১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টাঙ্গাইলে শান্তিপূর্ণ ভোটে জনগণ খুশি ॥ অনিয়ম সংঘর্ষের বিচ্ছিন্ন ঘটনা

  • সরেজমিন

ফিরোজ মান্না/ ইফতেখারুল অনুপম, টাঙ্গাইল থেকে ॥ দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া টাঙ্গাইলের আটটি পৌরসভা নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকায় ভোটারদের মধ্যে ছিল বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোটারদের কোন অভিযোগ ছিল না। তারা অতীতের অনেক নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, এবারের ভোটে ভীষণ খুশি। দলীয় পরিচয়ে মেয়রপদে এবারই প্রথম নির্বাচন। এ কারণে উৎসাহের বিষয়টি ছিল আরও প্রবল। যার যার দল নিয়ে তারা প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এমন নির্বাচনই ভোটাররা আশা করেছিলেন। দুই বিএনপি প্রার্থী ও এক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বেলা ১১টার দিকে নির্বাচন বর্জন করেছেন। বাকি প্রার্থীরা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।

সকাল ৮টা থেকে ভোট শুরু হয়ে একটানা বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে। সকাল থেকেই উৎসবমুখর পরিবেশে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের ভোট দিতে দেখা গেছে। শীতের কারণে সকালের দিকে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

জেলার ১১টি পৌরসভার মধ্যে বুধবার ৮টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৌরসভাগুলো হলো- টাঙ্গাইল সদর, ধনবাড়ী, মধুপুর, গোপালপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, মির্জাপুর ও সখীপুর। বাকি তিন পৌরসভা নতুন হওয়ার কারণে ওই তিন পৌরসভায় ভোট হয়নি। ৮টি পৌরসভায় মেয়রপদে ২৯ জন, কাউন্সিলর পদে ৩০৪ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১০৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচনী এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। ভোট কেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার দায়িত্ব পালন করেন। আটটি পৌর এলাকায় ৩৭ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, টাঙ্গাইলের মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ৮টি পৌরসভায় সচেতন নাগরিকরা কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ভোটাররা এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করেছে ভোট কেন্দ্রগুলোতে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দায়িত্বে কোন প্রকার অবহেলা হয়নি। তাই কোন কেন্দ্রেই কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভোটাররাও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করাটাই ছিল আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা তা করতে পেরেছি। আশা করি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরও পরিবেশ শান্তিপূর্ণই থাকবে।

এদিকে প্রকাশ্যে ভোট প্রদানে বাধ্য করা, এজেন্টদের বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল এবং দলীয় সমর্থকদের মারধর করার অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌরসভার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী শহীদুল ইসলাম (সরকার শহীদ)। তিনি বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, সকাল ৮টার দিকে ভোটাররা উপস্থিত হলেও সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা প্রকাশ্যে ভোট দিতে বাধ্য করে। এরপর এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে জাল ভোট প্রদান করে। মধুপুর পৌরসভার সকল ভোট কেন্দ্রে একই চিত্র হওয়ায় তিনি নির্বাচন বর্জন করেন বলে জানান। মধুপুরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীর পাখা প্রতীকের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করে একই অভিযোগে দলীয় প্রার্থী হারুন অর রশিদ (প্রতীক পাখা) নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

মধুপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দীন জানান, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বক্ষণিক ভোট কেন্দ্রে নজরদারি করেন। দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোন লিখিত কাগজপত্র পাননি। তবে লোকমুখে তারা এ ধরনের খবর শুনেছেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, ভোটারদের ভয়ভীতি ও এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রুবেল। বুধবার দুপুরে গোপালপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ ঘোষণা দেন।

জাহাঙ্গীর আলম রুবেল অভিযোগ করেন, বিভিন্ন কেন্দ্রে আমার এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। যারা আগে ঢুকেছিল তাদেরও বের করে দেয়া হয়েছে। এমনকি ভোটারদেরও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে সরকারী দলের লোকজন। তাই আমি এ প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করলাম। গোপালপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করেন রফিকুল হক সানা। লড়েন আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী প্রার্থী বেলায়েত হোসেন।

এদিকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর পৌরসভায় ভোটগ্রহণের এক ঘণ্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে পৃথক সংঘর্ষে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়রপ্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল, শ্রমিক নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলুসহ ৫০ জনের বেশি কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। মুমূর্ষু অবস্থায় মেয়রপ্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল, শ্রমিক নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলুকে প্রথমে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাদের টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অন্যদের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চল (প্রতীক মোবাইল) বুধবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের বাহাদীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে যাওয়ামাত্র আওয়ামী লীগ দলীয়প্রার্থী মাসুদুল হক মাসুদের কর্মী-সমর্থকরা দা-লাঠি নিয়ে তার ওপর হামলা করে। ওই হামলায় তিনি দুই সহকর্মীসহ আহত হন।

অপরদিকে, প্রায় একই সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাসুদুল হক মাসুদের (প্রতীক নৌকা) সমর্থক ও উপজেলা শ্রমিক লীগের নেতা খায়রুল ইসলাম তালুকদার বাবলু পৌরসভার ঘাটান্দি কেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার পথে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মআহ্বায়ক ও দলের অপর বিদ্রোহী প্রার্থী আজহারুল ইসলামের (প্রতীক জগ) ২০-২৫ জন কর্মী-সমর্থক হামলা চালায়। হামলাকারীদের দা-লাঠি-হকিস্টিকের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন।

এদিকে, সকাল ১০টার দিকে ভূঞাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের (নৌকা) সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা সাহিনুল ইসলাম তরফদার বাদলসহ উভয়পক্ষের প্রায় ৩৫ নেতাকর্মী আহত হন। এছাড়া পৌরসভার বামনহাটা, তেঘরি ও ছাব্বিশা কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে ১০-১২ জন আহত হয়েছেন। সাহিনুল ইসলাম তরফদার বাদলসহ কয়েকজনকে ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।