২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে স্বস্তিতে অর্থনীতি

  • ফিরে দেখা ২০১৫

এম শাহজাহান ॥ একটি অসাংবিধানিক দাবিকে সামনে রেখে বছরটি শুরু হয়েছিল বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে। টানা তিন মাসের হরতাল-অবরোধে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। তবে সেই চ্যালেঞ্জ সামলে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের সব সূচক এখন স্থিতিশীল রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিটি সূচকে দেশের অর্থনীতি এখন স্থিতিশীল, প্রাণোদীপ্ত, অগ্রসরমান। এই সময়ে রফতানি আয় বেড়েছে, সুখবর আছে রেমিটেন্সে, বিনিয়োগ বাড়াতে কমছে ব্যাংক ঋণের সুদের হার। মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে রয়েছে। আমদানি-রফতানির প্রবৃদ্ধি ভাল অবস্থায় রয়েছে। বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলেও দাতারা বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন করে অর্থায়ন করছেন। উন্নয়ন ফোরামের বৈঠকেও দাতাদের প্রতিশ্রুতি মিলেছে।

বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। ফলে কমেছে আমদানি ব্যয়। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ায় খুশি সরকারী চাকরিজীবীরা। অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়ায় বেসরকারী খাতের বিনিয়োগও নিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। দেয়া হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। আর তাই বছর শেষে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, লক্ষ্য অনুযায়ী ৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রথম ছয় মাসে অগ্রগতি আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। কিন্তু একটি অসাংবিধানিক দাবিকে সামনে রেখে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বছরের শুরুতে দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ে লিপ্ত হয়। তবে সরকারের জনমুখী ও উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে সাধারণ জনগণের একাত্মতা, ধ্বংসাত্মক সব চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বজায় রেখেছে স্বাভাবিক গতি।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কৌশিক বসু বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনিও বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ভাল করছে। তবে আরও অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এজন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশকে এখন অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে কিছুটা চাপে আছে অর্থনীতি। বিনিয়োগ বোর্ডের ওয়ান স্টপ সার্ভিস এখনও বাস্তবায়ন হতে পারেনি। চাহিদা অনুযায়ী উদ্যোক্তারা কলকারখানায় গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছেন না। কারখানা গড়তে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত জমি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেসরকারী খাতের বিনিয়োগে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে কর্মসংস্থানেও বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ। নতুন বছরে অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জনে ৬টি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এগুলো হলো-দুর্বল অবকাঠামো, অর্থনৈতিক বহিমুখিতার অভাব, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, বন্দর সমস্যা, অদক্ষ শ্রমশক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ, জনসংখ্যার চাপ ইত্যাদি। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখার জন্য বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান দেশে বিনিয়োগ কম হওয়ার সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে কৃষিতে, এসএমইতে, ডিজিটাল টেকনোলজিতে, ই-কর্মাসের নানা কর্মকা-ে। সবদিকে যেহেতু বিনিয়োগ বাড়ছে, সেজন্য হয়ত চোখে পড়ছে না। বিনিয়োগ যদি যথেষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে কি করে গত ছয় বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩ শতাংশ হারে হচ্ছে? অথচ এই সময়ে ইউরোপের কোন কোন দেশে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

রফতানি ॥ সব বাধা অতিক্রম করে দেশের রফতানিমুখী শিল্পখাতগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে বাড়ছে পণ্য রফতানি। জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবেলায় সরকারের জিরো টলারেন্স অবস্থান থাকায় আস্থাহীনতার যে সঙ্কট তৈরি হয়েছিল তাও কেটে যাচ্ছে। বিদেশীরা বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। আর এ কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশ পণ্য রফতানি করে ১ হাজার ২৮৮ কোটি ডলার আয় করেছে। শুধু নবেম্বর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনীতির নামে সব ধরনের নাশকতা ও নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানির যে স্বপ্ন রয়েছে তা পূরণ হবে।

