১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিপন্ন বিপর্যস্ত যাত্রাশিল্প ॥ মিলন কান্তি দে

যাত্রাকে বলা হয় আবহমান বাংলার অন্যতম এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যের প্রতি চিরন্তন ভালবাসা রয়েছে বাংলা ভাষাভাষীদের। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বাঙালীর এ প্রিয় শিল্পটি বাংলাদেশেই হোঁচট খাচ্ছে বারবার। কয়েক বছর যাবত যাত্রাশিল্পের দিনগুলো ভাল যাচ্ছে না। সমস্যা লেগেই আছে একটার পর একটা। এ বছর অবস্থার অবনতি ঘটেছে আরও। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তথাকথিত অবরোধের কারণে চলমান জীবন যাত্রার পাশাপাশি যাত্রাঙ্গনেও সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। ফলে অনেক জেলায়, গ্রামে গঞ্জে যাত্রা প্রদর্শনীর সহজ অনুমতি পাওয়া যায়নি। অনুমতি সমস্যা তীব্রতর হয় বছরের শেষে নবেম্বরে দিনাজপুরে কান্তজিউর মেলায় বোমা বিস্ফোরণের পর। ওই সময় মেলায় কয়েকটি দলের পালা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বোমা হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে সমগ্র উত্তরবঙ্গে এবং আরও কয়েকটি জেলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যাত্রা অনুষ্ঠানের অনুমতি বন্ধ করে দেয়। বিপাকে পড়েন পেশাদার যাত্রাদল মালিক ও শিল্পীরা। একেকটি যাত্রাদল গঠন করতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়। অনেক শিল্পীর জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমই হচ্ছে যাত্রা। এ পরিস্থিতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে মালিকদের পুঁজি যেমন উঠে আসবে না, তেমনি চুক্তিভুক্ত শিল্পীদেরও বেতন ও সম্মানী পরিশোধ করা সম্ভবপর হবে না। বছরের প্রথম কয়েক মাস অশুভ শক্তির জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি এবং বছরের শেষে জঙ্গীচক্রের বোমা হামলায় যাত্রাশিল্পীদের জীবনে দেখা দেয় অশনিসঙ্কেত। বিপন্ন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ঐতিহ্যবাহী যাত্রা। ২০১৫ সালকে অনেকে তাই যাত্রার এক ‘অপয়া’ বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এবারের ব্যয়বহুল ও উল্লেখযোগ্য যাত্রাদলগুলা হচ্ছেÑ যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্য সংস্থা, মাগুরার চৈতালী অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙ মহল অপেরা, ফরিদপুরের মধুছন্দা যাত্রা ইউনিট, নাটোরের পদ্মা যাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট। উল্লেখিত দু’একটি দল ছাড়া বেশিরভাগ দলেরই প্রযোজনা মান ছিল খুবই দুর্বল। সুষ্ঠু অভিনয়ের পরিবর্তে অধিকাংশ যাত্রা প্যান্ডেলে দেখা গেছে অশালীন-অশ্লীল নৃত্যগীতের রমরমা আয়োজন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এসব অসামাজিক কর্মকা-ের জন্যে মূলত দায়ী বিকৃতরুচির প্রদর্শকরা। এদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের।

আরেকটি প্রসঙ্গ হচ্ছে যাত্রা-নীতিমালা। ২০১২ সালে নীতিমালা গেজেটভুক্ত হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল এ শিল্পে সুবাতাস বইবে। কার্যত তা হয়নি। ২০১৩ সাল থেকে বর্তমান ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে শিল্পকলা একাডেমি। তবে, নিবন্ধিত বহুসংখ্যক দল এ বছর যাত্রা প্রদর্শনীর অনুমতি পায়নি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে নীতিমালার আলোকে দল নিবন্ধন করে কী লাভ হলো? এ বছর নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ ঘটেনি যাত্রাশিল্পে। যাত্রানুষ্ঠানের সহজ অনুমতি প্রদান এবং যাত্রার অশ্লীলতা প্রতিরোধে নীতিমালায় যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সেটি অনুসরণ করেনি। ২ ডিসেম্বর যাত্রাদল-মালিক ও নির্দেশকদের সঙ্গে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিক মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল। এ বৈঠকের মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন যাত্রা সংশ্লিষ্টরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় তারা হতাশ হয়ে ফিরে যান। এমনি হতাশা, ক্ষোভ, দুঃখ, কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মধ্যে যাত্রাশিল্পে বছরটি শেষ হচ্ছে।

