১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাকালের যাত্রায় বিদায় ২০১৫, স্বাগত ২০১৬

মহাকালের যাত্রায় বিদায় ২০১৫, স্বাগত ২০১৬

উত্তম চক্রবর্তী ॥ কেটে গেল আরেকটি বছর। আজ বৃহস্পতিবার মধ্য রাত পেরোলেই উল্টে যাবে ক্যালেন্ডারের পাতা। দিনপঞ্জিকার শেষ পাতাটি উল্টে যাবে আজ। নানা কাজের ফিরিস্তি লেখা নিত্যসঙ্গী হয়ে হাতখাতাটি হয়ে পড়বে সাবেক। পরমায়ুর বৃক্ষ থেকে ঝরে যাবে একটি পাতা। মহাকাল নামের এক অন্তহীন মরুভূমির বুকে যেন এক ফোঁটা জল। আজ মহাকাল সেভাবেই মুছে দেবে বহুল আলোচিত ২০১৫ কে। ‘যেতে নাহি দিব’- এ চিরন্তন বিলাপধ্বনীর ভেতরে আবহমান সূর্য একটি পুরনো দিবসকে আজ কালস্রোতের উর্মিমালায় বিলীন করে পশ্চিম দিগন্তে মিলিয়ে যাবে। বর্ষবরণের আবাহন রেখে কুয়াশামোড়া পা-ুর সূর্য আজ বিদায় নেবে মহাকালের যাত্রায়। সময় হলো খ্রিস্টীয় ২০১৫ সালকে বিদায় বলার। খ্রিস্টীয় নতুন বছর ২০১৬ সালকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত গোটা বিশ্ববাসী।

সময় যায়। সময় যাওয়ার সময় বদলে যায় অনেক কিছুই। এ হলো পরম সত্য। সময় যেন এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। কেবলই সামনের এগিয়ে যাওয়া, পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। তাই তো জীবন এত গতিময়। সেই গতির ধারাবাহিকতায় মহাকালের প্রেক্ষাপটে একটি বছর মিলিয়ে গেল। আজ আলোড়িত আন্দোলিত বর্ষ বিদায়ের দিন। জীর্ণ ঝরা পল্লবের মতো সরল রৈখিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে আজ খসে পড়বে ‘২০১৫’। মধ্যরাতে নতুন বছর ২০১৬-কে স্বাগত জানানোর উৎসবের বাঁশি বেজে উঠবে সবার প্রাণে। আগামীকাল থেকে শুরু হবে নতুন প্রত্যাশার নতুন বছর, কিন্তু যে বছরটি হারিয়ে গেল জীবন থেকে, ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে, তার সবই কি হারিয়ে যাবে? মুছে যাবে সব? না, সবকিছু মুঝে যায় না। ঘটনাবহুল ২০১৫-এর ঘটনার রেশ টেনেই মানুষ এগিয়ে যাবে ২০১৬ সালের মধ্যরাত্রির পথে। অনেক ঘটনা মুছে যাবে বিস্মৃতির ধুলোয়। আবার পাওয়া না পাওয়ার অনেক ঘটনা থাকবে উজ্জ্বল হয়ে।

কিন্তু ফেলে আসা বছরটির দিকে তাকালে আমরা হয়ে উঠি আনন্দ-বেদনার সমান উদ্বেল। হয়ত স্মৃতি সতত সুখের নয়। হিসেবের খেরোখাতায় জমে আছে অনেক বিয়োগ-ব্যথা, হারানোর কান্না, নানা গ্লানি আর মালিন্যের দাগ। বছরজুড়ে মৃত্যুর মিছিল দেখতে দেখতে অশ্রু ভেজা আমাদের চোখ হয়ত ক্লান্ত, অপ্রত্যাশিত নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় আমাদের মন ভীষণ ভারাক্রান্ত, তবু নিরাশার গভীর থেকে ফুটে ওঠে বিপুল আশার আলো, ধ্বংসস্তূপ থেকে ফোটে নবতর জীবনের ফুল। আমরা আবারও মেতে উঠি সৃষ্টিসুখের উল্লাসে, বৈরী সময়কে মাড়িয়ে এসে গেয়ে উঠি জীবনের জয়গান।

