাসিক সত্যকে মিথ্যা বলে প্রচার করার হেতু কী হতে পারে? এতদিন পর অভাগা জাতির মহান মুক্তি সংগ্রামের শহীদের সংখ্যা নিয়ে ‘সন্দেহ’ পোষণ করার দরকার কেন পড়ল? এটা কি মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির গুরুতর অপরাধকে ‘লঘু’ প্রমাণের পাঁয়তারা নয়?

যারা রাজনীতি করেন, তারা নিজের দেশকে ভালবাসেন বলেই এ পেশা বেছে নেন। দেশ বলতে কি আমরা শুধুই একটি ভূখণ্ড বা এর রাজনৈতিক সীমানাকেই বুঝি? অবশ্যই না। ভূখণ্ডটির অধিবাসী ও তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, পরিবেশ-পরিচিতিসহ আরও অনেক কিছুর ভেতরই এর বিস্তৃতি নিহিত। এসবের কোন একটাকে বাদ দিয়ে দেশকে ভালবাসার কথা বলা মিথ্যা ও অমূলক। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জন্ম বা অস্তিত্বসম্পর্কীয় এমন এক সত্য, যা থেকে বাঙালী জাতি নিজেকে কখনও বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নির্মম ও পৈশাচিক ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত এ রক্তমাখা ইতিহাসই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস। এ সত্যকে বিন্দুমাত্র প্রশ্নবিদ্ধ করা দেশবিরোধীতার মতোই গর্হিত কাজ। দেশী-বিদেশী সংবাদ মাধ্যম এবং গবেষণায় বিবৃত ইতিহাস থেকে তথ্য-প্রমাণ বা ‘স্বীকৃতি’ নিয়ে শহীদের সংখ্যা প্রমাণ করা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, ১৯৭১ সালে ৯ মাসব্যাপী একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ’ নামক এক জাতিরাষ্ট্র আত্মমর্যাদায় উদ্ভাসিত এক সত্যরূপে পৃথিবীর মানুষের কাছে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল। অনেকেই তখন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিগতভাবে এ সত্য মেনে নিতে পারেনি! চুয়াল্লিশ বছর ধরে এরা পরাজয়ের জ্বালায় জ্বলেপুড়ে ছাই হচ্ছে। এদের ‘বিষদাঁত’ বার বার বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে বা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা নিয়ে এরাই কুতর্ক করে! নিজের গাত্রদাহ ঢাকতে এই কুজ্ঞানীরাই বিচারের ‘স্বচ্ছতা’ ‘জবাবদিহিতা’ ‘আন্তর্জাতিক মান’ নিয়ে প্রশ্ন করে। প্রোপাগান্ডা করে বলে, ‘এই কাদের সেই কাদের না’ ‘এই দেইল্যা সেই দেইল্যা না’ কিংবা ২০ বছরের যুবক এ ভয়াবাহ অপরাধ করতে পারে না, এসব! কিন্তু সাধারণ মানুষ ঠিকই আসল সত্য বুঝে, বিধায় কুচক্রী মহল এ ধরনের প্রচারণায় খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। তাই তারা বাঙালীর আত্মসম্মানে আঘাত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।

বাঙালীরা ৪৪ বছর আগে একটি প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লাঠি হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সামরিক জ্ঞানহীন, অস্ত্রবিহীন ও প্রতিরক্ষাবিহীন সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করেছে বলে শহীদ হতে হয়েছে প্রচুর মানুষকে। শহর ছাড়াও প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে সারিবদ্ধ করে হাজার হাজার মানুষ মেরেছে পাকিস্তানীরা। এসব ঘটনা কোন রূপকথা নয়, বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া চরম সত্য। ৭১ এর বিজয় আমাদের “স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন”-এ আমাদের আত্মার সাথে অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা চিরন্তন সত্য। শহীদের সংখ্যা নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলে তাদের আমরা চিনি, তাদের গাত্রদাহের কারণও আমরা জানি। এ ‘দহন জ্বালা’ নিয়ে এদেশে তদের থাকার দরকার নাই, তারা “পাক সার জমিনে” চলে গেলেই তো পারে। এখানে সুঘ্রাণ মাটিতে, সবুজ ঘাসে লেগে থাকা ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আমাদের অহঙ্কার, এ নতুন কোন গণনার বিষয় নয়। এ আমাদের অস্তিত্ব। যাদের এ সংখ্যা মেনে নিতে অসুবিধা, তারা চলে যাক জাহান্নামে। “

লন্ডন থেকে