কিছু ভাল অর্জন : হতাশা-অস্থিরতার মধ্যেও অল্পকিছু ভাল কাজ হয়েছে এ বছর। ‘যাত্রাশিল্পের সেকাল-একাল’ নামে একটি গবেষণামূলক বই বের করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন মঞ্চে বসেছে যাত্রাশিল্পীদের কবিতা পাঠের আসর। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে এবং বিভিন্ন স্থানে যাত্রার নামে জুয়া ও অশ্লীলতার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কয়েকটি মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ। সুস্থ যাত্রা চর্চার জন্য সহযোগিতা প্রদানের আবেদন জানিয়ে বিভিন্ন জেলা প্রশাসনে যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের উদ্যোগে স্মারকলিপিও পেশ করা হয়। পরিষদের ময়মনসিংহ জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ৫ নবেম্বর থেকে ১২ দিনব্যাপী সান্ধ্যকালীন সৃজনশীল যাত্রা প্রদর্শনীটি ছিল বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও উল্লেখযোগ্য যাত্রাকর্ম। বাংলাদেশের পালা লেখকদের চাইতে পশ্চিমবঙ্গের ধার করা পালা মঞ্চায়নের দিকে এখানকার দল মালিকদের প্রবণতা বরাবরই বেশি। এ মন-মানসিকতার কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে এ বছর। বাংলাদেশের কয়েকজন লেখকের রচিত যে যাত্রাপালাগুলো এবার মঞ্চায়িত হয় সেগুলো হচ্ছে- এম.এ মজিদের ‘ঢাকা এখন জ্বলছে’, ‘ফকির মজনু শাহ্’, জালাল আহমেদের ‘রাজ দ-’, অনন্ত সরকারের ‘ফিরিয়ে দাও সোনালি দিন’, জাহাঙ্গীর আলমের ‘উঠছে ওই সোনালি সূর্য’, সফিকুল ইসলাম ভূ্ইঁয়ার ‘রাজাকারের ফাঁসি’, কালিপদ দাসের ‘দাতা হরিশচন্দ্র’ এবং মিলন কান্তি দে’র ‘বাংলার মহানায়ক’ ও ‘হাতেম তায়ী’। পালাগুলো মঞ্চায়িত হয়- ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, আনন্দ অপেরা, চৈতালী অপেরা, নেত্রকথন নাট্য সংস্থা ও দেশ অপেরার ব্যানারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতা অবলম্বনে ‘সতী করুণাময়ী’ যাত্রাপালা মঞ্চাস্থ করে ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়। প্রতি বছরের মতো এবারেও একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে- বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের সহযোগিতায় বিভিন্ন জেলায় জেলায় শিক্ষামূলক যাত্রানুষ্ঠানের আয়োজন। এর তত্ত্বাবধানে ছিল এদেশের একমাত্র গবেষণামূলক ও পরিবেশবাদী যাত্রা সংগঠন ‘দেশ অপেরা।’

যাঁদের হারিয়েছি : এ বছর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন যাত্রাঙ্গণের কিছু পরিচিত মুখ। এঁরা হলেন- রাজবাড়ী জেলার বিখ্যাত বিবেক গায়ক চিত্ত ঘোষ এবং যাত্রা মালিকদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের গিয়াস উদ্দিন, ফরিদপুরের ফিরোজ শাহনেওয়াজ স্বপন, সিরাজগঞ্জের স্বপন দত্ত, নাটোরের কিতাব আলী। এ মাসে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবিতে এক ছেলে এক মেয়েসহ মারা যান যাত্রাদলের হারমোনিয়াম মাস্টার নারায়ণগঞ্জের মোঃ সেলিম।