আজ রাত পেরোলেই কাল পূর্বাকাশে উঠবে যে নতুন সূর্য- সে সূর্য নতুন বছরের। নতুন আশায় বুক বেঁধে আরও একটি নতুন বছরের দিনলিপি পড়ে থাকবে পেছনে। নতুন বছরে নতুন সূর্যের অসীম প্রতীক্ষা মানুষের। উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়েই মানুষ স্বাগত জানাবে ইংরেজী নতুন বছর ২০১৬ সালকে। ইংরেজী পঞ্জিকার সর্বজনীনতায় কাল বিশ্ববাসীও মেতে উঠবে নতুন বছরের আগমনী আনন্দ-উল্লাসে। স্বপ্ন আর দিনবদলের অপরিমেয় প্রত্যাশার রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত শুভ নববর্ষ ২০১৬। ‘হ্যাপি নিউইয়ার’- উচ্চারিত হবে শত কোটি মানুষের কণ্ঠে।

বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে মহাকালের পরিক্রমায় বিদায় নিল আরও একটি বছর। মিথ্যার কুহলেকা ভেদ করে সত্য প্রতিষ্ঠিত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভূতপূর্ব পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে চিরকালের জন্য আজ হারিয়ে যাচ্ছে ঘটনাবহুল ২০১৫ সাল। বাংলাদেশের ৪৪ বছরের অনেক ইতিহাস বদলে দিয়েছে বিদায়ী বছরটি। সূচনা করেছে জাতীয় জীবনে ও রাজনীতির ইতিহাসে এক অভিনব অধ্যায়ের। নির্বাচিত সরকার উৎখাতে করে যে সুগভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল বিদায় বছরের শুরুতে, শেষ পর্যন্ত সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আর ভয়াল নাশকতাকে শক্ত হাতে দমন করে বিপুল উন্নয়ন আর জনমনে শান্তি-স্বস্তি দিয়েই বিদায় নিল ২০১৫ সাল। অনেক ঘটনা, অঘটন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উৎড়াই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী হয়ে কালের গর্ভে আজ হারিয়ে যাচ্ছে এ বছরটি।

যে প্রত্যাশার বিশালতা নিয়ে ২০১৫ সালের যে প্রথম দিনটি বরণ করা হয়েছিল, সেই প্রত্যাশার সব কি পূরণ হয়েছে। হয়নি। কিন্তু যা পাওয়া গেছে তাও কম নয়। বিদায়ী বছরের শুরু থেকে পরবর্তী তিনটি মাস ধরে বিএনপি-জামায়াত জোট যে ভয়াল নাশকতা, ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষ পুড়িয়ে মারার হীন রাজনীতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করে দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার যে পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছিল, সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে সৃষ্টির জাগরণে দেশকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দুর্নীতি-সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের দেশের কালো তকমা মুছে ফেলে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল।

দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে থাকা অনিষ্পন্ন ছিটমহল চুক্তির মাধ্যমে নিজ দেশেই পরবাসী হয়ে থাকা ছিটমহলবাসী বিদায়ী বছরেই পেয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে প্রমত্তা পদ্মা সেতুর বুকচিরে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণযজ্ঞ চলছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে গেছে রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ। সরকারের দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় বাংলাদেশ পেয়েছে বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। তাই বিদায়ী বছরে কৃষি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণে বলা যায়, আশা-নিরাশার, আনন্দ-বেদনার দোলাচলে যথেষ্ট বাক্সময় ২০১৫। নতুন বছর ২০১৬ সালের অনেক প্রত্যাশার বীজও বনে গেছে বিদায়ী ২০১৫।

দেখতে দেখতে চলে গেল আরেকটি বছর। শেষলগ্নে এসে হাসি-কান্না, পাওয়া- না পাওয়ার হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সবাই। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে বিদায়ী বছরটি কেমন গেল, দেশের সব মানুষের এক জবাব- অসম্ভব এক ক্রান্তিকাল ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছে বিদায়ী বছর ২০১৫। ভয়াল সংঘাত দিয়ে বছরটি শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত পুরো বছরটিই কেটেছে শাস্তি, স্বস্তি ও অগ্রগতির মিছিলে। তবে বছরের শুরু থেকে ৯২ দিন ধরে আন্দোলনের নামে দেশবাসীকে জিম্মি করে বিএনপি-জামায়াত জোট যে নারকীয় পৈচাশিক উম্মততায় মেতে উঠেছিল, স্বাধীনতার ৪৪ বছরে রাজনীতির নামে এমন হিংসাত্মক নৃশংস ধ্বংসাত্মক রাজনীতি আর কখনও দেখেনি দেশবাসী। বছরের শুরুতেই পুরো দেশ রীতিমতো প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলেছে।

