২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুয়াশায় ঢাকা অমাবস্যা

  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

যুদ্ধের সকল রকম নীতি থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে জয়লাভ যেমন সব সময় নীতি আশ্রিত হয় না বরং কৌশল আশ্রিত হয় অনেকটা তেমনি প্রেম সবসময় প্রেমিক-প্রেমিকার ব্যাকুলতায় পরিণতি লাভ করে না। পরিণতি পায় আত্মত্যাগ তথা আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে। অনেকটা সেরকমভাবে বাহ্যিক আচার-আচরণের বেড়াজালে আবদ্ধ দুটি মানব-মানবির বেড়া ডিঙ্গিয়ে আত্মা-অন্তরাত্মায় মিশে যাবার নাটক অমাবস্যা। নাট্যকার-নির্দেশক প্রবীর দত্ত রচিত-নির্দেশিত, নাট্যপুরাণ প্রযোজিত ২য় প্রযোজনা নাটক অমাবস্যা মঞ্চস্থ হলো গত ২৯ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে। হলে না বরং জঙ্গলে পরিত্যক্ত রূপে কুড়িয়ে পাওয়া কন্যাসন্তান মালতী। অভাগী মালতীর আশ্রয় নিঃসন্তান দম্পতি কানাইলাল। যুবতী মালতী ভরা যৌবনে ভালবাসে বাণিজ্যের সন্ধানে ভিনদেশ থেকে আসা এক বণিক যুবককে। উভয়ের ভালবাসা যখন পরিণতি লাভের আশায় ব্যাকুল তখন পরিণত পথের অন্তরায় স্থান-কাল আর পাত্রের ভেদাভেদ। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় মালতীর বিবাহ স্বস্থানে হলেও স্বামীর ঘরে মালতীর অবস্থান শুধু দৈনিক। মনোজগতে ভিন্নদেশী বণিকের সঙ্গে মালতীর একআত্মা-একপ্রাণ হওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রেমের আলোক প্রজ্বলন ঘটে আর প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারী কুজনদের বহিরাঙ্গনের পূর্ণিমা সরে অন্তরের গুপ্ত অমাবস্যার অন্ধকার বেরিয়ে পড়ে। আর সেখানেই শেষ হয় কার্যকারণ ছাড়া অনেক ঘটনা ঘটাবার তীব্র প্রয়াসী নাটক অমাবস্যা। কেন কার্যকারণ ছাড়া অনেক ঘটনা ঘটাবার তীব্র প্রয়াসী নাটক অমাবস্যা নাট্যকারের প্রশ্নের উত্তরে বলা চলে প্রথমত, বৃন্দসাঁই গ্রামের এমনকি প্রেক্ষাপট যেখানে কন্যাশিশু পরিত্যক্ত কিংবা স্বামীর স্বীকৃতি দুষ্প্রাপ্য! দ্বিতীয়ত, বনে শিকার কিংবা বৃক্ষ পাচার ছাড়াই বণিক যুবক কেন আনমনে জঙ্গলে ঘুরঘুর করবে! তৃতীয়ত, প্রেম বলিষ্ঠ হলে কাম ক্ষিণ হবার কথা। সেখানে কথা নেই বার্তা নেই প্রথম চাহনিতেই দেহ-মন সব দিয়ে উত্তলা হবার কি মানে! চতুর্থ, স্বামীর দায়িত্ব যেখানে স্ত্রীর সুরক্ষা দেয়া, সেখানে স্ত্রীর অযৌক্তিক দাবি স্বামীর না মানাকে নাট্যকার কিভাবে তাচ্ছিল্যতায় প্রকাশ করে (পতির কাছে শুধুমাত্র দেহ রেখে যাওয়া বিবেচ্য)। পঞ্চমত, মনে মনে মিলনটাই যদি গন্তব্য হবে তবে তো মালতী-বণিক নিজেদের মধ্যে শপথ সেরে যার যার স্থানে থেকে