বিনিয়োগ ॥ বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন জমি, বিদ্যুত, গ্যাস, ট্রেড লাইসেন্স, আমদানি-রফতানি নিবন্ধন সার্টিফিকেট, পরিবেশ ছাডপত্র, টিআইএন ও ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন, কারখানার নিবন্ধন, ব্যাংক ঋণ, ইন্সুরেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা সনদসহ আরও ১৫ ধরনের সেবা। জাপানের বাণিজ্য সংস্থা জেট্রো (জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন) তাদের গবেষণায় বলছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ১৩ ধরনের আমলাতান্ত্রিক বাধা রয়েছে। আমলাতন্ত্রের এই কঠিন ফাঁদে আটকে আছে বিনিয়োগ। অর্থনীবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সরকারের ঘোষিত বিনিয়োগ পলিসি বাস্তবায়ন করতে হলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগ বোর্ড ঘোষিত ‘ওয়ানস্টপ’ সার্ভিস বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুতের পূর্ণ নিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে নির্ধারণ করা, সরকারী অফিসগুলোতে কার্যকরভাবে ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করা, ঢাকার বাইরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ প্যাকেজ সুবিধা চালু, বিশেষ বিশেষ শিল্পে কর অবকাশ সুবিধা প্রদান, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, ইউটিলিটি সার্ভিসসহ দ্রুত অর্থনৈতিক জোনগুলো তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। এছাড়া অর্থনৈতিক নীতিসমূহ শিল্প, বাণিজ্য, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় করা প্রয়োজন।

নতুন পে-স্কেল কার্যকর ॥ দেশের ২১ লাখ সরকারী চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকর করে সম্প্রতি গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এর ফলে তাদের দ্বিগুণেরও বেশি বেতন-ভাতা বেড়েছে। এছাড়া বেতন স্কেলে পহেলা বৈশাখের উৎসব ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অষ্টম পে-স্কেলে বেতন দ্বিগুণ বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করায় খুশি সরকারী চাকরিজীবীরা। বাড়তি এই টাকা মূল্যস্ফীতির ওপর কোন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছে সরকার। বরং অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হওয়ায় সরকারী চাকুরেদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে ॥ চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করলেও শেষরক্ষা হয়নি। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শেষ হয়েছে রাজস্ব ঘাটতি দিয়ে। জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। এ কারণে আগামীতে রাজস্ব ঘাটতি এড়াতে এনবিআর রাজস্ব আদায়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। নিয়মিত রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান প্রতি তিন দিন পরপর আয়কর, শুল্ক ও মূসক আদায় সম্পর্কিত প্রতিবেদন দেখছেন। এনবিআর সদস্যদের লিখিতভাবে বিভিন্ন কর অঞ্চলের আয়কর আদায়ে তাগাদা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক ॥ দাতাদের অনাগ্রহের কারণে দীর্ঘ আড়াই বছর থেকে ঝুলে ছিল বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) বৈঠক। তবে চলতি বছরের নবেম্বর মাসে উন্নয়ন ফোরামের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারের বৈঠকে (বিডিএফ) বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে অবকাঠামো খাত। এ খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের চাহিদা-সামর্থ্য এবং সহায়তার বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে। পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত এ বৈঠকের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাজেট বাস্তবায়ন ॥ চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) মাত্র ১৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে, যা গত দুই অর্থবছরের চেয়ে কম। এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির জন্য চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বৃষ্টিকে দুষেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, প্রথম তিন মাসে তীব্র বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা-ঘাটসহ উন্নয়ন কাজ বিঘ্নিত হয়েছে। এই কারণেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নও কিছুটা ধীরগতির হয়েছে। তবে নতুন বছরের জানুয়ারি থেকে এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কৌশিক বসু ॥ সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কৌশিক বসু। তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভাল করছে। তবে আরও অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এজন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশকে এখন অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

নির্বাচিত সংবাদ