২০১৫ সালটি কেমন গেল তার সার্বিক পর্যালোচনায় এক কথায় বলা যায়, ভয়াল সহিংসতা ও শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উন্নয়নের নবযাত্রার এক বছর পূর্ণ হলো। বাংলাদেশে বিদায়ী বছরটা শুরুই হয় প্রচ- রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের এক বছর পূর্তির দিনকে সামনে রেখে ৫ জানুয়ারি থেকেই বিএনপি-জামায়াত জোট দেশব্যাপী শুরু করে টানা অবরোধ, সহিংসতা। টানা বিরানব্বই দিন গুলশানের কার্যালয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া অবস্থান নিয়ে হরতাল-অবরোধের নামে সহিংস রাজনীতি। জোট সন্ত্রাসীদের নিক্ষিপ্ত পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়েই প্রাণ হারান প্রায় দেড় শতাধিক নিরীহ মানুষ। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় সরকারী অফিস-আদালত, বিদ্যুত স্টেশনসহ সর্বত্র। এক কথায় পুরো দেশকেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চলে ভয়াল হামলা আর নাশকতা।

তখন প্রশ্ন উঠেছিল, দেশে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসন আদৌ থাকবে কি-না। কিন্তু ভয়াল নাশকতা চালিয়েও জনগণের ন্যূনতম সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয় বিএনপি-জামায়াত। শত উস্কানি, নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী ও দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সক্ষম হন। কোনকিছু অর্জন ছাড়াই প্রায় দেড় শতাধিক পোড়া মানুষকে উপহার দিয়েই রণেভঙ্গ দিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিজ ঘরে ফিরে যান খালেদা জিয়া। নির্বাচনে না আসার ভুল আর সহিংস রাজনীতি কারণে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বিএনপি-জামায়াত জোট। বাকি ৯টি মাস আর ঠিক সেভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি তারা।

বছরের শুরুটা রাজনৈতিক সহিংসতা দিয়ে শুরু হলেও বছরের শেষটাও হলো রাজনৈতিক উত্তেজনা দিয়ে। তবে সহিংস নয়, এটা ছিল নির্বাচনী উত্তাপ। বছর শেষ হবার একদিন আগে বাংলাদেশে ২৩৪টি পৌরসভায় মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচনে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে নামে প্রার্থীরা। প্রায় সাত বছর পর এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের সঙ্গে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থীরা ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। বছরের শুরুটা অগ্নিসন্ত্রাস-নাশকতা দিয়ে শুরু করলেও শেষাংশে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক আত্মসম্পর্ণের ষোলকলা পূর্ণ করেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া।

বছরজুড়ে উন্নয়ন-অগ্রগতির মিছিলে বাংলাদেশ শামিল থাকলেও বেশকিছু আলোচিত ঘটনা বিদায়ী বছরকে চিরদিন মনে রাখবে দেশের মানুষ। বিদায়ী বছরটি নিঃসন্দেহে মানুষের মনে থাকবে বাংলাদেশজুড়ে চলা ভিন্ন মতাবলম্বী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিদেশী নাগরিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা এবং এ ধরনের কয়েকটি হত্যাকা-ের কারণে। আর এসব গুপ্তহত্যাকা-ই ঘটিয়েছে সাম্প্রদায়িক জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধে বেলায় ঢাকার বাংলা একেডেমির বইমেলা থেকে ফেরার সময়ে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্লগার ও বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক অভিজিত রায়কে। মারাত্মকভাবে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ। আর অক্টোবর মাসের শেষ দিন এসে ঢাকায় দুটি প্রকাশনা সংস্থায় একযোগে হামলা হয়। এদিন জাগৃতি প্রকাশনা সংস্থার মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপন নিজ কার্যালয়ে নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হন।

বিদায়ী বছরে অশুভ শক্তির টার্গেট হয়েছিল বিদেশী নাগরিকরাও। বাংলাদেশকে অগ্রগতির মিছিল থেকে ফেলে দিতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম ধ্বংস করতে অন্তত সুপরিকল্পিতভাবেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে দু’জন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার গুলশানে আততায়ীর হামলায় নিহত হন সিজার তাভেলা নামে এক ইতালীয় নাগরিক। আর ৩ সেপ্টেম্বর রংপুরে নিহত হন হোশি কুনিও নামে এক জাপানি নাগরিক। কাছাকাছি সময়ে আরও কয়েকজন বিদেশী নাগরিকের ওপর হামলা হলেও তাঁরা বেঁচে যান। এই সময়ে বাংলাদেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে বিশ্বের অনেক দেশ। এমনকি হামলার আশঙ্কায় অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল তাদের বাংলাদেশ সফর বাতিলও করে বিদায়ী বছরে।