সুখী হতে পারত। সেটাসহ অনেক কিছুই যে হবার নয় কিংবা পারার নয় তার বড় প্রমাণ নাট্যকার-নির্দেশক প্রবীর দত্তর লিখিত কথায়, ‘নাট্যপূরণের দ্বিতীয় প্রযোজনায় নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে লিখতে হলো ‘অমাবসা’ নাটকটি’। গ্রাম অঞ্চলে গাভী কিনে বাচুর ফ্রি পাবার মতো স্থুল বিষয় না, নির্দেশনার জন্য নাটক লেখা। ২০১৫ তে এসে সৈয়দ শামসুল হকের এগারটি নাটকের নির্দেশক আমি কথাটি বলে যখন নির্দেশকের স্বতন্ত্র পরিচিতির পথ খোঁজা চলে দোদুল্যমান সময়ে তখন তো স্থিরতা নিয়ে বলাই যায়, নাটক রচনা কোন মামুলি বিষয় না। মন চাইল আর তা লিখে ফেল্লাম। বর্তমান নাট্যমঞ্চে দর্শক স্বল্পতার কারণ খুঁজলে জরিপে যতগুলো বিষয় চলে আসবে তার সর্বাগ্রে থাকবে নাট্যকারের মেধাশূন্যতা। দল প্রধানরা নাট্যকারদের যতœ নেয় না অজুহাতও টিকবে না রচনার গুণাগুণে কারণ একজন নাট্যকার জানবেন যে তিনি নাট্যকার, নাটক রচনা তার সাধনা। যিনি অসংখ্য চরিত্রদের দায়িত্ব নেবেন তিনি নিজের দায়িত্ব নিতে পারবেন না সে কেমন কথা! নাট্যকার প্রবীর দত্ত নিশ্চই বিশ্বাস করে, যে নিজের মাকে খেতে দিতে পারে না সে কি করে অন্য মায়ের মুখে গ্রাস তুলে দেবে। তুলে ধরার ক্ষেত্রে নির্দেশক হিসেবে প্রবীর দত্ত দক্ষ-বলিষ্ঠ এবং নান্দনিক। ছন্দ সুরের মায়ায় প্রযোজনাটি উপস্থাপনা করতে যেয়ে বাক্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সুরারোপ, সুরের দোত্যনা আনতে যেয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে নাটকীয় অভিব্যক্তি, অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে যেয়ে সহায়ক সংলাপ প্রক্ষেপণ, সামগ্রিকতায় অসংখ্য দৃশ্যের বিশ্বস্ত অবতারণ প্রভৃতিতে নির্দেশক হিসেবে প্রবীর দত্ত স্বতন্ত্র। বিশেষত বন্ধনা আবহ, সূত্রধরের চমক, সন্তান লালন, বনে ভ্রমণ, প্রণয়ের উচ্ছ্বাস, বিবাহ বাসর, বিচ্ছেদের দাবানল, সমবেত আহ্বান প্রভৃতি দৃশ্য ভুলার নয়। ভুলার নয় যে, প্রবীর দত্ত নাট্যকার স্বত্বায় অমাবস্যা আর নির্দেশক স্বত্বায় পূর্ণিমা। অমাবস্যা-পূর্ণিমার দোলাচলে মালতীরূপী অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা বিদ্যুত-এর স্ফুলিঙ্গ, সখী প্রধান রূপী অভিনেত্রী সারা অরনি সহানুভূতিশীল, বণিকরূপী অভিনেত্রী সুমন বিবাগী, কানাইলালরূপী অভিনেতা তুষায় নিরূপায়, হরেন্দ্র ম-লরূপী জিলানী বহুরুপী, নগেনও মদনরূপী বিপ্লব ও সারওয়ার পাঁচ ফোড়ন, ডাকিনী ও যোগিনীরূপী শুভ-সুমন-জিলানী হিংস্রতা ছাড়াই বিষাক্ত, প্রেতগণ-কথক-বিভাসরূপী সকলে ফোটার অপেক্ষায় শতদলে অপেক্ষারত। বহিরাঙ্গের শুভ্রতায় অন্তরাঙ্গের অমাবস্যাকে অনেকটাই চিনিয়ে দেয় নাটক অমাবস্যা।