২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

থার্টিফার্স্টে জঙ্গী হামলা ও নাশকতার আশঙ্কা, সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা

শংকর কুমার দে/গাফফার খান চৌধুরী ॥ খ্রীস্টীয় নববর্ষ, থার্টিফার্স্ট নাইট সামনে রেখে সম্ভাব্য জঙ্গী হামলা ও নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে দেশী-বিদেশী একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এ জন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা, নজরদারি, টহল, তল্লাশি, নিরাপত্তার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। খ্রীস্টীয় ধর্মাবলম্বীদের নাস্তিক ও তাদের বড় দিন ও নববর্ষকে নাস্তিকদের দিবস ও না-জায়েজ অভিহিত করে চার্চ, হোটেল, ক্লাবে অনুষ্ঠানে বর্ষবরণে খ্রীস্টীয় ধর্মাবলম্বী, উপাসনালয়ে হামলা ও নাশকতা চালাতে পারে উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ জঙ্গীরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমাদেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে জঙ্গী হামলা ও নাশকতা চালানোর আশঙ্কার গোপন প্রতিবেদন দেয়ার পর তাদের নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ভ্রমণ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে প্রাপ্ত এ ধরনের তথ্যের ভিত্তি ছাড়াও দেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও জঙ্গী হামলা ও নাশকতার আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে দেশের বিরুদ্ধে জঙ্গী তৎপরতায় দেশী-বিদেশী চক্রান্তের অংশ, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সতর্ক থাকার নির্দেশসহ থার্টিফার্স্টে সন্ধ্যার পর কোন অনুষ্ঠান করা ঠিক হবে না বলে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের নীতি নির্ধারক মহলের নির্দেশে খ্রীস্টীয় বর্ষবরণ থার্টিফার্স্ট উদ্যাপন উপলক্ষে নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, খ্রীস্টানদের নাস্তিক, কাফের অভিহিত করে দুই বিদেশী হত্যাকা-, দুই ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টায় কুপিয়ে আহত, সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ও অনুষ্ঠানে ইতোমধ্যেই হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তারপর থেকে জঙ্গী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা, কূটনৈতিক পাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার, বিদেশীদের নিরাপত্তা বিধানের পদক্ষেপ গ্রহণ, বিদেশী কূটনীতিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিফ্রিং করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানের জঙ্গী ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে জঙ্গীদেরকে। গ্রেফতারকৃত জঙ্গীদের জিজ্ঞাসাবাদ, অনুসন্ধান, তদন্তে জঙ্গী হামলা ও নাশকতা চালানোর যে আশঙ্কা করা হয়েছে তা খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ থার্টিফার্স্টকে সামনে রেখেও ঘটাতে পারে জঙ্গীরা। এমন আশায় গুঁড়েবালি পড়তে পারে। জঙ্গীদের নাশকতা চালানোর আশঙ্কা থেকেই সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় থার্টিফার্স্ট নাইটের সব অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে যেসব হোটেল বা ক্লাবে পাবলিক সেজে ঢোকা যায়, সেখানে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এ সংক্রান্ত একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনও দেয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে।

এদিকে থার্টিফার্স্ট নাইট সামনে রেখে বাংলাদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য আবারও ভ্রমণ সতর্কতা হালনাগাদ করেছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করা ওই সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, অতীতে বেশকিছু সংখ্যক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জঙ্গীবাদী ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে। ওই গোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি পশ্চিমাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আসছে থার্টিফার্স্ট উপলক্ষে গির্জা, ও কূটনৈতিক পাড়ায় বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা শহরের ৬০ গির্জা ও চার্চে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তারা।

ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গীরা যে দেশের বিভিন্নস্থানে জঙ্গী হামলার ষড়যন্ত্র করছে সে বিষয়ে আগেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। চলতি ডিসেম্বরের প্রথম দিকে এনআইএর এক এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি টিম ঢাকায় এসে র‌্যাব ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে জেএমবির তৎপরতা সম্পর্কে একটি রিপোর্ট দেয় তারা। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে জঙ্গীবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও রাজধানীর মিরপুরে জঙ্গী আস্তানায় সফল অভিযান পরিচালনা ও বিপুল গোলাবারুদ, অস্ত্র, গ্রেনেড-বোমা ও বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার হয়।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গীদের নাশকতা চালাতে নানাভাবে সহযোগিতা ও মদদ যোগাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী ছাড়াও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো। দেশে জঙ্গীবাদ উত্থানের অজুহাতে বিদেশী হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতেই এমন পরিকল্পনা চলছে। মুখ্য সুযোগ হিসেবে থার্টিফার্স্ট নাইটকে বেছে নিতে পারে নাশকতাকারীরা। বিষয়টি বুঝতে পেরেই খোলা জায়গায় সন্ধ্যার পর সব ধরনের অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি জঙ্গীদের কয়েকটি গ্রেনেড তৈরির কারখানা আবিষ্কৃত হওয়ায় সে আশঙ্কা প্রকট হয়। এজন্য নাশকতার আশঙ্কা মাথায় রেখেই কৌশলী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব হোটেল ও ক্লাবে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ আছে, সেসব হোটেলে সর্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে সিসি ক্যামেরা ও আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর, ব্যাগ স্ক্যানার বসিয়ে তল্লাশি চলছে। ক্লাবে ও হোটেলের স্টাফদের বাড়তি নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে। এছাড়া হোম পার্টিতে খাবার সরবরাহকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মতাদর্শগত কারণেই এমন চেষ্টা করে যাচ্ছে জঙ্গীরা। থার্টিফার্স্ট নাইটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বডি ওর্ন ক্যামেরা নিয়ে মাঠে থাকছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের শরীরে বসানো থাকবে ক্যামেরাগুলো। একেকটি ক্যামেরা ৮ ঘণ্টা ভিডিও রেকর্ড করার ক্ষমতাসম্পন্ন। কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হবে ক্যামরাগুলো। এতে করে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সহজ হবে। এসব ক্যামেরার কারণে অনুষ্ঠানস্থলের দ্রুত ও সহজে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। ক্যামেরাযুক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যেখানে অবস্থান করবে, সেখানকার রাস্তাঘাট, যানবাহনসহ অন্যান্য সকল চিত্র কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলে থাকা কম্পিউটার স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। এ ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। ডিএমপি এ ধরনের পর্যাপ্ত ক্যামেরা আমদানি করেছে। রাস্তার সব ধরনের চিত্রের পাশাপাশি কথোপকথনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করার ক্ষমতা রাখে ক্যামেরাগুলো। এছাড়া পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, স্ট্রাইকিং রিজার্ভ, বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট টিম, এপিসি (আর্মার পার্সোন্যাল ক্যারিয়ার), জলকামান, মোবাইল ওয়াচ টাওয়ার, মোবাইল কমান্ড সেন্টার, স্টীল ও ভিডিও ক্যামেরা, যানবাহন স্ক্যানার, হ্যান্ড ও আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর, র‌্যাবের হেলিকপ্টার, ডগ স্কোয়াড ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাঠে থাকছে। পাশাপাশি থাকছে মোবাইল প্যাট্রোল, ফুট প্যাট্রোল, মোটরসাইকেল প্যাট্রোল, চেকপোস্টসহ নানা ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ সেজে মারাত্মক নাশকতা চালিয়ে দেশে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে জঙ্গীরা। এজন্য মদত দিচ্ছে জামায়াত-শিবির। জেএমবির ৯৫ ভাগ সদস্যই জামায়াত-শিবিরের। জেএমবি মূলত জামায়াতের সৃষ্টি এবং জামায়াতের বি টিম। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই সরকারকে উৎখাতের জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে হত্যা, হামলা শুরু করেছে জামায়াত-শিবির ও জঙ্গীরা। রাজধানীর রামপুরা থেকে গানপাউডার, বোমা ও পুলিশের পোশাকসহ ৬ শিবির নেতাকর্মী গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়্ েএসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাদের দুটি পৃথক মামলায় ৪ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে থার্টিফার্স্ট নাইটে নাশকতা চালানোর ষড়যন্ত্রের কথা। বড় দিন উপলক্ষে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সতর্কতার কারণে জঙ্গী হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।