সরকারকে চাপে ফেলতে এবং বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে বিদায়ী বছরে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট রয়েছে- এটা প্রমাণ করতে চালানো হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা। ইমামবাড়ায় দেশের ইতিহাসে প্রথম শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিলের ঠিক আগে গভীর রাতে চালানো হয় বোমা হামলা। বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয় একজন, অর্ধশতাধিক আহত হয়। ঢাকার চারশ’ বছরের ইতিহাসে কখনও সংখ্যালঘু শিয়া মতাবলম্বীরা কখনও হামলার শিকার হয়নি। এরপর বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মতাবলম্বীদের একটি মসজিদে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি করে মুয়াজ্জিমকে হত্যা, ৪ ডিসেম্বর দিনাজপুরের কাহারোলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী কান্তজিউ মন্দির প্রাঙ্গণে শতবর্ষ পুরনো এক মেলায় বোমা হামলা এবং ১০ ডিসেম্বর ওই কাহারোলেই কৃষ্ণভক্ত হিন্দুরের মন্দির ইসকনে একযোগে বোমা ও গুলি হামলা চালানো হয়। বিদায়ী বছরের শেষ দিকে দেশের ইতিহাসে প্রথম একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলা চালাতে গিয়ে একজন জঙ্গী নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণে নিহত হয়।

বিদেশী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্থাপনায় হামলাগুলোর দায় তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গীগোষ্ঠীর নাম দিয়ে স্বীকার করা হয়। তবে সরকার তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেশে আইএসের কোন অস্তিত্ব নেই তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে। এসবই ঘটনা যে সরকারবিরোধী একটি অংশ পরিকল্পিতভাবেই করেছে তাও পরবর্তীতে ধৃত আসামিদের স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে।

বিদায়ী বছরে দুটো নিষ্ঠুর হত্যাকা- মানুষকে নাড়া দিয়েছে। জুলাই মাসে সিলেটে শিশু রাজনকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার দৃশ্য ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের মানুষ। শিশু রাজন হত্যার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালিয়ে গেলেও সেখানে বিক্ষুব্ধ বাঙালী তাকে ধরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। সরকার ওই খুনীকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলা বিচার কার্যক্রম শেষে খুনী কামরুলকে মৃত্যুদ- দেয়া সিলেটের আদালত। আর আগস্ট মাসে খুলনায় রাকিব নামের একটি শিশুর মলদ্বার দিয়ে মোটরগাড়ির চাকায় দেয়া নল ঢুকিয়ে বাতাস প্রবেশ করিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে, যা মানুষকে প্রচ- আলোড়িত করে। নবেম্বর নাগাদই দুটো হত্যাকা-ের বিচার শেষ করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের রায় দেয়া আদালত। এত দ্রুত কোন মামলার বিচার করাও বাংলাদেশে ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।

তবে বিদায়ী বছরে আলোচিত ঘটনাই ছিল দেশী-বিদেশী সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করা। বিদায়ী বছরে তিনজন শীর্ষ একাত্তরের ঘাতক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে বাংলাদেশে। এপ্রিল মাসে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। নবেম্বর মাসে একযোগে কার্যকর করা হয় জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেকমন্ত্রী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদ-।

তবে এ তিন মৃত্যুদ- কার্যকর নিয়ে সরকারকে দেশী-বিদেশী নানা চাপ মোকাবেলা করতে হয়। মৃত্যুদ- কার্যকরের পর পরাজিত পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা চালানোর দায়ী অস্বীকার করলে সরকার তার কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানায়। দেশে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সম্পর্ক ছিন্নের প্রবল দাবিও উঠেছে। সবশেষে বছরের শেষ প্রান্তে এসে পাকিস্তানের সঙ্গে কণ্ঠমিলিয়ে একাত্তরের শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার প্রশ্ন তোলার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়ের সৃষ্টি করে। আইন করে শহীদদের অবমাননা রোধের প্রচ- দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করে সরকার নতুন একটি আইন তৈরির পথেই হাঁটছে।

তবে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার মাঝেও ২০১৫ সালটিতে অনেক ইতিবাচক ঘটনার জন্ম হয়েছে বাংলাদেশে। ক্রিকেটে এই বছর বাংলাদেশ যতগুলো একদিনের আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলেছে সবগুলোতেই জয় পেয়েছে। বাংলাদেশের কাছে পরাজিতদের তালিকায় রয়েছে ভারত পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাক্রমশালী দল। বিদায়ী বছরেই ৬ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদের মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি শেষ হবার পর দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে পূরণ করেছে। বিদায়ী বছরেই জাতিসংঘ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশকে।

