২০ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানী বাঙালীর প্রতিকৃতি

রাখাল চন্দ্র মিত্র

বৃক্ষ চেনা যায় ফলে। মানুষ চিনতে হয় বোলে এবং তার কর্মে ও সঙ্গী-সাথীদের সংসর্গ বিবেচনায়। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। বাংলাদেশে এক শ্রেণীর গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ আছে যাদের পোশাকে-আশাকে, বোলেচালে দেখতে বাঙালী অবয়বের হলেও তাদের মন ও মগজটা কিন্তু পাকিস্তানী তাহ্জিব তমদ্দুনে আচ্ছন্ন। অর্থাৎ জন্মসূত্রে বাঙালী হলেও ভেতরে মনেপ্রাণে পাকিস্তানী। ড. মুনতাসীর মামুনের ভাষায় এরা পাকিস্তানী বাঙালী। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে এরা মনে করত পাকিস্তান না টিকলে এদেশে ইসলাম থাকবে না। তাদের মুসলমান পরিচয় মুছে যাবে। তাই মুক্তিযুদ্ধে তারা পাকিবাহিনীকে শুধু রাজনৈতিকভাবেই সমর্থন করেনি, সশস্ত্রভাবে পাকিস্তানীদের পক্ষে বাঙালী গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল। তারও আগে এরাই সত্তরের নির্বাচনে ছয় দফার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা তারা আজও মেনে নিতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধকে তাদের কাছে কখনও মনে হয় একাত্তরের গ-গোল, কখনও মুসলমান মুসলমান ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া। আবার কখনও পাক-ভারত যুদ্ধ। যুদ্ধে বাঙালীর বিজয়কে (১৬ ডিসেম্বর) মনে করে এই ভূখ-ে ইসলামের পরাজয় এবং মুসলমানদের কবর দেয়ার দিবস হিসেবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে তারা ইসলামী রিপাবলিকে রূপান্তরিত করতে বদ্ধপরিকর।

স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পরে এসে পাকিস্তান যখন একাত্তরের গণহত্যার দায় নিতে অস্বীকার করে বলতে চায় যে, একাত্তরে বাংলাদেশে কোন গণহত্যা সংঘটিত হয়নি, তখন তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের মুখপাত্র বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া একাত্তরের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ যেন পাকি কণ্ঠস্বর। শহীদদের আত্মদান নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং গণহত্যার তীব্রতা এবং তার দায়কে লঘু করে দেখানোর অপচেষ্টা রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের সামিল। খালেদার এ অপতৎপরতা পাকিস্তানী ‘গরহফংবঃ’-এর অনুরূপ এ কথা বলাইবাহুল্য। অবশ্য খালেদার এরূপ বোলচাল নতুন কিছু নয়। মুক্তিযুদ্ধের কাল থেকে আজ পর্যন্ত খালেদার অবস্থান বোলচাল ও তার সঙ্গী-সাথীদের চিনতে এবং বুঝতে পারলে তাকে চেনা সহজ হবে। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হয়েও খালেদা মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তাঞ্চলের চেয়ে পাকিস্তানী সেনা ব্যারাকে অবস্থান করাটা শ্রেয়তর মনে করেছেন। সেনা ব্যারাক থেকে উদ্ধার করে তাঁকে মুক্তাঞ্চলে নিয়ে আসার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধা স্বামী জিয়ার উদ্যোগ তিনি সে সময় অগ্রাহ্য ও প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে বোঝা যায় তিনি মনে মগজে কতটা সাচ্চা পাকিস্তানী ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খালেদা জিয়ার কিছু পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য বিবেচনা করা যাক। তিনি ফতোয়া দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ (পাকিস্তান) বিভক্ত হয়ে গেছে এবং দেশের পূর্বাঞ্চল ভারতের আধিপত্যবাদের কাছে পদানত হয়ে পড়েছে। মসজিদে মসজিদে এখন আজানের পরিবর্তে উলু ও শঙ্খধ্বনি শোনা যাবে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি হলে চাটগাঁ থেকে ফেনি পর্যন্ত (খালেদার পিত্রালয়) ভারত হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেছেন- ‘তিনি (শেখ মুজিবুর রহমান) স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না। এদেশে কেউ মুক্তিযোদ্ধা হতে পারতেন না। বাংলাদেশও স্বাধীন হতো না। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের দাবি ভুয়া’Ñ এ বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের চূড়ান্ত বিকৃতি।

পাকিস্তান যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের নিন্দা করছে এবং দ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের (সাকা-মুজাহিদ) নিজেদের সমর্থক ও এজেন্ট বলে দাবি তুলেছে তখন খালেদা জিয়াও এ বিচারের বিরোধিতা করে চলেছেন। তাদের রাজনৈতিক বন্দী দাবি করে মুক্তি চাইছেন এবং ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতের দ-দানকে ‘ঔঁফরপরধষ করষষরহম’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রকৃত রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার হুমকি দিচ্ছেন। অর্থাৎ বর্তমানে বিচারাধীন আসামিরা তার মতে প্রকৃত অপরাধী নয়। তাহলে প্রকৃত অপরাধী কি মুক্তিযোদ্ধারা, পাকিস্তানের বর্ণনায় যারা ছিলেন ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ও কতিপয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দুষ্কৃতকারী? অসহবংঃু ওহঃবৎহধঃরড়হধষ সম্প্রতি চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে তাদের ভাষায় তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধাদের বিচারের যে দাবি তুলেছেন, খালেদা জিয়া কি তার সঙ্গে সহমতপোষণ করছেন?

খালেদা জিয়ার বোলচাল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে পাকিস্তান এবং বিএনপির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও টার্গেট এক ও অভিন্ন। বিএনপির ছাতার নিচে যারা সংঘবদ্ধ হয়েছে তারা সকলে পাকি আদর্শের ধারক ও বাহক। একাত্তরে পাকিস্তানের পরাজয়কে নিজেদের পরাজয় মনে করে প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে উঠেছে। আখেরে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ভাবাদর্শে পুনঃস্থাপন করাই প্রকৃত টার্গেট।

বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং হাইকমিশন কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক তৎপরতা ও খালেদা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতার ঘোষণা, যুদ্ধাপরাধীর বিচার ইত্যাদি সম্পর্কিত বক্তব্য ও মন্তব্য একই সূত্রে গাথা। লক্ষ্য একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ এবং বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত করা। পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্য তাই প্রশ্নাতীত ও সুস্পষ্ট।

শান্তিবাগ, পটুয়াখালী থেকে