১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুঁজিবাজার মন্দাবস্থা থেকে বেরুতে পারেনি

  • ফিরে দেখা ২০১৫

অপূর্ব কুমার ॥ ২০১৪ সালের মতো ’১৫ সালেও দেশের পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। বছরের শুরুটি কেটেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের টানা অবরোধ ও পেট্রোল বোমাবাজির মধ্য দিয়ে। টানা তিন মাস এ সঙ্কট চলার কারণে সার্বিক বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। নানা অস্থিরতা শেষে পুঁজিবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে না আসতেই ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয় ইস্যুতে ফের মন্দা শুরু হয় বাজারে। মূলত গত বছরে বিভিন্ন কারণের মধ্যে এ দুটিকেই বাজারে মন্দাবস্থার জন্য দায়ী বলে মত দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তবে এর মাঝেও বছরটির আগের তুলনায় কিছুটা কম হলেও নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্ত হয়েছে। বছরটিতে দুই বাজারে মোট ১১টি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন হয়েছে। তবে বছরটিতে কোন রাইট শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হয়নি। সার্বিকভাবে বছরটি পুঁজিবাজারের জন্য খুব ভাল কিছু দিতে পারেনি শুধুমাত্র আশাবাদ ছাড়া।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে পুঁজিবাজারের মন্দা ঠেকাতে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ে সময়সীমা দুই বছর বাড়ানোর বিষয়ে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। বছরের শেষ দিকে ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের (ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংক) মূলধনকে পুঁজিবাজার এক্সপোজার বা বিনিয়োগ হিসাবে গণ্য না করার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শেয়ারবাজারে অস্থিরতা প্রশমনের এমন প্রয়াসে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও বছরজুড়ে বিরাজমান মন্দার কারণে লোকসান গুণতে হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। সার্বিকভাবে আরও একটি হতাশাজনক বছর পার করেছে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে মার্জিন ঋণধারী বিনিয়োগকারীদের পরিস্থিতি আরও নাজুক আকার ধারণ করে। বাজারে মন্দার জন্য ২০১৫ সালেও রাজপথে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বিনিয়োগকারীরা। তবে গত কয়েক বছরের তুলনায় তাদের প্রতিবাদ কিছুটা ম্লান ছিল। মন্দা বাজারেও অতিরিক্ত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে আইপিও অনুমোদন দেয়া, বাজারে ধস ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেন বিনিয়োগকারীরা।

অবশ্য পুঁজিবাজারে চলতি বছরে অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চালু। চলতি জুন মাস থেকে শুরু হয়েছে ট্রাইব্যুনালের কাজ। ট্রাইব্যুনাল ৫টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় আসামিরা খালাস ও অপর ৩টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও আর্থিকদণ্ড প্রদান করেছে। তবে আলোচিত চিটাগাং সিমেন্ট মামলার শুনানি শেষে রায় ঘোষণার তারিখও ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। কিন্তু উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে শেষ পর্যন্ত রায় ঘোষণা করতে পারেনি ট্রাইব্যুনাল। এ মামলার অন্যতম আসামি হলেন ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান।

ব্যাংকের পরিবর্তে ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে আইপিও আবেদন গ্রহণের বিষয়টি ছিল বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক ঘটনা। গত ২৫ মে থেকে ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে আইপিও আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। আইপিও আবেদনে বিনিয়োগকারীদের বিড়ম্বনার অবসান ঘটেছে। এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ‘অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুল-২০১৫’ নামে নতুন রুল প্রণয়ন করেছে। মূলত প্রাইভেট ইক্যুয়িটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফাইন্যান্সের মাধ্যমে তালিকা বহির্ভূত কোম্পানিতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতেই এ বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘পাবলিক ইস্যু রুল’ নামে নতুন একটি রুলের খসড়া অনুমোদন করেছে কমিশন। জনমত যাচাইয়ের এটি প্রকাশ করেছে কমিশন। পাবলিক ইস্যু রুলে আইপিওতে প্রিমিয়ামের জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আবেদনের বিধান রাখাসহ আইপিওতে কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু সংশোধনীসহ মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় পরিবর্তনে খসড়া অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। খসড়া বিধিমালায় মিউচুয়াল ফান্ডের পোর্টফোলিও মাসিক ভিত্তিতে নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ, বে-মেয়াদি ফান্ডের জন্য ট্রেডিং প্লাটফরম চালুর বিধান রাখা হয়েছে এতে। অন্যদিকে, লেনদেনের জন্য নতুন সফটওয়্যার সংযোজন করেও লেনদেন বিভ্রাট থেকে মুক্ত হতে পারেনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। কারিগরি ত্রুটির কারণে বেশ কয়েক দফা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে লেনদেন শুরু হয়েছে ডিএসইতে। কারিগরি ত্রুটির কারণে ২০১৫ সালের ২৪ ও ২৫ মে, ১২ আগস্ট, ২২ নবেম্বর ও ২৬ নবেম্বর নির্ধারিত সময়ে লেনদেন শুরু করতে না পারেনি ডিএসই। এতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নেক্সট জেনারেশন’ নামে নতুন ট্রেডিং সফটওয়্যার ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সংযোজন করেছিল ডিএসই। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদনের যথার্থতা নিয়ে বরাবরের মতো এবারও সমালোচনা ছিল। তারপরও ২০১৫ সালে ১২টি কোম্পানির আইপিও আবেদন সম্পন্ন হয়েছে। একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালের শুরুতে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক (ডিএসইএক্স) ছিল ৪ হাজার ৮০০ পয়েন্টের ওপরে। আর এখন তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ৫০০ পয়েন্টের ঘরে। অপরদিকে, বছরের বেশিরভাগ সময়জুড়েই লেনদেন ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল।

২০১৫ সালের পুঁজিবাজার পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতির অন্য সব সূচক এগিয়ে গেলেও পুঁজিবাজার পিছিয়ে গেছে। পুঁজিবাজার পিছিয়ে যাওয়ার মতো কোন ঘটনাও ঘটেনি। কিন্তু তারপরেও প্রায় ৩০০ মূল্য সূচক নেই। এদিক দিয়ে ২০১৫ সাল বিনিয়োগকারীদের জন্য ভাল ছিল না।

ডিএসইর পরিচালক ও স্টকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, ২০১৫ সাল ছিল বায়ারস (ক্রেতাদের) মার্কেট। এ বছর বিনিয়োগকারীরা কম দরে শেয়ার কিনতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, ‘২০১৫ সালে খুব উত্থান বা পতন হয়নি। সেদিক দিয়ে বছরটি পুঁজিবাজারের জন্য ভাল গেছে বলা যায়। তবে লেনদেনের পরিমাণ কম হওয়ায় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যবসায় খারাপ গেছে। অনেক ব্রোকারেজ হাউস লোকসান করেছে। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ’-এর সভাপতি মিজানুর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘২০১৫ সাল ছিল কর্পোরেট ম্যানুপুলেশনের বছর। বিনিয়োগকারীরাদের জন্য ছিল আরেকটি খারাপ বছর।