বিদায়ী বছরে সরকারের সাফল্যে বা অর্জনের কমতি ছিল না। একের পর এক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয়, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সাফল্যে অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, দেশীয় অর্থনীতি মজবুত, উপচেপড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিও। প্রথম তিন মাস ছাড়া বাকি নয় মাসে রাজপথে ছিল না সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সংঘাত-সাংঘর্ষিক রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রধান প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক সঙ্কটে ফেলার কৃতিত্বও সরকারের ঝুলিতে। পুরো বছরেই রাজনীতির লাগাম ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে।

কূটনীতিকভাবে বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। বিদায়ী বছর সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন এসেছে ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চূক্তির মাধ্যমে। বিদায়ী বছরের ৬ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসলে সম্পাদিত হয় এই ঐতিহাসিক চুক্তি। এ চুক্তির ফলে দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরাধীন ছিটমহলবাসী পায় পূর্ণ স্বাধীনতা। ভারত থেকে ছিটমহলের বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হয় বাংলাদেশ। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বীকৃতি এবং জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবেলায় সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ কর্তৃক দুটি আন্তর্জাতিক সম্মানজনক পুরস্কার ‘আইসিটি পুরস্কার এবং চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বিদায়ী বছরে বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রায় সকল দেশই বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন।

তবে বিদায়ী বছরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাই ছিল স্বপ্নের পদ্মা সেতুর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজের উদ্বোধন। মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীর ওপরই বিদায়ী বছরে শুরু হয়েছে মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ। এই প্রকল্পের প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার, যেটি দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। গত ১২ ডিসেম্বর পদ্মা নদীর ওপর ছয় কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ দ্বিতল এই সেতুটির মূল অবকাঠামো নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে এ প্রকল্পটিতে বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়ন করার কথা থাকলেও সংস্থাগুলো দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে তাদের অর্থায়ন বাতিল করে। তবে শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির কোন প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় বিশ্বব্যাংক। নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরুর মাধ্যমে গোটা বিশ্বকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন- বাঙালী জাতি যে কোন অসাধ্য সাধন করতে পারে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে- ২০১৮ সালের মধ্যেই পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে সড়ক ও রেলপথে যাতায়াত শুরু হবে, খুলে যাবে স্বপ্নের দুয়ার।

বিদায়ী বছরটি প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির দোলাচলে নিয়েছে অনেক কিছু। চিরবিদায় নিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক ও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমেদ, শব্দসৈনিক রাশিদুল হোসেন, একুশে পদকপ্রাপ্ত চাষী নজরুল ইসলাম, বিচারপতি হাবিবুর রহমান খান, স্থপতি নভেরা আহমেদ, জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফরিদা ইয়াসমীন, প্রবীণ সাংবাদিক হাসানউজ্জামান খান, আবদুল মতিন, সিরাজুর রহমান, গীতিকবি নয়ীম গহর, চিত্রশিল্পী আসমা কিবরিয়া, পটচিত্রশিল্পী রঘুনাথ চক্রবর্তী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এ আর খান, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখাজ্জীর সহধর্মিনী বাংলাদেশে জন্ম নেয়া শুভ্রা মুখোপাধ্যায়, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলীসহ অসংখ্য মানুষকে। কিন্তু দিয়েছেও কি খুব কম? এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ২০১৫ অনেক কারণেই স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। মহাকালের আবর্তে হারিয়ে গেলেও বিদায়ী বছরটি দেশের মানুষের মনে দাগ কেটে থাকবে বহুকাল, বহু বছর। পাল্টে দিয়েছে অনেক ইতিহাসও।

সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরটি ছিল বৈচিত্র্যময়। আজকের গোধূলি বেলায় রক্তিম সূর্য অস্ত যাওয়ার মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাবে ঘটনাবহুল এ বছরটি। এখন নতুন বছর আর নতুন সূর্যের অপেক্ষায় দেশবাসী। অপেক্ষা কেবল মানুষের নিরাপত্তা, শান্তি, স্বস্তি, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণ, বাকি সব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর এবং সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির দেশ গড়ার। ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলীয় জোট সরকারের কাছে এ প্রত্যাশা রেখেই আগামীকাল শুক্রবার থেকে নতুন বছরে, নতুন জীবনে যাত্রা করবে এ দেশের মানুষ। কাল শুরু হবে আরও একটি নতুন বছর ২০১৬। বিদায় ২০১৫।